অশনি সংকেত

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

আলী ইমাম

প্রকৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক কলাম : পর্ব ১৬

জীবনানন্দ দাস প্রবল আকুতিভরা মন নিয়ে ভালোবেসেছিলেন বাংলার শ্যামল প্রকৃতিকে। বাংলার নদী, মাঠ, প্রান্তর, জোছনা, শিশির ভেজা ঘাস, কীট-পতঙ্গ সবই তাঁর কাছে প্রিয় ছিল। তিনি তাঁর সেই অনুভবকে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন কবিতার পরতে পরতে।

মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় বিটিভিতে ‘রূপসী বাংলা’র চিত্রায়ণ করতে গিয়ে প্রকৃতিবিদ ড. নওয়াজেশ আহমদের নতুন এক পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলাম। তিনি নিজেও ছিলেন জীবনানন্দের মতো প্রকৃতি ও নিসর্গের রহস্য উন্মোচনে আগ্রহী।

ড. আহমদ তরুলতার চিত্রায়ণ করার সময় আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, আমাদের উত্তর প্রজন্ম হয়তো কবির এ সকল রচনা থেকে সন্ধান পেয়ে যাবে বাংলার বিলুপ্ত কোনো ফুল-পাখি বা তৃণগুল্মের। রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থে প্রায় আশিটির মতো ফুল-ফল-লতাগুল্মের বিবরণ দিয়েছেন। মূর্ত করে তুলেছেন শ্যামলিমাকে। বৃক্ষ ভাবনায় পরিচয় দিয়েছেন কৌত‚হলী চিত্তের। যেনবা বাংলার নিসর্গ তার পেলবতা দিয়ে তাকে অবিরাম হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মায়াবী বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলেছে। এক সুনিবিড় মমতায় তিনি লেখেন :

শাদা ভাঁটপুষ্পের তোড়া আলোকলতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোনফুল বাসকের গায়।

আর এক স্থানে লিখেছেন, ‘তারপর বেতবনে, জোনাকি ঝিঁঝির পথে হিজল আমের অন্ধকারে।’

তিনি তার কবিতার পরতে পরতে আশ্চর্য নৈপুণ্যের সাথে বর্ণনা করে গেছেন বিস্ময়কর রকমের মুগ্ধতাকে। পাড়াগাঁর কিশোরেরা যখন কান্তারে, বেতের নরম ফল, নাটাফল খেতে আসে, ধুন্দুল বীজের খোঁজ করে ঘাসে ঘাসে।

আমরা সে সময় ‘রূপসী বাংলা’য় বর্ণিত বৃক্ষের বিবরণ অনুসরণ করে ভিডিও চিত্রায়ণ করছি। এ বিষয়ে অপরিসীম উৎসাহ ড. আহমদের। তিনি প্রতিটি পঙ্ক্তি উচ্চারণ করছেন। তারপর সংশ্লিষ্ট বৃক্ষের সন্ধান করে তার চিত্রায়ণ করছেন। এ বিষয়ে সত্যজিৎ রায় ছিল তার কাছে আরাধ্য।

১৯৮২ সালে গৃহীত এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় তার জীবনে শান্তিনিকেতনের প্রভাব সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘খোয়াই এর তালগাছের সারি, কোপাই নদীর নিবিড়তা, সর্বোপরি সোঁদামাটির রূপরস আমার জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে লড়াই করবার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। আমার ‘পথের পাঁচালী’র ভিস্যুয়ালের মধ্যে যা সাদা-কালোর ডায়ানোমিকস ও সামঞ্জস্য রয়েছে সেটা নন্দলালের দান বলে আমি মনে করি।’

ড. আহমদ ছিলেন দারুণ রকমভাবে সত্যজিৎ প্রভাবিত। ‘রূপসী বাংলা’র চিত্রায়ণের কালে সত্যজিতের ভিস্যুয়াল সেন্সের মাত্রাকে বিন্যস্ত করতে চেয়েছিলেন। আমি মুগ্ধতার সাথে ড. আহমদের বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ শক্তিকে অনুভব করতে চাইতাম। বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে জীবনানন্দ যে রকম রহস্যময়তার ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন সত্যজিতের দৃষ্টিভঙ্গিটি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল ড. আহমদকে। সত্যজিৎ অবহিত করেছিলেন যে শান্তিনিকেতন তাকে প্রকৃতিকে চিনতে সহায়তা করেছিল। বলেছেন, ‘সেখানে আমি প্রকৃতিকে দেখতে শিখেছি, উপলব্ধি করতে শিখেছি, তার ছন্দ অনুভব করতে পেরেছি। আমাদের ক্যাম্পাসের চারদিকেই তো গ্রামের ছড়াছড়ি। স্কেচ করবার জন্য তখন আমরা প্রায়ই সেসব গ্রামে চলে যেতাম। গ্রাম বাংলার রূপ বৈচিত্র্যের সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয় ঘটল।’ আমরা সেই সৌন্দর্য তৃষ্ণাকে অবলম্বন করে গ্রাম বাংলার পথে-প্রান্তরে ‘রূপসী বাংলা’র চিত্রায়ণ করে চলেছি।

জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ। জাম, বট, কাঁঠালের-হিজলের-অশ্বত্থের করে আছে চুপ। …চোখে ক্লান্তি নাই। কাঠমল্লিকায়, কাঁঠালি শাখায়, করবীর বনে, হিজলের সনে। এই ঘাসে-ফলসা এ ক্ষীড়য়ে যে গন্ধ লেগে আছে।’

বাংলার প্রকৃতির এই রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দকে আবিষ্কার করতে প্রয়াসী ছিলেন জীবনানন্দ। লিখেছেন, ‘আকন্দ ফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ। আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ-আপনার মনে।’

‘আমি চলে যাব বলে চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে। নরম গন্ধের ঢেউয়ে।’

ড. নওয়াজেশ আহমদ একান্ত মনোযোগের সাথে চিত্রায়ণ করতেন ধীর-স্থিরভাবে। শান্ত সৌন্দর্যে অবগাহন করে। ছায়াচিত্রকে পরিস্ফুটিত করতেন। রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন ছিল, ‘ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। সুরের চলমান ধারায় সঙ্গীত যেমন বিনা বাক্যেই আপন মাহাত্ম্য লাভ করতে পারে তেমনি রূপের চলৎপ্রবাহ কেন একটি স্বতন্ত্র রসসৃষ্টি রূপে উন্মোচিত হবে না।’

‘রূপসী বাংলা’র চিত্রায়ণে ড. আহমদ ছবি তুললেন, আম, জাম, বট, চালতা, অপরাজিতা, শটিবন, জামরুল, নাটাফল, করবী, কামরাঙা, কাঁঠালিচাঁপা, কদম, বাসক, শেফালি, শিমুল, পলাশ, ডুমুর, ফণীমনসা, কাঞ্চন।

জীবনানন্দের কাব্য পঙ্ক্তিতে বাংলার নিসর্গ মূর্ত হয়ে রয়েছে। সেখানে ভোরের নরম বাতাসে ঝরে যায় কাঁঠালপাতা, জলাশয়ের কিনারায় পাওয়া যায় কলমির ঘ্রাণ, হাঁসের পালকে পানি ফোঁটা চিকচিক করে। পুকুরের পানির নিচে ভেসে চলে চাঁদা আর রুপোলি সরপুঁটি। কবি অজ¯্র বিচিত্রিতায় উদ্ভাসিত করেছিলেন রূপসী বাংলাকে। আর আমরা সেখানে খুঁজে পাই আত্মপরিচয়ের শিকড় কাহিনী। মধুক‚পী ঘাসের সতেজ গন্ধ তাকে উদ্বেলিত করে। পানের বরজ, লেবুবন, কামরাঙার রঙ তাকে আলোড়িত করে। তাই লিখেছেন, ‘বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে। ওখানে হিজল গাছ ছিল এক পুকুরের জলে। বহুদিন মুখ দেখে গেছে তার। আমরা জীবনানন্দ উল্লিখিত হিজল-বট-তমালের ঘনীভূত নীল ছায়াকে অনুভব করতে চেয়েছি। হিজলের বর্ণনায় কবি এক স্বতন্ত্র দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। বারবার করে তিনি ফিরে আসতে চেয়েছেন কাঁঠাল ছায়াতে। কাঁঠাল শাখায় লক্ষীপেঁচার মায়াবি চোখ দেখেছেন। লিখেছেন, ‘অজ¯্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত। তিনি অশ্বত্থপাতার মৃদু গুঞ্জন শোনার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন মাঠ থেকে মাঠে। যেন স্বগতোক্তি করেছেন, মাঠে মাঠে ফিরি একা। দেখেছেন অশ্বত্থের শুকনো পাতা পড়ে আছে ¤øান শাদা ধুলোর ভিতরে। পাখি-লতাগুল্ম-কীটপতঙ্গের নিবিড় জগতকে অনুভব করতে চেয়েছেন।

ড. নওয়াজেশ আহমদ জীবনানন্দের দৃষ্টি উন্মোচনকারী আশ্চর্য ক্ষমতার ভেতর দিয়ে আমাকে অন্তরঙ্গ আলোকে পরিচয় করিয়ে দিলেন রূপসী বাংলার অপরূপ প্রকৃতির সাথে।

ড. আহমদ আমাকে জানালেন কর্ণফুলীর নদী তীরের বৌদ্ধ গ্রাম বেতাগির এক প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাহিনী যে তার গ্রাম থেকে শৈশবেই চলে গিয়েছিল দূরবর্তী অঞ্চলে। শেষ বয়সে অন্তিম মুহূর্তে পুনরায় ফিরে এলো স্বগ্রামে। বটমূলের নিকটে চীবরে শরীর আবৃত করে গ্রামবাসীদের উদ্দেশে শুধু উচ্চারণ করল, ‘আমাকে কিন্তু তোমরা দাহ করো না। এই বটতলে পুঁতে রাখবে।’

ড. আহমদ জানালেন, এই উক্তির মাঝে যেন প্রচ্ছন্নভাবে মিশে রয়েছে জীবনানন্দ দাশের জীবনবোধ।

কবি লিখেছিলেন, ‘চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্ত‚প। জাম, বট, কাঁঠালের-হিজলের অশ্বত্থের করে আছে চুপ।’

ড. আহমদ বলেছিলেন, ‘গাছকে কেউ খুব ভালোবাসলে গাছও নাকি কথা বলে তার সাথে।’

বট বৃক্ষের রহস্যময় বিকাশ ধারা সম্পর্কে জীবনানন্দ আগ্রহী ছিলেন। কৌত‚হলী ছিলেন। বট গাছে এসে আশ্রয় নেয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। হরিৎ হরিয়াল, সবুজ টিয়া, খয়েরি, শালিখ, কালো কোকিল, বাদামি পাহাড়ি ময়না, গাঢ় পীত বেনে বৌ। প্রচুর অজানা পাখির কলগুঞ্জনে বটবৃক্ষের পরিবেশ মুখর হয়ে ওঠে। মহীরুহের পাতার আড়ালে অজ¯্র লাল ফল উঁকি দেয়।

ড. নওয়াজেশ আহমদ আরো একটি বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তিনি জানালেন জীবনানন্দের কবিতার অনেক ছত্রে রয়েছে শালিখ পাখির উল্লেখ। লিখেছেন,

‘এ মাঠের কয়েকটা শালিখের তরে আশ্চর্য বিস্ময়ে আমি চেয়ে রব কিছুকাল, নদীর চরে, ধানক্ষেতে, সুপুরি বাগানে, আমড়া ও মান্দার গাছের ফোকরে দেখা যেত শালিখ পাখিদের। জামরুল গাছের ডালে বসে থাকা শালিখেরা কিচিরমিচির করে ডেকে পরিবেশটাকে মুখরিত করে তুলতো। জীবনানন্দ রূপসী বাংলার প্রকৃতিতে উল্লেখ করেছেন পাখ-পাখালির কথা। কাক, কোকিল, চিল, দোয়েল, ঘুঘু, ফিঙ্গে, শ্যামা, ডাহুক, বালিহাঁসের সাথে এসেছে শালিখের কথাও।

বাংলাদেশের নয় প্রজাতির শালিখ হলো গোশালিখ, ঝুঁটি শালিখ, ভাত শালিখ, ধলাতলা শালিখ, তেল শালিখ, গাঙ শালিখ, কাঠ শালিখ।

জীবনানন্দের রূপসী বাংলায় ‘এখানে ঘুঘুর ডাক’ কবিতায় লিখেছেন :

‘উঠোনে কে রূপবতী খেলা করে ছড়ায়ে দিতেছে বুঝি ধান

শালিখেরে : ঘাস থেকে ঘাসে খুঁটে খুঁটে খেতেছে সে তাই

হলুদ নরম পায়ে খয়েরি শালিখগুলো ডলিছে উঠোন।’

জীবনানন্দের বর্ণনায় শালিখের ঝাঁক পেয়েছিল নতুন এক ব্যঞ্জনা। অই পাখিদের ভেতর দিয়ে কবি যেন রূপসী বাংলার এক ভিন্নধর্মী আবহকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

‘আজ সারাদিন এই বাদলের জলে ধলেশ্বরীর চরায়, গাঙ শালিখের ঝাঁক মনে হয়, যেন সেই কালীদহে ভাসে, এই পাখিগুলো কিছুতেই আজিকার নয় যেন নয়।’

প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক ও আলোকচিত্র শিল্পী সৌরভ মাহমুদ একটি বই লিখলেন, ‘বাংলার এবং জীবনানন্দের শালিখেরা’ নামে। আমাদের পরিবেশ সাহিত্যে এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। পাখি ও নিসর্গের প্রতি তার মোহমুগ্ধতা তাকে করে তুলেছে অনিসন্ধিৎসু নিসর্গ প্রেমিক। জীবনানন্দ দাশের পাখি ও প্রকৃতির বর্ণনার মাঝে সৌরভ মাহমুদ খুঁজে পেলেন এই বইটি লেখার প্রেরণা। জীবনানন্দের বিবরণে ছিল :

‘একদিন দুপুরবেলা একা একা নিজের ঘরে বসে থেকে কিছুই ভালো লাগছিল না আর। ভাবলাম, একবার দেশের বাড়িতে চলে যাওয়া যাক। সেখানে এখানে হেমন্ত, ধান ঝরেছে- মাঠ হয়ে আছে হলুদ- শুকনো পাতা উল্টিয়ে দোয়েলগুলো পোকা খুঁটে খায়। খয়েরি রঙের ডানা মেলে বিকেলের বিষণœ চিল উড়ে উড়ে কাঁদতে থাকে। বেতের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কোরার অর্থপূর্ণ ডাক ভেসে আসে। অপরাহ্নের রোদের ভিতর বিমর্ষ মাছির দল গুঞ্জন করে ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভিতর হারিয়ে যায়। দিগন্ত নিস্তব্ধ থাকে। শুধু হাতের কাছে ফেরে দু-চারটি শালিখ ও চড়াই।’

এভাবে জীবনানন্দ তার আশ্চর্য, রহস্যময়, কুহকী ভাষার প্রকৃতি ও পরিবেশের অন্তরালের দ্যোতনাকে উপলব্ধি করেন।

সাম্প্রতিকালে যখন প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে তখন আমাদের মনোজগতকে স্পন্দিত করার মানসে এসব দ্যোতনাকে অনুভব করা আবশ্যক। জীবনানন্দ তার ‘নিরুপম যাত্রা’ উপন্যাসে শালিখ পাখিদের এনেছিলেন এভাবে : ‘দুধারে মাঠ প্রান্তর-খেজুরের জঙ্গল-আখের খেত, বড় বড় সোঁদাল গাছ, পাকুর, ঝরঝরিয়া ও অর্জুনের বন-নিস্তেজ বিকেল বেলায় কোল থেকে নেমে পৃথিবীর ভরা সোনালি রোদের হুড়োহুড়ি- শূন্য ধানক্ষেত, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কাশ, খড়ের স্ত‚প, গাঙ শালিখের ওড়াওড়ি- তারপর রাত্রি নেমে আসে- অবসন্ন ঝিঁঝির ডাক।’

প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক এই কলাম ‘অশনি সংকেত’ রচনা করতে গিয়ে ক্রমাগতভাবে উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে বিভিন্ন কবি সাহিত্যিক লেখকদের প্রকৃতি বন্দনার কথা। জীবনানন্দ দাশের বিবরণ আমাদের চিন্তা জগতে অনুরণন তুলে যায়। তিনি যখন লেখেন, ‘শালিখের ঠোঁট হলদে না হয়ে নীল হলেও ভালো হতো যেন পা যদি অত কটকটে হলদে না হয়ে পাকা ধানের মতো সোনালি রঙের হতো, তাহলে এই ধান দূর্বার হেমন্ত বিকেলের বেশি মানাতো তাকে আমাদের বাসমতীর মতো দেশে।’

পাখিদের ভাষা বুঝতে চেয়েছিলেন জীবনানন্দ।

কবি আল মাহমুদ তার কিশোর কবিতা ‘তারিকের অভিলাষ’-এ তাই লিখেছিলেন :

একবার পাখিদের ভাষাটা যদি

শেখাতেন সোলেমান পয়গম্বর।

জানতাম পাতাদের আড়ালে তারা

খড় দিয়ে কেন গড়ে ঘর সুন্দর।

কোন সুখে আকাশের নীল অঙ্গন

ভেঙে দেয় পাখিদের প্রাণ-সঙ্গীত

পাই যদি পাখালির প্রান্তিক মন

ছুঁই তবে আকাশের নীল অন্তর।

ভৌগোলিক অবস্থান আর ঋতু-বৈচিত্র্যের কারণে আমাদের দেশে নানান জীবনের সমাহার ঘটেছে। আমাদের দেশটি অনেক প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। এ সকল কারণে এখানে বৈচিত্র্যময় প্রতিবেশ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধি এসেছে।

সাম্প্রতিককালের বিশ্বজুড়েই জলবায়ু, প্রকৃতি, পরিবেশ বা বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিপন্ন পরিবেশের কারণে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। কবি আল মাহমুদ সেইসব প্রকৃতি বিনষ্টকারীদের সাথে বৈরিতা স্থাপন করতে বলেছেন। যারা নির্বিচারে বৃক্ষ-নিধনে নিয়োজিত, পক্ষী নিধনে ব্যাপৃত তাদের থেকে দূরে থাকার কথা বলা হচ্ছে শিশুসাহিত্যে। তাই দুঃখ ভারাক্রান্ত চিত্তে আল মাহমুদ লেখেন :

‘যে ছেলেটা বৃক্ষ কাটে পুষ্প ছেঁড়ে, ভাঙে পাখির বাসা,

সে তো কেবল ফড়িঙ ধরা বৃক্ষে চড়া ভাবে খেল-তামাশা।

প্রকৃতিকে বাঁচায় যারা সেই শিশুরা বাঁচুক জগত জুড়ে।

তার সাথে দাও আড়ি ফুল পাখিকে কাঁদায় যারা

যেও না তার বাড়ি।’

পরিবেশ দূষণ প্রক্রিয়া এখন অশনি সংকেতের মতো পৃথিবীর অধিবাসীদের উদ্বেগাকুল করে ফেলেছে। পৃথিবীর বিপন্ন পরিবেশের কথা ভেবে আমরা মারাত্মক উৎকণ্ঠিত চিত্তে রয়েছি। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর পরিবেশকে আরো দূষিত করে ফেলছি আমরা। প্রকৃতির সৌন্দর্য বিবরণে সমৃদ্ধ লেখক, কবিদের রচনাবলি সে কারণে আমাদের এতটা আলোড়িত করছে।

প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণের ফলে পশুপাখিরাও খুবই বিপদে পড়েছে। কিছু কিছু প্রজাতি তো ইতিমধ্যেই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং আরো অনেকেই সেই মহাপ্রস্থানের পথেই হাঁটছে। প্রকৃতির এই দ্রুত পাল্টানো আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের খাপ-খাওয়াতে না পেরে কিংবা বাসস্থানের সংকটে পড়ে তারা বিলুপ্ত। যারা বেঁচে আছে, তাদের জীবন চক্রেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেমন, পরিযায়ী পাখিরা বছরের যে নির্দিষ্ট সময়ে উড়ে আসত, সেই সময়টা তারা এখন আর মোটেও পছন্দ করছে না। তাদের এতদিনের গন্তব্যও সরে গিয়েছে অন্য কোথাও। প্রত্যেক বছর সারা পৃথিবীতে ৩৪ মিলিয়ন একর জমির গাছ কেটে ফেলা হয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জন্য দায়ী যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড, তার অন্তত ২৫ শতাংশই আসে এই পরিমাণ গাছ কাটার জন্য। আমরা যে ঈঙ২ বাতাসে ত্যাগ করি, তা নিয়ে গাছ বাতাসে আর আমাদের ফুসফুসে প্রাণদায়ী অক্সিজেন ভরে দেয়। সীমানা ভেঙে নগর যত ছড়িয়ে পড়ছে, আরো বেশি জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে, পুকুর-মাঠ-নাবাল জমি ভরাট করে আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাট আর শপিংমল হচ্ছে, অনেক যোজন দূরে পৃথিবীর মেরু প্রান্তে তখন হিমবাহ গলতে শুরু করছে। থাকার জন্য বাড়ি তো বানানো হচ্ছে, কিন্তু পৃথিবীটাই যে কতদিন আর বাসযোগ্য থাকবে, এই প্রশ্ন নিয়ে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীকুল তোলপাড় শুরু করে দিয়েছেন।

লুৎফর রহমান রিটনের ছড়া ‘হে মানুষ তুমি বাঁচো প্রকৃতি বাঁচুক তে ফুটে উঠেছে সেই আর্তি :

প্রকৃতির প্রতি তুমি না হলে সদয়

পৃকৃতি বিরূপ হবে তোমার প্রতি,

প্রকৃতির এতোটুকু ক্ষতি যদি হয়-

প্রকৃতি করবে জেনো তোমার ক্ষতি।

লোভের কী পরিণতি জানো নির্বোধ?

লোকালয় সভ্যতা সকলই বিনাশ!

প্রকৃতির ক্রোধ আর তার প্রতিশোধ-

সহ¯্র মানুষের লাশ আর লাশ…

আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি সেই অশনি সংকেতকে। বাড়ছে আমাদের উৎকণ্ঠার বিম্বিত প্রহর। বিনাশের কাল বাড়িয়ে দিয়েছে রক্তিম ক্ষুধা।

আমরা কোথায় যাবো, কত দূরে যেতে পারি আর?

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj