অমিত অথবা লাবণ্যের গল্প

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** প্রমা ইসরাত **

গল্প লেখার জন্য, সময়টা ভালো। রাত বাড়ছে, চারদিকে নীরবতা বাড়ছে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে ব্যাপারটা ঠিক জমছে না। আমি বোধহয় তাহলে একটা ছোটখাটো ভুল করছি। আমি গল্প লিখতে চাচ্ছি না। আমি গল্প করতে চাচ্ছি। কিংবা আমি গল্প বলতে চাচ্ছি। নতুন কিছু না, সব লেখা হয়ে গেছে পৃথিবীতে।

গল্পটা, শুভ আর মানসীর।

মানসী চশমা পরা, কোঁকড়া চুলের, ছোটখাটো, শ্যামবর্ণের। খুব সুন্দর গান করে। রবীন্দ্রনাথকে ভিতরে ধারণ করে রাখতে চায়। মানুষকে ভালোবাসতে চায়। শান্ত, ধীরস্থির, কথা বলে শুদ্ধ করে গুছিয়ে। অপরদিকে শুভ, লম্বা ফর্সা টিকালো নাক, উচ্ছল চঞ্চল। কথা বলার সময় মাঝে মাঝেই বর্ডার পার করে দেয়। শুভও ভালো তবলা বাজায়। তবে বন্ধুদের বলে না। এটা নাকি ওর ইমেজের সাথে যায় না।

শুভর সাথে মানসীর কোনোদিন দেখা হতো না, যদি না ওই আতেল রুমি নোটসগুলো দিতে জোর করে ওই বইমেলায় ডেকে পাঠাতো। কোনো বড় ভাই নাকি কবিতার বই বের করেছে, রুমি আবার তার খুব ফ্যান। আঁতেলে আঁতেল চেনে আর কি। শুভ ভিড় ঠেলে মেলায় ঢুকে স্টলটা খুঁজতে লাগল, পেয়েও গেল। কিন্তু রুমিকে দেখা যাচ্ছে না। কি করবে শুভ এই বোরিং বই মেলায়, ক্যামেরাটাও আনেনি, নইলে কতগুলো ছবি তুলে সময়টা পার হতো।

বইয়ের স্টলে, কি একটা বই টান দিয়ে দেখতে গেল আর হুড়মুড় করে বইগুলো মাটিতে পড়ে গেল। শুভ বইগুলো মাটি থেকে তুলতে তুলতে, আরেকটা হাত দেখতে পেল। এমনভাবে বইগুলো তুলছে যেন কোনো বাচ্চা মাটিতে পড়ে গেছে। শুভ দুঃখ প্রকাশ করল। এই ছিল মানসীর সাথে শুভর প্রথম দেখা।

দ্বিতীয়বার দেখা হলো ছায়ানটে।

মাকে নিয়ে গিয়েছিল শুভ, মা ও ভালো গান করেন, গান শুনতে পছন্দ করেন। ওখানে আবার দেখা হলো মানসীর সাথে। এবার কথাও হলো। কোথায় পড়ে জানা গেল।

এভাবেই শুরু হলো।

তারপর কি হলো? গল্প, আড্ডা গান, সিনেমা দেখা এর মাঝে শুভ মানসী অনেক কাছাকাছি চলে আসে। কথা বলা, আড্ডা দেয়া ঘোরাঘুরির মাঝে মানসী আর শুভ একে অপরকে আবিষ্কার করে। শুভ মানসীকে নিজের মতো করে চায়। সারাজীবনের জন্য চায়। মানসীও ভাবে।

সেদিন ছিল বিজয় দিবস। বাচ্চাদের একটা স্কুলে মানসীর গান করার কথা বিকেলে। মানসী তাই ব্যস্ত ছিল, ফোনে চার্জ নেই, কখন বন্ধ হয়েছে টের পায়নি মানসী। আর এদিকে শুভ মানসীকে ফোনে না পেয়ে অস্থির। রাতে ফোন খুলতেই শুভর ফোন। অস্থির হয়ে, রাগে মানসীকে কড়া কথা শুনিয়ে দিল শুভ। মানসী এই আচরণের জন্য তৈরি ছিল না। ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হলো। বাবা-মার একমাত্র ছেলে শুভ, সচ্ছলতার মধ্যেই বড় হয়েছে। বাবার এত নাম ডাক, তাই শুভর ভেতর স্বাভাবিকভাবেই একটা অহঙ্কার আছে, যা কথায় আচরণে প্রকাশ পেয়েই যায়। আর অন্যদিকে শান্ত মানসী যেন এক রাবীন্দ্রিক কবিতা। মানুষকে ছোট করতে শিখেনি সে। বরং ভালো বেসেছে। শুভ তার ভুল বুঝতে পারে, কিন্তু মানসী বুঝে পায় না, কি করে শুভর এই একগুঁয়েমি স্বভাব বদলাবে।

মানসীর নানান কাজে ব্যস্ত থাকা, দেশের জন্য ভাবা, অন্যের জন্য ভাবা শুভ বুঝতে পারে না এতে লাভ কি। মানসীও আর পারেনি। একদিন, সেই শেষ দিন, মানসী জানিয়ে দেয় সে আর শুভর সাথে চলতে পারে না। তারা দুজন ভিন্ন জগতের। তাদের স্বপ্ন আলাদা।

মানুষ বিপরীত স্বপ্নের মানুষের প্রতিও প্রচণ্ড আকর্ষণ অনুভব করে। শুভ ভাবতে পারেনি, মানসী এটা করতে পারে।

শুভ নিজেকে আর কীভাবে সামলাবে। মা-বাবার জন্যই এখন তাকে বাঁচতে হবে।

শুভ কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। চলেই যাবে দেশ ছেড়ে। কি আছে এই পোড়ার দেশে। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, কোনো বিচার নেই। বাসের অযোগ্য এক রাজধানী। কোনো কালেই এই দেশে থাকতে চায়নি সে। মানসীকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মানসী!

মাকে ছেড়ে যাওয়াটাই কঠিন সিদ্ধান্ত। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।

যাবার আগে, বাবা পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘মেয়েটা তোকে এত কষ্ট দিল, যে দেশ ছেড়ে, আমাদের ছেড়েই চলে যাচ্ছিস?’

শুভ কিছু বলেনি। বাবা চলে গেলে হু হু করে কেঁদেছে কেবল।

শুভ চলে গেল। জীবনকে সে অন্যভাবে দেখে।

আর মানসী?

ওর খবর বলতে পারছি না।

কোনো এক রাবীন্দ্রিক আলোতে আবার তাদের দেখা হবে। হয়তো, হয়তো বা না।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj