শব্দের মায়ায় জড়ানো ঋণ ও কিছু স্মৃতি

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

রিমি মুৎসুদ্দি

শব্দের শরীর থেকে আত্মাকে বা বলা ভালো আত্মিক বোধকে তুলে এনে এক মায়াময় অথচ নির্মোহ সত্যের সামনে পাঠককে এনে দাঁড় করায় ছয়ের দশকের অন্যতম কবি মৃণাল বসুচৌধুরীর কবিতা। তাই বিমূর্ত নয় সহজ অথচ গভীর ও সুস্পষ্ট উচ্চারণে জীবনের জটিলতম দৃশ্যমান জগতের কথা উঠে আসে তাঁর পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে।

‘কেবল আমিই বুঝি কোনখানে লুকোনো পেরেক/ক্ষতচিহ্ন রেখে যায় জুতোর ভেতরে’

এই যে ‘ক্ষতচিহ্ন’ তা কিন্তু মানবজীবনের নিয়তি অথচ প্রত্যেকেই প্রায় তাদের সেইসব চিহ্নগুলো সযতেœ নিজস্ব করে রাখে একেবারে ব্যক্তিগত কোনো কুঠুরিতে। ‘জুতোর ভেতর’ শব্দবন্ধটির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাব্যিক প্রয়োজনেই নয় যেন এক অনন্ত সত্যের মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয়া। যা আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের চোখে দৃশ্যমান নয় কবির মনন সেইসব বোধে অনায়াস যাতায়াত করতে পারে। তাই জটিলতম দৃশ্যমান কথাটা লিখলাম। কারণ, যা কিছুই দৃশ্যমান তার বোধের ক্রম নির্ভর করে দেখতে পাওয়া ও দেখতে না পাওয়ার মধ্যে। অনেকক্ষেত্রে যেটু দেখা হলো না তা অনুভবে থেকে যায়। এই দেখা না দেখার দ্ব›দ্ব ও বিপন্নতাকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়। আর এইসব প্রাপ্তি ধীরে ধীরে পাঠকের নিজের হয়ে ওঠে।

‘কারা যেন চলে গেছে/ ঘরময় পদচিহ্ন/ তবু আমি বুঝতে পারিনি কে আমার গোপনতা/ চুরি করে নির্জনতা চুরি করে/ দেয়ালে একটি কথা লিখে গেছে ছবিটির পাশে/ আলোড়ন/ অন্ধকারে স্পষ্ট তীব্রতায় কারা কারা কারা’

এই যে স্পষ্ট অথচ তীব্র এই স্বর ছয়ের দশকে অন্যান্য কবিতার ভাষা থেকে কবি মৃণাল বসুচৌধুরীর কাব্যভাষাকে একদম স্বতন্ত্র একটা কবিতা চেতনায় পরিণত করে। যে চেতনাকে আমরা হয়ত কবির সিগনেচার বলে থাকি কখনও। শব্দশৈলীর নির্মাণ তাই দেশ কালের সীমানা পেরিয়ে প্রতিটা পাঠকের মনে যেন নিজস্ব একটা স্বর বা উপলব্ধি হয়ে পৌঁছায়। অথচ কবিতাটি না পড়া পর্যন্ত এ উপলব্ধি তো আয়ত্ত করা যেত না! এমনটাই মনে হতে থাকে। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে বিষয়টা। যেমন সাধারণত বৃষ্টি আর সোঁদাগন্ধের মিথোষ্ক্রিয়ায় একটা অপরিণত প্রেমের মতো কাঁচা বাশের গন্ধ মিশে থাকে। অথচ কবির ভাষা খোঁজে ‘নিবিড় বৃষ্টির মধ্যে একা একা/ওড়াবে আঁচল’

কোনো এক পরিণতিহীন প্রেমের কথা মনে পড়ে যায়। আর প্রেমহীন রাত্রের কথাও যেন ধ্রæব সত্যি হয়ে ফিরে আসে কবির কলমে- ‘রাত্রির ঘুমের মধ্যে কেউ কারো নয় /প্রত্যেকেই নিঃসঙ্গ জ্যোৎস্নায় /চারাগাছ কিংবা কোনো মাধবীলতার কাছে হেঁটে যায়

তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো তাই করুণ নয় যেন নিঃসঙ্গ এক পর্যটকের অনুভূতিমাত্র। যা ফেলে রেখে যায় না কিছুই কিন্তু ভ্রমণ অভিজ্ঞতার মতো অমূল্য সম্পদ অক্ষর পথ জুড়ে ছড়ানো থাকে। প্রেম আর ‘স্মৃতির সুষমা’ বিষণœতা নয় যেন এক মায়াময় আবেশে ঘিরে রাখে। যেন ‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’-র আখ্যানে জাদুবাস্তবতা নয় মূর্ত কোনো এক প্রতীকী চরিত্রের যাপন। যেখানে হ্যামলেটের বাঁশিওলার মতোই গল্পবলা জাদুকর রয়েছে। আর কবি সেই জাদুর ছোঁয়ায় সৃষ্ট শব্দের দ্যুতিতে কোনো এক প্রার্থনাগৃহের আবহ তৈরি করে চলেছেন পাঠক মনে।

কবি শুধু নির্জন মগ্নতাই দিয়ে যাননি। স্মৃতির ‘অলিভ গাছ’ বেয়ে রোদ বৃষ্টির অনুচ্চারিত শান্তি আর ‘নির্ভীক শপথহীন’ স্পষ্ট ও প্রয়োজনীয় উক্তি-

‘আমাদের মধ্যে কোনো ধর্ম বা আইন নেই /নেই পরিচ্ছন্ন কোনো চুক্তি /যার কাছে দায়বদ্ধ প্রেম /যে কোনও সময় তাই /যাই /বলে চলে যেতে পারো’

এই পঙ্ক্তিগুলো পড়তে যতটা সহজ মনে হয়। নির্মাণে অসাধারণ অনুনকরণীয় শৈলী কবিকে সেই ছয়ের দশক থেকে আজো বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান দিয়েছে। বরং বলা ভালো, কবি বাংলা কবিতাকে তাঁর এই নিজস্বতা দিয়ে চলেছেন অক্লান্তভাবে। অত্যন্ত যন্তসহকারে ও সন্তর্পণে- ‘কবি খুব সন্তর্পণে /পাখির ভাষায় মানুষের জন্য /শোকগাথা গাইতে গাইতে ফিরেছিল ঘরে /পাণ্ডুলিপি দিয়ে জ্বালানো আগুনে /নিশ্চিন্তে পুড়িয়েছিল নিজের হৃদয় /তারপর নতজানু হয়ে /নির্বিকার প্রার্থনায় চেয়েছিল অবিচ্ছিন্ন ঘুম’

শুধু ঘুম নয় নিয়ন্ত্রিত আবেগও কতটা প্রয়োজন তা যেন কবি উপলব্ধি করলেও আবেগ শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে থাকে না কোনো মানুষেরই। তাই কবি বলে দেন- ‘যারা সৎ ছিল তারা ঠিক সতর্ক ছিল না /তারা চেয়েছিল /স্বপ্ন ও বাতাস তীব্র স্বাধীন থাকুক…………………/যারা সৎ ছিল /নিজের স্বপক্ষে তারা কিছুই রাখেনি’

কবির কবিতাগুলি নিয়ে লিখতে বসলে তাঁর কবিতার কাছেই বারবার ফিরে যাচ্ছে মন। আসলে নির্মোহ বা নির্লিপ্তি শব্দগুলো যতটা অনায়াস ততটা অনায়াসে আয়ত্ত হয় না। তাই ফিরে ফিরে অগ্রজ শ্রদ্ধেয় কবির কবিতার অংশগুলোই চলে আসছে। দিল্লিতে এসেছিলেন কবি ও কবিকন্যা অরুন্ধতী। আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল কবির সান্নিধ্যে দিল্লির ঐতিহাসিক পুরানা কিল্লায় কিছুটা সময় ভ্রমণের। দিল্লি থাকার সুবাদে বহুবার আসা হুমায়ুন মকবারা ও পুরানা কিল্লায় আমার সেদিন শুধু ভ্রমণই নয় প্রাপ্তি ঘটেছিল কিছুটা বেশি। উপহার পেয়েছিলাম কবির গদ্য সংগ্রহ ‘শব্দ স্মৃতিভার’। অরুন্ধতীদি বলেছিল, ‘বাহ! বেশ ইতিহাস সচেতন তো তুমি’। আসলে কবি সান্নিধ্য ও মুঘল ইতিহাসের গলিঘুঁজি নিয়ে দিল্লি আসার আগে থেকে আমার গবেষণা কবিকে জানানোর লোভ সামলাতে পারিনি। প্রত্যেক অনুজ লেখককেই কবি উৎসাহ দেন। আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলেন। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

‘শব্দ স্মৃতিঘর’ বইটিকে আমার বাংলা কবিতার একাডেমিক ডিসকোর্সের এক প্রয়োজনীয় পুস্তক মনে হয়েছে। বিশেষ করে ‘কবিতা, শব্দ : কিছু প্রশ্ন কিছু মুগ্ধ অভিজ্ঞতা’- এই অধ্যায়টি। রবীন্দ্রনাথ এই বইটির অনেকটা জুড়ে। কবির নিজস্ব স্মৃতিকথায়, অভিমানে, যন্ত্রণায়, আনন্দে বিষাদে রবীন্দৃনাথ ভীষণভাবে মিশে রয়েছেন। কিন্তু প্রথম অধ্যায়টি কবিতার সংজ্ঞা বা পরিচিতি সম্বন্ধীয় ব্যাখ্যা। আর এই ব্যাখ্যার রূপদান করতে কবি বাংলা কবিতার বিভিন্ন দশকভাগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বুঝিয়েছেন, কীভাবে রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দ থেকে বুদ্ধদেববসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আলোক সরকার এবং ভাস্কর চক্রবর্তী, তুষার রায়, অনন্য রায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখের কবিতা একে অপরের থেকে একেবারে আলাদা এক একটা বাঁকবদল। সহজ ভাষায় ‘যুগচেতনা’, বামপন্থি ভাবধারা, সামাজিক অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে সেই সময়ে রাষ্ট্রশক্তির রোষানলে আক্রান্ত কবি দিনেশ দাসের কথা, ঐতিহ্যে বিশ্বাসী অথচ নিজস্ব সুনিপুণ নির্মাণ শঙ্খ ঘোষের কবিতার আলোচনা, এই সবকিছুতেই সমৃদ্ধ কবির কবিতা বিষয়ক গদ্যটি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় কবিতার ভাষা পাঠকের ভাষা অর্থাৎ মানুষের ভাষা হয়ে ওঠে আবার শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা যেন বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আশির দশক পর্যন্ত বাংলা কবিতার এক বিস্তৃত সমৃদ্ধ আলোচনা পাই গদ্যটিতে।

তবুও কিছুটা অনুযোগ বা অপ্রাপ্তি যেন রয়ে গেল। কবিতা সিংহ, গীতা চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জলি দাশ- কবিদের কথা ও কবিতা আলোচনা শোনার ইচ্ছে ছিল। হয়তো পরিসর বৃহৎ নয়। তাই বাদ পড়েছেন কিছু প্রিয় নাম।

ঠিক কতটা লিখলে একজন কবির সমগ্র কাজ নিয়ে আলোচনা করা যায় ততটা লেখা হলো না। বাকি রয়ে গেল আরো অনেক না বলা কথা। তবুও তাঁর লেখা শেষ পর্যন্ত একটা বিশ্বাসের কথা বলে। সেই বিশ্বাসে নিরাপত্তাহীন, অবিশ্বাসী এই পৃথিবীতে মানুষকে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে বলে। ভালোবাসায় বিশ্বাস রেখে সমস্ত জীবননদী পেরোনোর আশ্বাস দিয়ে যায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj