জামায়াত ছাড়ার তাগিদ > জামায়াতিদের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী করা ভুল ছিল : কামাল

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামির সঙ্গ ছাড়তে ত্রিমুখী চাপে পড়েছে বিএনপি। সরকারপক্ষ ও বিদেশি মিত্রদের এমন পরামর্শ অনেক দিনের। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর তা আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। এমনকি বিএনপিকে প্রকাশ্যে জামায়াত ছাড়তে বলেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের প্রার্থী করা ‘ভুল’ ছিল বলে স্বীকারও করেছেন জোটের শীর্ষনেতা। রাজধানীর আরামবাগে গতকাল শনিবার বিকেলে গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ড. কামাল। দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যেই বিএনপি মহাসচিবকে বলেছি। তারা বলেছে, জামায়াত ধানের শীষে নির্বাচন করেছে, ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে তো নেই। তারপরও আমরা বিষয়টির সুরাহা চাই।

গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পর দলটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের একটি লিখিত বক্তব্য দেয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত যেসব ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে, তা সংশোধন করে ভবিষ্যতের জন্য সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এই বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, আমরা অতীতে জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতির চিন্তাও করিনি। ভবিষ্যতেও জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করব না। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে বলবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি বলা যেতে পারে। নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতকে ২২টি আসন দেবে, সেটা তারা জানা জানতেন না বলেও জানান ড. কামাল। গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির টিকিট পাবে জানলে ঐক্যফ্রন্টের অংশ হতেন না বলেও মন্তব্য করেন এই জোটের আহ্বায়ক। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, আমি যদি আগে জানতাম (যে জামায়াত নেতারা বিএনপির টিকিট পাবে), তবে আমি এর অংশ হতাম না। কিন্তু যদি এই ব্যক্তিগুলো ভবিষ্যতের সরকারে কোনো ধরনের ভূমিকা পালন করে, আমি একদিনও থাকব না।

অন্যদিকে, জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েই রাজনীতে এগিয়ে যেতে চায় বিএনপি। এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকার ভোরের কাগজকে বলেন, জামায়াত বিএনপির জোটসঙ্গী। সুতরাং ছাড়া না ছাড়া বিএনপির সিদ্ধান্ত। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কী বললেন সেটা তাদের বিষয়। তিনি বলেন, জামায়াত থাকলে কারো যদি সমস্যা হয় তারা জোট থেকে চলে যাক।

বিএনপির এই নেতা বলেন, এই মুহূর্তে বিএনপি জামায়াত ছাড়লেই সরকার শফি হুজুরের মতো তাদের গিলে ফেলবে। জামায়াতকে সঙ্গে রাখার বিষয়ে বিএনপির লাভ-ক্ষতির প্রশ্নে তিনি বলেন, জামায়াতের ভোটব্যাংক রয়েছে যা দলের জন্য অবশ্যই বড় ধরনের সাপোর্ট। তাছাড়া আর না হোক দুঃসময়ে তারা দলের পক্ষে লাঠি তো ধরতে পারবে। বিএনপির ভেতরে ও বাইরে জামায়াত ছাড়ার বিষয়ে যথেষ্ট চাপ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই জামায়াতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিএনপির অনেক নেতা। গণফোরামের নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্যের শপথ নেয়ার প্রশ্নে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ। তাছাড়াও কর্মসূচি নির্ধারণসহ বিভিন্ন ইস্যুতেও দেখা দিয়েছে মতবিরোধ। জামায়াত ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টের যে সমীকরণ দাঁড়িয়েছে, তাতে জামায়াতকে জোটে রেখে আর বেশি দূর এগুনো যাবে না। তাই জোট ধরে রাখতে জামায়াতকে ছাড়তেই হবে। ফলে বিএনপি জোট থেকে জামায়াত বেরিয়ে যাক বলেই চাইছে এখন বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী। অনেকের মতে, দলীয় ফোরামের বৈঠক হলে এ ইস্যু সামনে আসবে এবং তখন দলটির বিএনপির সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন হবে।

তবে জামায়াত ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টে ভাঙন সৃষ্টি হবে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, এ রকম একটি নির্বাচনের পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে। অনেক মান-অভিমান, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা ভর করে। তিনি বলেন, বিএনপির এখনই জরুরি কাউন্সিল সভা ডাকা দরকার। তার মতে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট টিকে থাকলেও ২০ দল ভেঙে যাওয়া ভালো। জামায়াতের এখনই বেরিয়ে যাওয়া উচিত।

অন্যদিকে, ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে বিএনপির অন্য মিত্র দলগুলোর ভেতরেও। ২০ দলীয় জোটের নেতারা মনে করছেন, বিএনপি নতুন গড়া ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে বেশি মাতামাতি করছে এবং তাদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ নিয়ে অসন্তুষ্টি শুরু হয়েছিল শরিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে শুধু ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে যাওয়ায় মধ্য দিয়ে। ২০ দলীয় জোটের শরিক অন্য দলগুলো প্রথম দফায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল। ওই দলগুলোর নেতাদের অভিযোগ, এরপর নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন সভা ও সংবাদ সম্মেলনও বেশির ভাগ সময় বিএনপি ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে করেছে।

আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও ফ্রন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ কারণেই মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের গত ৩ জানুয়ারি ঢাকায় ডেকে সভা করা হলেও তাতে যোগ দেননি জামায়াত, এলডিপি ও বিজেপির প্রার্থীরা। এমনকি ভবিষ্যতেও তারা যাবেন কি না সন্দেহ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন অনেকেই। এমনকি বহুদিনের জোটসঙ্গী জামায়াত ছাড়ার বিষয়ে চাপ দেয়ায় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের উপরে ২০ দলের নেতারা নাখোশ। জামায়াত নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলে ড. কামাল ঐক্য ভেঙে দেয়ার অজুহাত খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন জোটের নেতারা।

জানা গেছে, বিএনপির হাইকমান্ড এখনই জামায়াত বিষয়ে চিন্তা না করলেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা জামায়াতসঙ্গ ত্যাগের পক্ষে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে দলের ভেতরে-বাইরে এবং দেশি-বিদেশি চাপের মুখে রয়েছে বিএনপি। এ ছাড়াও খোদ বিএনপির হাইকমান্ডের অনেক নেতাও ক্ষুব্ধ জামায়াতের ওপর। তাদের মতে জামায়াতের কারণেই গেল নির্বাচনে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক দল ও শক্তি বিএনপিকে সমর্থন দিতে অনীহা জানিয়েছে। এই সুযোগে আওয়ামী লীগ সফল ভাবে সরকার গঠন করেছে। এ পরিস্থিতিতে তারা জামায়াতকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে পরামর্শ দিচ্ছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নীতিনির্ধারক বলেন, জামায়াত নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করে। তাদের কাছে দেশ ও জোট মুখ্য নয়। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এই দলটি নির্বাচনে জয়লাভ নয়, নিজেদের অস্বিত্ব প্রমাণে সংকীর্ণ রাজনীতি করে। গত আগস্টে সিটি নির্বাচনে বিএনপির নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের মতো প্রার্থী দিয়েছে। এর আগে ২০০৮ সালে বিএনপি অপ্রস্তুত থাকা অবস্থায় নির্বাচনে যেতে বাধ্য করে এ দলটি। বিএনপিকে বাদ দিয়ে হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা অংশ নিত, যদি তাদের নিবন্ধন থাকত। তাই জামায়াতকে বিশ্বাস করার কিছু নেই।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj