জলের আখ্যান

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

হরিশংকর জলদাস

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ১১

একদিন জগাইয়ের চোখে পইড়ে গেলাম। লইয়া আইল আমারে সরদারবাড়িতে। থাইকতে দিল, খাইতে দিল। সরদারগিন্নি নাম দিল পাঁচ নম্বর দাসী। থাকা খাওয়ার বিনিময়ে আমাকে শোধ দিতে হয়।’

‘শোধ দিতে হয়! কী শোধ দাও তুমি?’ খাওয়া বন্ধ রেখে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে সুখলতা।

এতদিন সরদারবাড়িতে থেকে থেকে দাসীটি যেন লজ্জার মাথাটা খেয়ে বসেছে। যেন বহুবার বহুভাবে লাঞ্ছিত হতে হতে নারীত্বের সকল সম্ভ্রমবোধের কথা সে ভুলে গেছে। সে যেন ফল-ফুল-হীন, পত্র-বল্কলহীন এক শুষ্ক বৃক্ষ।

দাসীটি অবলীলায় বলল, ‘দেহের ক্ষুধা মিটাইতে হয় আমারে, রাইতের বেলা জগাই আসে ঘরে। দলাই মলাই করে। শইলে শইল ডলে।’ বলতে বলতে থেমে যায় দাসীটি। দেউড়ির বাইরে চলে যায়। বলে যায়, ‘খাওয়া শেষ করো। এঁটো ঘেঁটো লইয়া যামু।’

সুখলতা খাবে কী, আতঙ্কে তার গলার পানি শুকিয়ে যায়। অক্ষিগোলক কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। সে দরজার দিকে থাকায়। দেউড়ির দরজায় তেমন টেকসই হুড়কো দেখতে পায় না সুখলতা। একী করেছে সে! খোদ নিজে বাঘের খাঁচায় এসে ঢুকেছে! যে-বাড়িতে দাসীদের নির্বিচারে ধর্ষণ করা হয়, সে-বাড়ি থেকে সে কি নিজের পবিত্র দেহকে অক্ষত রেখে বাপের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে? কী মূর্খামি করেছে সে! এখানে না এসে মা-বাবাকে গতরাতের কথা খুলে বলা উচিত ছিল তার। বাপও তো সমাজের মাননীয়। মৎস্যসমাজের অনেকে তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে। বাবা নিশ্চয় জগাইয়ের অপরাধের বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নিতে পারত। তা না করে একী করল সুখলতা!

দাসী এসে দেখল- খাবার যেই-কে-সেই অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একদানা খাবারও মুখে তোলেনি সুখলতা।

সুখলতার মানসিক বিপর্যস্ততার কথা বুঝতে দাসীটির বেগ পেতে হলো না। খাওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার অনুরোধও করল না সে। ধীরে ধীরে খাদ্যাধারগুলো গুটিয়ে নিল। যাওয়ার আগে করুণ কণ্ঠে বলল, ‘ভুল কইরেছ দিদি। রাইতটা সাবধানে কাটাইবে। এই বাড়িটা ব্যভিচারের জায়গা। সকাল হইলে এক মুহূর্তও থাইকবে না এইখানে।’ বলে দ্রুত দেউড়ির বাইরে বেরিয়ে যায় দাসীটি।

গভীর সংশয়ে দেউড়ির মধ্যে এদিক ওদিক করতে থাকে সুখলতা। তার মধ্যে ত্রাসের সঞ্চরণ। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় এখন। ক্লান্তির প্রকোপে তার শরীর ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। দাসীটি তার ক্লান্তির সবটাই কেড়ে নিয়ে গেল। তার শরীরটা ভীষণ অবসন্ন, কিন্তু ভয় তার অবসন্নতাকে গলা টিপে মারছে। কী হবে তার? যদি তার ওপরও ওই রকম নির্যাতন নেমে আসে! ধুর না। ওই রকম দুর্ব্যবহার কখনো তার ওপর হবে না। সে একজন সম্মানিত মাছের কন্যা। সোমনাথ ইলিশের মেয়ে সে। আর সরদার তো তাকে ভীষণ সমীহ করেই কথা বললেন। মাইয়া ছাড়া কোনো কথাই বললেন না তিনি। তাঁর কোনো মেয়ে নেই। ফলে কন্যার প্রতি সরদারের অগাধ ভালোবাসা থাকাই তো স্বাভাবিক। সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই তো সরদার তাকে মাইয়া মাইয়া বলে সম্বোধন করলেন। যে পরিবারের কর্তা কাউকে মেয়ের মর্যাদা দেন, সেই পরিবারে কি তার অমর্যাদা হতে পারে? যে কোনো কিছুর বিনিময়েও পঞ্চু সরদার তার মান-সম্মান রক্ষা করবেন। নিশ্চিতরূপেই করবেন।

ভাবতে ভাবতে গভীর তন্দ্রা সুখলতাকে ঘিরে ধরল। শ্রান্তি তাকে কাহিল করে তুলল। একটা সময়ে, অনেকটা নিজেরই অজান্তে গা এলিয়ে দিল সুখলতা। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমে অচেতন হয়ে গেল সে।

রাত গহিন-গভীর। চারদিক সুনসান। মাঝে মাঝে অঘ্রাণের সমুদ্রঢেউয়ের মৃদু দুলুনি। এই দুলুনি ঘুমের বিঘ্ন ঘটায় না, বরং তন্দ্রার গাঢ়তা বাড়ায়। তন্দ্রাচ্ছন্ন সুখলতার সকল ক্লান্তির অপনোদন হয়ে যায় একটা সময়ে। তার মন শান্ত হয়ে আসে। শিরা-উপশিরার রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়। নিদ্রার কাছে সুখলতা সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত হয়। এইভাবে কেটে যায় বহুক্ষণ। রাত্রির দ্বিতীয় যাম অতিক্রান্ত হয়।

এই সময় হঠাৎ নিজের দেহের ওপর প্রবল একটা চাপ অনুভব করে সুখলতা। যেন জগদ্দল একটা পাথর তার গায়ের ওপর চেপে বসেছে। তার ঘুম চটে যায়। সুখলতা দেখে- পঞ্চু তাকে বুকে জড়িয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে। পঞ্চু সরদার সুখলতার বিবর-সন্ধানে মগ্ন তখন।

সুখলতা চিৎকার করে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু সরদারের দেহের প্রবল চাপে তার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। সুখলতার মুখ দিয়ে শুধু আকুতিভরা গোঁ গোঁ শব্দ বেরিয়ে আসতে থাকল। পঞ্চু সরদারের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ততক্ষণে সে সুখলতার বিবরের সন্ধান পেয়ে গেছে। সেই বিবরে শরীরের সকল উল্লাস ঢেলে দিতে মশগুল তখন সরদার।

কর্ম সম্পাদন শেষে পঞ্চু সরদার দেউড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। রক্তাক্ত সুখলতা পড়ে থাকে।

বাপের পরে ঘরে ঢোকে জগাই।

শরীরে যত শক্তি অবশিষ্ট ছিল তা-সবকে একত্রিত করে সুখলতা চিৎকার দিয়ে ওঠে- ও মারে…।

বুকফাটা চিৎকারে পাশে শোয়া রতিকান্তের ঘুম ভেঙে যায়। ধড়মড়িয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। জোর ধাক্কা দেয় সুখলতার গায়ে। মর্মন্তুদ গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে লতা? কী হয়েছে তোমার? এরকম করে চিৎকার দিয়ে উঠলে কেন? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলে নাকি?’

সুখলতার সমস্ত শরীর জুড়ে তখন থরহরি কম্পন। রতিকান্তের এতগুলো প্রশ্নের জবাব দিবে কী, কথা বলার শক্তি পর্যন্ত তার দেহে অবশিষ্ট নেই। তার শরীর একেবারে শিথিল। একটা মৃত মাছ যেমন সমুদ্রতলে নিথর দেহে পড়ে থাকে, সুখলতাও তেমনি স্পন্দনহীন হয়ে পড়ে আছে। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত তার। কোথায় আছে, তা বুঝতেও তার অনেকক্ষণ সময় লাগল। স্বামীর কণ্ঠ তাকে ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে লাগল। নিজের অজান্তে সে তার দেহ-গহŸরের দিকে মনোসংযোগ করল।

সেখানে সে কোনোরূপ ব্যথা অনুভব করল না। লাঞ্ছনার কোনোরকম প্রদাহ সে তার স্ত্রীলিঙ্গে উপলব্ধি করল না। চট করে চোখ খুলল সুখলতা। তার ধারে-কাছে পঞ্চু বা জগাইকে দেখতে পেল না।

সুখলতা আস্তে-ধীরে বুঝতে পারল- সর্দারবাড়ি যাওয়া থেকে বলাৎকারের সব ঘটনাই স্বপ্নপ্রসূত। বাস্তবে সে সমস্তরাত তার স্বামীর পাশেই ছিল।

বহুক্ষণ বাদে সুখলতার পূর্ণ সংবিৎ ফিরে আসে। ভোরের আলো তখন ফুটি ফুটি। জলে মৃদু দোলা। বোঝা যাচ্ছে- উপরাংশে ঢেউ খুব উত্তুঙ্গ নয়। অগ্রহায়ণের ধীর বাতাসে যেরকম জলতরঙ্গের সৃষ্টি হবার কথা, ঠিক সেরকম তরঙ্গই উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে। জলে লবণের আধিক্য। ফসফরাস বেশি বলে গোটা সমুদ্র জুড়ে সাদা ফেনার রাজত্ব। উপরিতলে যা-ই হোক, জলতলে সুখবহ বাতাবরণ। স্রোত বহমান। উত্তর থেকে দক্ষিণে, দক্ষিণ থেকে উত্তরে। আহ্নিকগতির প্রভাবেই জোয়ার-ভাটা। জোয়ার-ভাটার গতিপ্রকৃতি বা স্রোতের প্রাবল্য-দুর্বলতা সমুদ্র-নির্ভর জনজীবনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু সমুদ্রাভ্যন্তরের মৎস্যদের ওপর এসবের প্রভাব সামান্যই। জন্মের পর থেকে মাছেরা সমুদ্রজলের নির্মমতা আর মমতার সঙ্গে জড়িত। তারা জানে- এই বঙ্গোপসাগর তাদের বাঁচা আর বৃদ্ধির যেমন আধার, তেমনি তাদের মৃত্যুর জয়ডঙ্কা বাজে এই সমুদ্রতলেই। এই সমুদ্রেই তাদের বাঁচন, এই সমুদ্রেই তাদের মরণ। মনুষ্যজীবনের মতো কত অভাবনীয় ঘটনা মৎস্যসমাজে সংঘটিত হচ্ছে, তাদের কোনো ইয়ত্তা নেই। কত ভাঙা-গড়া, কত উলাস-ম্রিয়মাণতা, কত ভালোবাসা-নিষ্ঠুরতা, কত প্রেম-ধর্ষণ, সন্তান হারানোর গভীর আর্তনাদ, প্রেমবঞ্চিত তরুণীর মর্ম-যাতনার সাক্ষী হয়ে আছে এই বঙ্গোপসাগরের নোনা জলরাশি।

কে কার সন্ধান রাখে? সুখলতার স্বপ্নে-দেখা লাঞ্ছনার সংবাদও কেউ জানল না। রতিকান্তের শত অনুরোধেও স্বপ্নের কোনো কথাই সুখলতা বলল না।

শুধু মরা গলায় বলল, ‘ছয় মাস পুরাতে আর কতদিন বাকি আছে রতি?’

রতিকান্ত সুখলতার প্রশ্নের মানে ধরতে পারল না। ঘুমে তখন তার চক্ষু ঢুলুঢুলু। ঘুমচোখে জড়ানো-গলায় রতিকান্ত জিজ্ঞেস করল, ‘কোন ছয় মাস পুরনোর কথা বলছো তুমি লতা?’

‘তোমার শ্বশুরবাড়িতে থাকার বাধ্যবাধকতার ছয় মাস।’

নিদ্রামগ্ন মাছ মরণের দেশে চলে যায়। বলা হয়ে থাকে- কোনো প্রাণী ঘুমালে তার আত্মাটা নাকি দেহ থেকে নির্গত হয়ে যায়। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় সে আত্মা, তার কোনো হিসেব-নিকেশ থাকে না। আচমকা তাকে জাগাতে গেলে বিঘ্নের সৃষ্টি হয়। দূরগামী আত্মা নিজ দেহে ফিরে আসতে সময় নেয়। কিন্তু ঘুমন্ত প্রাণীটিকে দ্রুত জাগাতে গেলে আত্মাটির ফিরে আসার গতিটিও দ্রুততম হয়। দ্রুততম গতিতে ফিরে আসা আত্মাটি দেহে থিতু হতে না হতে যদি প্রাণীটি জেগে যায়, তখন দেহাভ্যন্তরে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এই অস্থিরতা প্রাণীটির বোধবুদ্ধি কিছু সময়ের জন্য স্থবির হয়ে ফেলে। সে জাগ্রত বটে, কিন্তু জাগ্রত প্রাণীর মতো সে আচরণ করে না। বিপুল এক ঘোরের মধ্যে থাকে সে, অন্তত কিছু সময়ের জন্য।

রতিকান্তের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল সে। দেহটাও বশে ছিল না। চিন্তামণির জালে আটকে যাওয়ার দৈহিক ব্যথা সে কাটিয়ে উঠলেও মানসিক বিপন্নতা তার এখনও তেমন করে কাটেনি। মানসিকভাবে বিপন্নরা তন্দ্রামগ্ন হলে তা কখনো কখনো গাঢ়তম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ভীতি এবং ক্লান্তি রতিকান্তকে প্রায়-অচেতন করে তুলেছিল।

রতিকান্ত চেতন-অচেতন অবস্থাতেই আবার প্রশ্ন করেছে, ‘কীসের বাধ্যবাধকতা?’

এবার সুখলতা উত্তেজিত হয়। রতিকান্তের পেট বরাবর একটা জোর ঢুস দেয় সুখলতা। আচমকা গুঁতা খেয়ে রতিকান্তের তন্দ্রাভাব সম্পূর্ণ কেটে যায়। একাগ্র হয়ে স্ত্রীর কথায় মনোসংযোগ করে সে। বলে, ‘এখানকার সময় ফুরাতে আরও মাসখানেক সময় বাকি।’

‘সময়ের বাধ্যবাধকতা আমি মানি না। অন্তত এই সময় আমি মানতে রাজি নই।’ (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj