আমি, রাজকুমার এবং কিছু প্রশ্ন…!

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** সুমাইয়া সুলতানা রূপা **

আমার কাছে হঠাৎ করেই সবকিছু ভৌতিক মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি কারো স্বপ্নের ভেতর আছি শুধুমাত্র একটি ছবি হয়ে। আমি আসলে আমি নই। আমি অন্য কারো স্বপ্নের ভেতর নিছকই একটি আবছা চরিত্র। আমি তাঁর স্বপ্নে অবিরাম হেঁটে চলেছি, দৌড়ে চলেছি, ভেসে চলেছি। সে ধারাবাহিকভাবে আমাকে কল্পনার আলো-ছায়ায় বুনে চলেছে। আর তা হয়ে যাচ্ছে চলমান স্বপ্ন। আসলে আমার আমি বলতে কিছু নেই। মনে হচ্ছে আমার। কেবলই মনে হচ্ছে।

আবার এই যে আমি তাঁর স্বপ্নে অনেক চরিত্র সৃষ্টি করছি বিভিন্ন গল্পে, রূপকথায় কিংবা কবিতায় আমার মনে হচ্ছে এই কল্পিত চরিত্রগুলো আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে প্রতিনিয়ত। অথবা আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে কিংবা অভিযোগ করছে নতুবা অভিমানে ফেটে পড়ছে অহর্নিশ।

কারণ আমি তো তাদের সৃষ্টি করে গল্পের ফ্রেমেই বেঁধে ফেলেছি। অস্তিত্বহীন কয়েকটি চরিত্রের বেড়াজালে আটকে রেখেছি। কিন্তু আসলেই কী তারা অস্তিত্বহীন? এটা একটা বড় জটিল প্রশ্ন? অস্তিত্ব! আমারও কি অস্তিত্ব আছে? তাহলে কেন সবকিছু এভাবে নীরবে মেনে নিচ্ছি? বিনা প্রতিরোধে? বিনা প্রতিবাদে? অস্তিত্ব তো বন্দিশালায় বন্দি সেই কবে থেকেই! মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে। অস্বাভাবিক নয় আমি কিংবা আমরা অস্তিত্বহীন এক জটিল কোনো কিছুর সমীকরণের ফল নয়তো ! হয়তোবা কারো স্বপ্নে পাওয়া অবিরাম চলতে থাকা এক ভিডিও ফিল্ম। যেখানে আমার কিংবা আমাদের স্বাধীন ইচ্ছে বলে কিছু নেই। অসম্ভব নয়!

আচ্ছা যাই হোক, আগের প্রসঙ্গে আসা যাক। তারা হয়তো ভাবছে, আমি কেন তাদের সৃষ্টি করলাম আর তাদের এভাবে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখলাম? তাদের কোনো স্বাধীনতা নেই। আমি যেমন চাইছি তেমনই ঘটছে। সব আমার মর্জিমত। কেন? নিছকই কি নিজের মনের খোরাকের জন্য? নিজের মনের পিয়াস মেটাতে? আনন্দের জন্য? তবে এটা ভারী অন্যায় হয়েছে।

ওহহহ হ্যাঁ! স্বাধীনতা! আমারও কি স্বাধীনতা আছে? স্বাধীন সত্তা আছে? স্বাধীনতা তো পরাধীনতার শেকলে বন্দি। আমরা কেবলই আজ্ঞাবহ নাচের পুতুল। কী নিদারুন পরিণতি!

তারা দাবি করতে পারে তাদের রক্ত-মাংসে-মননে গড়া একটা জীবন দিতে। কি করুণ চাওয়া! আমার পক্ষে নেহাতই এ অসম্ভব।

মনন! মন। আমাদের কি আছে? একটা ভালো চিন্তার মন? সবার ভালো চাওয়ার মন? ইচ্ছে পূরণের মন? আছে কি? মন তো কেবল এক অলৌকিক বস্তুর নাম মাত্র। আমরা তো রোবটিক যন্ত্র। কেবল ইশারায় চলি।

যদি অসম্ভব-ই হয় তবে কেন সৃষ্টি করলাম তাদের কাগজে কলমে? কে দিয়েছে এই অধিকার? এটাও একটা জটিল প্রশ্ন!

অধিকার? হাহাহা! এটা তো একটা বিলুপ্তপ্রায় শব্দ। জাদুঘরের বন্দি পাতায় ঝুলছে। কি অসহায় অবস্থা!

আমি মাঝেমাঝে এ ও ভাবি, এই যে আমার কবিতার রাজকুমার (আহ রাজকুমার!) নেহাতই একটি কাল্পনিক চরিত্র। কাল্পনিক এক সৃষ্টি যেসব দিক থেকেই পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ এবং অসম্ভব এক অসাধারণ ভালো মানুষের কাল্পনিক রূপ। যার কোনো খুঁত নেই। যে একজন হৃদয়বান মানুষের কাল্পনিক প্রতিরূপ। যে সবার আগে বিপদে এগিয়ে আসে। অন্যায়ে সবার আগে প্রতিবাদ করে। যে অগ্রদূত প্রতিরোধে। যে সাহসী, মানবতাবাদী, অকুতোভয় দেশপ্রেমী এক টগবগে যুবক।

আর সর্বোপরি, যার হৃদয় পরিপূর্ণ কোমল এক ভালোবাসায়। প্রেয়সীর ভালোবাসার কাঙাল।

সেও হয়তো চায় কবিতার বাইরের জগতে বেরিয়ে আসতে। যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হয়তো। হয়তো বলছে, চিৎকার করছে, কখনো আহ্লাদে, কখনো রাগে, কখনো অভিমানে কিংবা কখনো ভালোবেসে…. ‘এই যে মেয়ে, আমি এখানে। তোমার ঠিক পাশেই। তোমার এক নিঃশ্বাস দূরত্বে। প্রতি মুহূর্তে তোমার কাছেই আছি।

অথচ তুমি কি বোকা গো! আমাকে সারা দুনিয়া খুঁজে বেড়াচ্ছো। কি অদ্ভুত না! এটা একটা মজার খেলাও বটে। তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছো না কিন্তু আমি পাচ্ছি। তুমি ছুঁতে পাচ্ছো না কিন্তু আমি পাচ্ছি।’

সে যুদ্ধ করছে বারংবার কবিতা থেকে বেরিয়ে আসতে।

সে প্রতিক্ষণই আমার দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করছে। অথচ আমি তাকে দেখছি না। অনুভব করছি না। বুঝতে পারছি না।

আর রাজকুমার বড্ড অভিমান করে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। আমার চোখের পানে তাকিয়ে আছে আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। আর আমি টের পাচ্ছি না। একদমই না।

আচমকা গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠলো যেন। পুকুরের জলে ঢেউ খেলে গেলো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অদ্ভুত এক ধরনের নেশাতুর সুগন্ধি বাতাস হৃৎপিণ্ডটা ভেদ করে চলে গেল। অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছেয়ে গেছে তনুমনে। এ কী তবে কল্পিত রাজকুমারের সেই অভিমান মাখানো দীর্ঘশ্বাস? প্রেয়সীর নজর কাড়তে না পারার ব্যর্থ হাহাকার?

হয়তোবা আমার কাছে সে কল্পিত। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সে হয়তো আছে। হোক না সে অদৃশ্য আমার কাছে। এক খণ্ড বাতাস হয়ে আছে হয়তোবা। যা ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, যে স্পর্শের বাইরে কিন্তু অনুভব তো করা যায়।

আচ্ছা রাজকুমারের মতো আমিও এক খণ্ড বাতাস নই তো? কারো গল্পের একটি ছবি নই তো আমি? তা না হলে কেন আমার আওয়াজ যাচ্ছে না অন্য কারো কাছে। যারা বহাল তবিয়তে বসে আছে মসনদে। আমি বা আমরা একটা ছবিই বোধহয়। গল্পের কয়েকটি চরিত্র আমরা। কেউ ইচ্ছামতো সাজিয়ে যাচ্ছে আমাদের। রোজ নতুন চরিত্র সৃষ্টি করছে গল্পের প্রয়োজনে। নতুন ঘটনা যোগ করছে। মনে হচ্ছে তাদের খেলার পুতুল আমরা। যেমন ইচ্ছে তেমন খেলছে। ভালো না লাগলে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে ছুড়ে ফেলে দেয় আমাদের। আমি ভাবি, তার কি কোনো বিবেক নেই?

বিবেক! আমাদের আছে কি? এ তো এক হারানো কোনো পুরনো গল্প সৃষ্টির প্রয়োজনে একটি শব্দমাত্র।

আমরা সবাই গল্পের ভেতরের এক একটি অংশ মাত্র।

আর কেউ তো খেলছে আমাদের নিয়ে। কেউ তো। কিন্তু কে সে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের বের হতে হবে গল্পের ভেতর থেকে! কিন্তু কীভাবে? এটাও একটা জটিল প্রশ্ন।

অথবা আমরা কারো স্বপ্নে দেখা চলমান এক চরিত্র! কিন্তু কে দেখছে এই স্বপ্ন? কে নাড়ছে এই স্বপ্নের চরিত্রগুলোর কলকাঠি? কে? প্রশ্ন থেকে গেল।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj