শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল : আল্লামা শফীর বক্তব্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

চট্টগ্রাম অফিস : মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পড়ানোর আহ্বান জানিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আহমেদ শফীর দেয়া বক্তব্যের তীব্র নিন্দা-প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেছেন, আহমেদ শফীর বক্তব্য দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে শুধু সাংঘর্ষিকই নয়, চরম মৌলবাদী-প্রতিক্রিয়াশীলও বটে। সমগ্র নারী সমাজকে অবমাননা করার শামিল- এ ধরনের একের পর এক বক্তব্য দেয়ায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি উঠেছে।

গতকাল শনিবার শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের কাছে হেফাজত নেতার বক্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বক্তব্য একান্তই হেফাজত আমিরের ব্যক্তিগত অভিমত। এই বক্তব্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশের যে কোনো নাগরিকেরই বাক স্বাধীনতা আছে। তার মনের ভাবনা প্রকাশ করার অধিকার আছে। তবে আমি সম্মানের সঙ্গে বলব, আমরা সবাই যারা বাক স্বাধীনতার চর্চা করছি, আমরা যেন এ বিষয়টা মাথায় রাখি যে, সংবিধান অনুসারে আমাদের সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা যেন বৈষম্যমূলক মন্তব্য না করি। নওফেল বলেন, বর্তমান সরকার নারীশিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। নারীরা শিক্ষায় এখন অনেক এগিয়ে। কারও ব্যক্তিগত অভিমত এই অগ্রযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারবে না। বাংলাদেশের শিক্ষানীতি প্রণয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা অথবা শিক্ষা খাতে কোনো নির্বাহী দায়িত্বে তিনি নেই। যেহেতু তিনি কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবস্থানে নেই, তিনি অভিমত দিলেই সেটা রাষ্ট্রীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত বা প্রতিফলিত হবে, এমন চিন্তা করার অবকাশ নেই।

মুক্তিযোদ্ধা, নারীনেত্রী, অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃত বেগম মুশতারি শফি ভোরের কাগজকে বলেন, এ ধরনের জঘন্য বক্তব্য একটি লোক দিনের পর দিন কীভাবে বলতে পারেন? এত ধৃষ্টতা সে কোথায় পায়? এত সাহস কোত্থেকে পায়? যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ বড় বড় পদসমূহে নারীরা সগৌরবে অবস্থান করছেন, সেখানে এ ধরনের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীসহ নারী সমাজকে হেয় করা, অবমাননা করার শামিল। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষ সমঅধিকারের যে বিধান রয়েছে, তার এ বক্তব্য এর পরিপন্থী। অবিলম্বে তাকে দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি দেয়া উচিত।

চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের বক্তব্যের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। এই বক্তব্য দেশের সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানে সবার সমঅধিকারের কথা বলা আছে। মৌলিক অধিকার শিক্ষা বিস্তারে যেখানে বর্তমান সরকার নারী শিক্ষা প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেখানে এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এই আহমেদ শফী একের পর এক এই ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম শাখার সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের অর্জন একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির যে উত্থান এবং এই অপশক্তিকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লালন-পালনের ফলে এখন আমাদের এই ধরনের বক্তব্য শুনতে হচ্ছে। এই বক্তব্য দেশের জন্মের প্রেক্ষাপট এবং সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধান পরিপন্থী বক্তব্যের জন্য আহমেদ শফীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

উদীচী চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শীলা দাশগুপ্তা বলেন, আহমেদ শফী নারীদের সম্পর্কে তার বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে নারী সমাজকে মধ্যযুুগীয় কায়দায় গৃহবন্দি করতে চান। তার নোংরা ও কদর্য মনোভাবের পরিচয় তিনি এর আগেও তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। পবিত্র ধর্মের অপব্যবহার, কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বৈষম্যহীন, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ১১৮তম বার্ষিক মাহফিলে মাদ্রাসার পরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের আমির আহমেদ শফীর দেয়া একটি বক্তব্য ও ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। সেখানে বলা হয়, মেয়েদের স্কুল-কলেজে না দিতে এবং দিলেও সর্বোচ্চ ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়ানোর জন্য ওয়াদা নিয়েছেন আহমদ শফী।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj