স্কুলে ভর্তিতে বাড়তি ফি, মাউশি তবে করছে কী

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে রাজধানীর নামি-দামি স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে। ইচ্ছেমতো ফি নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের ওপর তা চাপিয়ে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আর অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করতে গিয়ে অনাকাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন অভিভাবকরা। তারা ক্ষুব্ধ হলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় কিছুই করতে পারছেন না। যদিও অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায় বন্ধে গত বছর থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বিশেষ টিম কাজ করছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধে সেসব টিমের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।

সারা দেশের বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম। ভর্তি পরীক্ষা ও লটারিসহ সব প্রক্রিয়া শেষে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিচ্ছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ভর্তির সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করছে না। এ তালিকায় আছে ঢাকা মহানগরীর নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আদায় করছে তারা। এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। সেই ব্যয় নির্বাহ করতেই বেশি অর্থ নেয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাড়তি ফি নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিলেও অবশ্যই তা ফেরত দিতে হবে।

২০১৮ সালে প্রণীত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তিতে পাঁচ হাজার টাকার অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে পারবে না। তবে আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও এমপিও বহির্ভূত শিক্ষকদের বেতনভাতার জন্য শিক্ষার্থী ভর্তির সময় মাসিক বেতন, সেশন চার্জ ও উন্নয়ন ফিসহ বাংলা মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা ও ইংরেজি মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা নেয়া যাবে। সরকারের এই নীতিমালা উপেক্ষা করে রাজধানীর নামি-দামি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিগুণ-তিনগুণ ফি আদায় করছে। এ তালিকায় উঠে এসেছে ধানমন্ডির জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুল এন্ড কলেজ, একই এলাকার স্ট্যামফোর্ড স্কুল এন্ড কলেজ, কাকলি হাইস্কুল এন্ড কলেজ, বাড্ডা আলাতুন্নেছা স্কুল এন্ড কলেজ, মিরপুরের মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম।

এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজের কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে এ প্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা ভর্তি ফি নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য উন্নয়ন ফি বাবদই নেয়া হচ্ছে বাড়তি ২৫ হাজার টাকার মতো। অন্যান্য শ্রেণিতে আদায় করা হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বললেন, আগে তো আরো বেশি ফি নেয়া হতো। এবার কিছুটা কমেছে।

অতিরিক্ত ফি আদায়ের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় অনেক বেড়েছে। পরিচালনা কমিটির নির্ধারণ করা ফি-ই নেয়া হচ্ছে।

বাড্ডা আলাতুন্নেছা স্কুল এন্ড কলেজের কয়েকজন অভিভাবক জানান, সেখানে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তিতে ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এলাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি ফি হিসেবে ১০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। যা সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

এদিকে ডা. হারুণ অর রশিদ নামে এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতি বছরই ভর্তিসহ নানা রকম ফি বাড়াচ্ছে ধানমন্ডির জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুল। অথচ এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো তদারকি চোখে পড়ে না।

এ ব্যাপারে ধানমন্ডির জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহ খান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান অনেক বড় আর অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। তবে সরকারিভাবে কোনো সুবিধা পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি ফি নিতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে তারা তুলনামূলকভাবে কম ফি নিচ্ছেন। আর বেশি বেশি সরকারি সুবিধা পেয়েও আশপাশের অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি নিচ্ছে। একই ব্যাখ্যা দিয়ে বাড্ডা আলাতুন্নেছা স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামসুল আলম বলেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যয় অনেক বেশি। কিছু বেশি ফি নিয়ে ব্যয় মেটানো হচ্ছে। না হলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।

সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত আদায় করার ব্যাখ্যা প্রায় সব প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও কর্তৃপক্ষের একইরকম। তাদের সাফ কথা, প্রতিষ্ঠানের ব্যয় আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বেশি টাকা না নেয়া হলে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ বাধাগ্রস্ত হবে। তবে অভিভাবকদের অভিযোগ, কোনো কারণ ছাড়াই কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ফি আদায় করছে। প্রতি বছরই নানা অজুহাতে তারা ফি বাড়াচ্ছে। সন্তানদের শিক্ষাজীবনের কথা ভেবেই তারা প্রতিবাদ করতে পারছেন না। অতিরিক্ত এই ফি আদায় বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন অভিভাবকরা।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ করতে মাউশির ১১টি টিম মাঠে নামে। তারা কৌশলে তথ্য নিয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে। পরে আদায় করা অতিরিক্ত ফি তারা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল। সে সব টিম এখন সক্রিয় আছে। অভিযোগ পেলেই তারা ব্যবস্থা নেবে।

জানতে চাইলে মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক সরকার আব্দুল মান্নান ভোরের কাগজকে বলেন, বাড়তি ফি নিয়ে কেউ রেহাই পাবে না। অবশ্যই তাদের ফেরত দিতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অভিভাবকের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি। গণমাধ্যম সূত্রে এমন খবর আসছে। বাড়তি ফি আদায় বন্ধে শিগগিরই মাঠে নামানো হবে বিশেষ টিমকে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj