লুঙ্গি সমাচার

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** শুভ্রা নীলাঞ্জনা **

পরিপাটি ভদ্রলোক শফিক সাহেব তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই লিফট দিয়ে বেইজমেন্টে চলে গেলেন। নিচ থেকে কুরিয়ারের চিঠি আনবেন বলে। অথচ একটু সুস্থির হলে কেয়ারটেকারকে ইন্টারকমে ফোন করে বললেই আজ শফিক সাহেবকে লুঙ্গি পরা নিয়ে বিব্রত হতে হতো না। দুরন্ত ফ্যাশন সচেতন শফিক সাহেবকে আজকেই কিনা লুঙ্গি পরে পড়তে হলো ৩ তলার সুন্দরী ভাবীর সামনে। যিনি কিনা বাসায় হাউজকোর্ট অথবা টাউজার পরে থাকেন। ৩ তলার ভাবী শফিক সাহেবের সাম্প্রতিক ক্রাশ। অনেকদিন ধরে ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কীভাবে ওই সুন্দরী মহিলার মুখোমুখি হবে। কীভাবে হাসবেন, প্রথম কথা কি বলবেন মনে মনে সব ঠিকঠাক করে রেখেছেন। এমনকি চৌকস অভিনেতার মতো করে আয়নার সামনেও অনেকবার রিহার্সেল দিয়েছেন। বিনয়ী হয়ে, একটু রাফ হয়ে একটু ধুমধাড়াক্কা হয়ে। মহিলা দূর থেকে দেখে স্টাডিও করেছেন, কীভাবে কি করলে নিজের প্রতি আকর্ষিত করা যায়। এমনকি ফেসবুক আইডি না জেনেও স্বামীর নাম আরমান চৌধুরী দিয়ে সার্চ দিয়েছেন। যদি ঠুকাপাঞ্জায় লেগে যায়। দুর্ভাগ্যবশত সেখানেও শফিক সাহেব হতাশ হয়েছেন। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই শফিক সাহেবের ধ্যান জ্ঞান এখন ৩ তলার সুন্দরী মহিলার সাথে সখ্য গড়ে তোলা। মহিলার স্বামী আরমান চৌধুরীর বয়স প্রায় ষাট হবে। কারণ সাম্প্রতিক রিটায়ার্ড করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে। ভদ্রলোক সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকেন পেনশনজনিত সমস্যায়। আরমান সাহেবের মাঝে মাঝে মনে হয় পেনশনের টাকা উঠানোর চেয়ে চাকরি করা অনেক সহজ ছিল। ফাইল শুধু এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যায়। কর্মকর্তাদের চেয়ে কেরানিদের দৌরাত্ম্যই বেশি। কোন চিপায় যে ফাইল ফেলে রাখে সারাক্ষণ ফোন দিয়ে মনে করিয়ে দিতে হয়। যে আরমান সাহেব সারা জীবন কাউকে তেল দেন নাই। সেই আরমান সাহেবকে এখন বালতি বালতি তেল ঢালতে হয় শুধু কেরানিদের উদ্দেশ্যেই। শফিক সাহেব একদিন কথা প্রসঙ্গে সব জেনেছেন। শফিক সাহেব ভিতরে ভিতরে চিরুনি তল্লাশি করেছেন। অডিটের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার সাথে ওনার পরিচয় আছে কিনা! এই সুবাদেও আরমান সাহেবের ফ্যামিলিতে ইন করার একটা রাস্তা পেয়ে গেলেন। কিন্তু শফিক সাহেব এ পথেও বিফল হয়েছেন। হারাধনের দশটি ছেলের মতো একটি একটি করে সব সোর্সই হারাতে লাগলেন। সব সময় শফিক সাহেব ওঁৎপেতে থাকে কখনো যদি কোনো উপকারে লাগতে পারেন। কিন্তু এমন কোনো সম্ভাবনাও বিগত ৬ মাসে পাওয়া যায়নি।

শফিক সাহেবের স্ত্রী মিসেস আফরোজা এক সময় ডাকসাইটের সুন্দরী ও ফ্যাশন সচেতন ছিলেন। শফিক সাহেব আফরোজা বেগমের চুল দেখেই ফিদা হয়েছিলেন। সেই চুল অবশ্য এখন হিজাব দিয়ে ঢাকা থাকে সব সময়। শফিক সাহেবও শেষ কবে দেখেছিলেন আফরোজাকে খোলা চুলে তাও আর মনে নেই। মিসেস আফরোজা বিয়ের পর পরই টের পেয়েছিলেন তার স্বামীর অগাধ নারী প্রীতির কথা। মিনমিনে ভদ্র কিন্তু ভিতরে ভিতরে নারীতে নিমগ্ন। সবকিছুই ঠিকঠাক মতো করেন কিন্তু একটা ঘোরের ভিতর থাকেন। প্রথম প্রথম মিসেস আফরোজা ঝগড়াঝাটি, মান অভিমান, বিছানা আলাদা করা, বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া ঘন ঘন বাপের বাড়ি চলে যাওয়া কোনোকিছুই বাদ রাখেননি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। মিসেস আফরোজা মনে মনে গজ গজ করতেন। ‘কুত্তার লেজ বার বছর চুঙ্গার ভিতর ভইরা রাখলেও সোজা হয় না’ শফিক সাহেবের হয়েছে তাই। মিসেস আফরোজা এখন আর এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। উনি এক সময় ¯িøভলেস ব্লুাউজ পরতেন। একবার এক ভাবীর সাথে তাবলিগে গিয়েছিলেন মনকে সুস্থির করার জন্য। সেই থেকে উনি এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কালাম পড়েন। শফিক সাহেবকে সুপথে আনার জন্য দোয়া দরুদ পড়েন। জায়নামাজে বসে অঝর ধারায় চোখের জল ফেলেন কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। তবে শফিক সাহেব সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব পালন করেন নিখুঁতভাবে। বাবা হিসেবে অতুলনীয়। এক ছেলে এক মেয়ে। সন্তানরা তার বন্ধুর মতো। বাবাকেই ওরা সব শেয়ার করে, মাকে নয়।

এহেন শফিক সাহেবের ক্রাশের প্রজেক্ট কোনটা সফল হয় কোনটা নয়। তবে তিনি হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। ব্যর্থতার দায়ভার বেশিদিন বহন করেন না। কীভাবে যেন নতুন করে আবার অন্য ক্রাশ প্রজেক্ট সাথে সাথেই পেয়ে যান। শফিক সাহেবও নিজের প্রতি নিজে মাঝে মাঝে বিরক্ত হন। নিজেকে ‘কুত্তা রাশির’ জাতক মনে করেন। সব সময় কোনো না কোনো নারীর পিছনে তার দৌড়ানো চাই-ই চাই। আর এই কাজটি করেন তিনি খুব নীরবে। এবারের টার্গেট ৩ তলার সুন্দরী ভাবী যার বয়স ৪৫ ছুঁই ছুঁই। বয়স শফিক সাহেবের কাছে কোনো ব্যাপার না। তিনি কখনো কচি মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। উনি একটু এডাল্ট মহিলাদেরকেই প্রেফার করেন। উনার মতে এডাল্ট মহিলারা নিরাপদ। ভুল হলেও হাঙ্গামা করে না। রিলেশন থেকে খুব তাড়াতাড়ি বের হয়ে পড়া যায়। খুব বেশি এরা ঘাটায় না। আর সামাজিকভাবে অপদস্ত হওয়ার ভয়ও কম। এইহেনও শফিক সাহেবের ক্রাশের সাথে দেখা হলো এমন এক লেজে গোবরে অবস্থায় যখন কিনা শফিক সাহেব লুঙ্গি পরিহিত আনস্মার্ট আর দেখাচ্ছিল সবজিওয়ালাদের মতো। ঠিক সেই মুহূর্তে আচমকাই ৩ তলার লিফটের দরজা খুলে গেল আর প্রবেশ করল শফিক সাহেবের ক্রাশ। শফিক সাহেব সেই মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার মনে হয়েছিল লিফট দুভাগ হোক আর তিনি লিফটের ভিতরে গায়েব হয়ে গেল। শফিক সাহেব লিফটের ভিতর জড়সড় হয়ে এক কোনায় দাঁড়িয়ে রইলেন। প্রথম দেখা হলে কি কি করবেন, কি বলবেন কিছুই এই মুহূর্তে মনে পড়ল না। নিজের লুঙ্গি লুকাতেই তখন হিমশিম খাচ্ছেন।

৩ তলার সুন্দরী ভাবী মোবাইল স্ক্রল করতে নেমে গেলেন। যাবার সময় কেয়ার টেকারকে বলে গেলেন তোমাদের না বলছি লিফটে যারে তারে এলাউ করবা না। সবজি ওয়ালা, মাছ ওয়ালা এই গুলিকে নিচ থেকেই বিদায় করবা লিফটে ঘামের দুর্গন্ধ হয়ে যায়। যাও লিফটে এয়ারফ্রেশনার দিয়ে আসো। এ কথা বলে ৩ তলার সুন্দরী ভাবী রেডওয়াইন কালারে প্রিমিউর দরজা খুলে শফিক সাহেবের মুখের ওপর দরাম করে দরজাটা লাগিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে সাঁই করে বেরিয়ে গেলেন।

পিছনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলেন ক্রাশওয়ালা শফিক সাহেব হতবম্ব অবস্থায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj