আল্লামা শফীর বক্তব্যে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় : প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : কয়েক বছর আগে নারীদের ‘তেঁতুলের’ সঙ্গে তুলনা করে সমালোচিত হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী আবারও আলোচনায় এসেছেন। এবার মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পাঠানোর জন্য ওয়াদা করানো এবং নারী শিক্ষার প্রতি তার কদর্য ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ট্রল। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে তার বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দাবি উঠেছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ারও।

গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। … ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে পারবেন। বিবাহ দিলে স্বামীর টাকাপয়সা হিসাব করতে হবে। আর বেশি যদি পড়ান, পত্রপত্রিকায় দেখতেছেন আপনারা মেয়েকে ক্লাস এইট, নাইন, টেন, এমএ, বিএ পর্যন্ত পড়ালে ওই মেয়ে আপনার মেয়ে থাকবে না। অন্য কেহ নিয়ে যাবে।’

নারীনেত্রীরা বলছেন, চরম মৌলবাদী এই বক্তব্য নারীর অধিকার ও সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের ২৮ (২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ ২৮ (৩) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।’ অথচ আল্লামা শফী ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মনগড়া ফতোয়া দিয়ে দেশ ও সমাজকে আলো থেকে অন্ধকারে নিতে চান।

মানবাধীকারকর্মী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম ভোরের কাগজকে বলেন, এমন বক্তব্য দিয়ে শফী হুজুর অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছেন। তিনি আগেও নারীদের অবমাননামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তখন নারী সমাজের পাশাপাশি পুরুষ সমাজও তার বক্তব্যের বিরোধীতা করেছে। আমরা শিক্ষার মাধ্যমে নারীকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলছি। বর্তমান সরকারও নারী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তার এমন বক্তব্য দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আমরা বলছি, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে। নারী সমাজকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রেখে শুধু মাত্র ফাইভ পাস করিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠা যায় না। এমন বক্তব্যের জন্য তার ক্ষমা চাওয়া উচিত।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, একজন ধর্মীয় নেতা হয়ে শফী হুজুর নারীদের নিয়ে যে অশালীন বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু অনাকাঙ্খিতই নয় অগ্রহণযোগ্যও। আমাদের দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন রয়েছে। তার বক্তব্য সেই আইন অমান্য করেছে। তিনি যেভাবে কথাটি বলেছেন সেটি নারীর প্রতি অমর্যাদাকর। নারী মানুষ। কোন ঘটি বাটি না যে তাকে নিয়ে পুরুষ টানাটানি করবে। আমি যতদূর জানি তার নিজের মেয়েরা লেখাপড়া জানা। যদি তাই হয়, তবে তিনি কেন স্ববিরোধী কথা বলছেন? শুধু বক্তব্য দিয়েই নয় তিনি উপস্থিত তার অনুসারীদের কাছে ওয়াদাও নিয়েছেন। তারা যদি তাদের মেয়েদের আর শিক্ষা দিতে না চান এর দায় কার? শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের এত কোটি কোটি টাকা ব্যায় তাহলে কেন? সরকারের নীতিমালা ও আইন অমান্য করে ফেসবুকে পোস্ট দিলেও তাকে আইনের আওতায় আনা হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারী, শিক্ষামন্ত্রী নারী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়েও নারীরা অবস্থান করছেন। আমরা এক্ষেত্রেও সরকারের একটি সুষ্পষ্ট অবস্থান চাই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ রোল মডেল। এই অবস্থানে থেকে কেউ এ ধরণের বক্তব্য দিলে তা দেশের ভাবমূর্তিই ক্ষুন্ন হয়।

বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, শফী হুজুরের বক্তব্য চরম মৌলবাদী বক্তব্য। স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী, সংবিধান বিরোধী এমন বক্তব্য কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। জাতির কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত।

এদিকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শিরীন আখতার এক বিবৃতিতে বলেছেন, আহমেদ শফীর নারী শিক্ষা বিরোধী বক্তব্য সংবিধান বিরোধী, মৌলিক অধিকার বিরোধী, মানবাধিকার বিরোধী, নারী অধিকার বিরোধী, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী এমনকি ইসলাম বিরোধী। ইসলামে কোথায়ও নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো কথা নাই।

নারীপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার বিষয়ে শফী হুজুরের কদর্য ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য অপমানকর। এমন পশ্চাৎপদ এবং নারীশিক্ষা বিস্তারের পক্ষে সরকারি নানামুখী পদক্ষেপ ও নীতির পরিপন্থি বক্তব্য দেয়া ও ওয়াদা করানোর জন্য সরকার তার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তাও জানতে চায় নারীপক্ষ।

সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওশন আরা রুশো ও সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু বিবৃতিতে বলেন, এই বক্তব্যের ফলস্বরূপ স্কুল, কলেজ পড়–য়া মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় পরতে পারে এবং মেয়েদের স্কুল-কলেজ আক্রান্ত ও ছাত্রীরা হয়রানীর শিকার হতে পারে। নারীবিদ্বেষী, স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী, সংবিধান বিরোধী শফী হুজুরকে অবিলম্বে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে অন্যথায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা।

শফী হুজুরের নারীশিক্ষা বিরোধী ফতোয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার জন্য সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নারী জোট আহ্বায়ক আফরোজা হক রীনা। এক বিবৃবিতে তিনি বলেন, সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ-খবরদারি-নজরদারিতে আনতে চায়; সরকার দাওরা হাদিস সনদকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। এটাকে সরকারের দূর্বলতা ভেবে তেঁতুল হুজুররা বাড়াবাড়ি করলে তার ফলাফল তেঁতুল হুজুরদের ভোগ করতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স এক বিবৃতিতে সংবিধান পরিপন্থী নারী বিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়ায় শফী হুজুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj