রাত যখন একাকী কাঁদে

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** ইলিয়াস বাবর **

গভীরতার আহ্বানে রাতটা অমন ব্যস্তভাবে সাড়া দিতে দেখে পায়চারী করার সাধ জেগে উঠে মনে। পায়চারীতে ক্রমশ মগ্ন আমার চোখ থেকে ঘুমেরা নেমে এসে পাহারা দেয় মন-মগজকে। ভাবতে থাকি। টিউবের ধবধবে আলোতে থেকেও কানে আসে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মানে গ্রামে আছি, বাড়িতে আছি, শেকড়ে আছি। পায়চারি চলতে থাকে, একা একা। মগজের সাথে মনের দ্ব›েদ্ব অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠে নিজেকে শিশুর লাহান পবিত্র ভাবতে ভালো লাগে। সেলফে রাখা বই আমার দিকে তাকায়। দেয়ালঘড়িটি লজ্জা দেয় অতীতের মিথ্যেকে স্মরণে রেখে। সিলিংফ্যান ঘোরাঘুরি বন্ধ রেখে দৃষ্টি দেয় আমার দিকে। যাবতীয় নিস্তব্ধতা পেছনে ফেলে বিড়ালপায়ে বের হই দরোজা ফাঁক করে। পাশের রুমে বাবার নাক ডাকার তুমুল শব্দকে অক্ষত রেখে পা দেই সিঁড়িতে। উঠোনে বাড়ির ছায়া, ছায়ায় পষ্ট দেখা দেয় বাবার ঘরকন্নার স্বপ্ন। কুকুরেরা ঘেউ করে উঠে দায়িত্ববশত; পরক্ষণে বাড়ির সদস্য ঠাহরে চুপ যায়। বিশ্রামকে স্ট্যাডাপ করে তারাও হাঁটতে থাকে আমার পেছনে। হাঁটতে থাকি ঘাটার দিকে। ধানক্ষেতে হেমন্তের শিশিরকণা। আধো-ঠাণ্ডা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে যায় লোম। পল্লীবিদ্যুতের বদৌলতে দূরের বাড়িঘরের উঠোন দেখা যায়, কুকুরের ঘুম দেখা যায়, গরুর জাবরকাটা দেখা যায়, দেখা যায় ঘুমের মতো চিরসুন্দর সত্যের আশ্চর্য নীরবতা। রাস্তাটাও এই সুযোগে জিরিয়ে নিচ্ছে বেশ, মিহি শিশিরে মারা গেছে আয়ু শেষের ধুলো। উত্তর দিকে তাকাই, ভিটের শেষ সীমানার দিকে কবরস্থানে রাজ্যের প্রশান্তি, আহা ঘুম! আরেকটু পশ্চিমে কেয়াঝাড়। বাবা বলতেন, তাদের শিশুকালে এই ঝাড়ে দেও নাচতো; রাতদুপুরে কেউ একা কিংবা আলোবিনে এদিকে গতায়ত করলে গাঢ় মটকে দিতো…বাবাদের কালের সাথে আমার শিশুকালকে মেলাই। তাদের কুপিধরা কি চেরাগজ্বালানো শৈশবের বদলে আমরা পেয়েছি খাম্বার তারের ফকফকা শৈশব! তাদের জলডোবা, মাছেভরা বিলের দখল ক্রমশ নিতে থাকে শহুরে হওয়ার বাসনা।

বেশ পুরনো রোগের মতন, এই মাঝরাতে, গ্রামের অধিকাংশ মানুষেরই ঘুম প্রায় অর্ধেক ফুরিয়ে আসা-ক্ষণে আমার হৃদয়ে কেবলি ফিরে আসে গত মাসে বাবাকে নিয়ে শহরে কাটানো সময়টুকু। বাবা আমার রাশভারি, ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। জন্মের পর মা মারা যাবার দায়ে ভাবীর সংসারে বড় হওয়া মানুষটির কর্মকপাল বড় বৈচিত্র্যে ভরা। বড়র মন পেতে, নিজের পরিচয়কে বড় করতে, সর্বশেষ স্ত্রীসন্তানকে সুখে রাখতে কি না করেছে লোকটি! সনদহীন বাবা, উপদেশের সুরে একদা বলেছিল, আমি অশিক্ষিত তাই তোমাদের পড়তে হবে, শিক্ষিত হতে হবে। সন্তানদের সুখ দেখতে চাওয়া বাবাকে উপজেলা কমপ্লেক্সের ডাক্তার রেফার করে শহরের বড় ডাক্তারের কাছে। বেকার মেজ সন্তান বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষমাণ। ব্যথায় দেবে যাওয়া পা নিয়ে বাবা বড়বেশি অপ্রস্তুত হয়ে আছেন; ছেলেকে বলছে না ডায়েবেটিকসের সমস্যা তার, ক্ষিধে পায় ঘন ঘন। চিরদিনের অভ্যেস তার, এক টুকরো কেক খেলেও পরিবারে বউ-বাচ্চাকে নিয়ে খাবেন। ডাক্তারের মুখোমুখি বসি বাপ-বেটা। আলাপশেষে বুঝি, তরুণসময়ের অতিরিক্ত শ্রমদান, আরো আগে অপারেশান না করার ফলে বেশ ঝুঁকিতে আছে বাবার বাম পা! লিফটের বেশুমার জ্যামে না গিয়ে সিঁড়ি ভাঙি বাবাকে নিয়ে। পরম নির্ভরতায় বাবা হাত রাখেন আমার কাঁধে! পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মেঝ ছেলেকে বেশি ভালোবাসে বাবা, এই কথা পরিবারে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত হওয়ার পরেও বাবার হাতের স্পর্শে আনন্দ কি গøানির কোনো আলামত খুঁজে পাই না দামি ক্লিনিক থেকে নামতে নামতে। মাস্টার্স শেষ করার পরও তাড়া করে ক্লাস সেভেনে ম্যাথে কম নম্বর পাওয়ায় শ্রেণিরোল পাঁচের বাইরে গেলে বাবার কড়া তিরস্কার এড়াতে গরু নিয়ে বেরুবার স্মৃতি। বাবাকে ভয় পাই যমের মতো, এখনো। এই শহরে রোগগ্রস্ত বাবাকে ব্যথায় অস্থির হতে দেখে আমি আঁতকে উঠি। মাঝরাতে তাহাজ্জুতে অশ্রæসমেত বিড়বিড় করি, রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা… বাবার জোরাজুরিতে পরদিনই কিনে দিতে হয় লাঠি! বাবার হাতে লাঠি দেখে ভেঙে যায় আমার বুক, বড়ভাইকে এসব ফোনে বলতে গিয়ে কান্নায় অস্পষ্ট হয়ে যায় আমার স্বর। বাবাদের শরীরের শক্তি, শাসনের অহম এভাবেই কি দুর্বল করে দেয় একেকটি কঠিন রোগ! দূরে, কবরস্থানের নীরবতা আমাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়, দিয়ে যায় এক লাই বেদনার বিষস্মৃতিসংশয়।

ঘরে ফিরলে দেয়ালঘড়ির কাঁটা জানায়, একটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছি দশ মিনিট আগে। সকালেই ধরতে হবে চট্টগ্রাম শহরের বাস। তারপর নোয়াখালী। জীবনের প্রথম চাকরি; বুকের ওপর চেপে থাকা পাথরটি হয়তো সরে গেছে। মাসশেষে বাবার হাতে গুঁজে দেব বেতনের টাকা। মা বরাবরই অনুচ্চ আর পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকায় থাকেন, তিনি হয়তো বলবেন, তোর খরচ রাখছোস? আমি বাবা না শুনে কি না দেখে মতো বলবো, এটা তোমার ওষুধ খরচ, এটা বাবার। বিদায়রাগ ক্রমশ আমার কানে বাজতে শুরু করে। একটু আগে বাইরের ঠাণ্ডা নিয়ে ঘরে ঢোকার যে প্রতিক্রিয়া তা যেন অতীত করে দিয়েছে আমার ছাপোষা মন। এতদিনকার পরিচিত বিছানা আমাকে টানে না; পিঠ বারণ করে, ওই খাটে শুয়ো নাকো তুমি! ধীরপায়ে বাবার রুমে ঢুকি লাইট অফ করে। বাবা তখনো নাক ডেকে যাচ্ছেন। খাটের পাশে তার লাঠি দাঁড়িয়ে আছে শির উঁচু করে। লাঠিতে হাতে দেই সন্তর্পণে, কপালে ঘষি। টুপ করে শুয়ে পড়ি বাবার পায়ের কাছে। বুদ্ধির পর কখনো বাবার সাথে ঘুমিয়েছি কিনা মনে পড়ে না। ভাত খাইয়ে দিয়েছে কিনা এমনকি বাজারে দোকানদারি করার পরেও বাজারে নিয়েছে কিনা বাবা, মালুম করতে পারি না। বাবা বাজার থেকে আসছে, এমন আভাস পেয়ে ভদ্রটি হয়ে যাই ভাই-বোনেরা, চাচিরা মাথায় আঁচল দিয়ে কিংবা অগোছালো কিছু থাকলে তা বিন্যস্ত করতে তৎপর আমার মা। সংসারে বাবাকে বড় হতে দেখি, মা হতে থাকে শিশু। মনে মনে আল্লাহকে ডাকি, মাবুদ, ভোরে বাবা টের পাবার আগেই ঘুমটা ভেঙো আমার! খুব মন চায় বাবার পায়ে চুমু খেতে, অসম্ভব সুন্দর পা জোড়ায় হাতের স্পর্শ দিতে। জন্মের ভীরুতা আর পিতা-পুত্রের অদৃশ্য দূরত্ব তা হতে দেয় না অথচ বাবা কখনো চড় দেয়নি, পিঠে দেয়নি কঞ্চির আঘাত। চুপচাপ, অনেকটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই বাবার পায়ের কাছে শুয়ে থাকি আমি!

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj