বিনোদ বিহারী চৌধুরীর প্রতি আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৯

বেগম মুশতারী শফী

অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। তিনি আমাদের কালের একজন বিপ্লবী। আমাদের সময়ের মহানায়ক। তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার এবং কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এই বিপ্লবী বিনোদ দার কাছ থেকেই জেনেছি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অনেক অজানা কথা। সময়ে সময়ে তিনি গল্পচ্ছলে বলতেন সেসব কথা। ১৯৭১ আমার জীবনে গভীর ক্ষত রেখে গেলেও এই বিপ্লবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আমি মানুষের জন্য কাজ করতে মহৎ অনুপ্রেরণা পেয়েছি, কথা বলতে দ্বিধা নেই। আমাদের সেই আপন মানুষটি আজ আর নেই। চিকিৎসার জন্য তিনি গিয়েছিলেন দেশের বাইরে কলকাতায়। এখানে তাঁর পরিবারের কেউ ছিল না। তাঁর দুই ছেলে ছিল, তারা ছিলেন কলকাতায়। তিনি মাঝে মাঝে ছেলের কাছে যেতেন। সেবার গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্কটিস হাসপাতালে ১০৩ বছর বয়সে প্রাণ ত্যাগ করেন চট্টগ্রামের এই মহান বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী।

তাঁর সম্পর্কে একটি কথাই এক বাক্যে বলা যায়- সারা জীবন দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য লড়াই করেছেন, ভেবেছেন সব সময় তাদের নিয়ে। তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনজন ছাড়া একাই থেকে গেছেন বাংলাদেশ- এই চট্টগ্রামে। এখানে তাঁর স্বজনরা কেউ না থাকলেও চট্টগ্রাম ছেড়ে তিনি যেতে চাননি কোথাও। তিনি ছিলেন শুভবুদ্ধি, উন্নতি ও প্রগতির এক প্রতীক হিসেবে।

শিকড় তাঁকে টানতো, তাই এই মাটিকে ভালোবেসে এখানেই সমাহিত হলেন। তাঁর জীবনের মহত্তম ঘটনা, মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়া। তাঁর কাছ থেকেই জেনেছি সে সময় বিপ্লবীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।

তিরিশের দশকের শেষ দিকে ব্রিটিশবিরোধী এক যুদ্ধে অনেক বিপ্লবী নিহত হন। সেই যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন বিনোদ বিহারী। সে সময় তিনি কিশোর ছিলেন। পরে তাঁকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে গোপনে চিকিৎসা করানো হয়, কিছুদিন পর একটু সুস্থ হলে আবার সেখান থেকে পালিয়ে আবার আন্দোলনে যোগ দেন। এরপরই তিনি ব্রিটিশ সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং কারা ভোগ করেছেন দীর্ঘদিন। এই জেলখানায় তাঁর জীবনের নবজাগরণ শুরু হয়। এই বন্দি অবস্থায় থেকে আইএ, বিএ এবং ল’ পাস করেছেন।

তিনি কেবল চট্টগ্রাম জেলখানায় আটক ছিলেন না, ভারতবর্ষে একাধিক জেলে তাঁর বন্দি জীবন কেটেছে। বারবার জেল আর পুলিশের নজরদারিতে উৎকণ্ঠিত তাঁর মা-বাবার পীড়াপীড়িতে ১৯৪০ সালে তিনি বিয়ে করেন চট্টগ্রামে বিশিষ্ট আইনজীবী কিরণ চন্দ্র দাশের কন্যা বিভা দাশকে। এই তো ১৯৪০ সালে বিয়ে করলেন বিনোদ দা। ’৪১ সালে আবার কারাবন্দি হন। এভাবেই কাটে তাঁর জীবন।

ইতোমধ্যে দেশে ঘটেছে অনেক ঘটনা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলো, পঞ্চাশ সালে মাতৃভাষা আন্দোলন, বায়ান্ন সালে রফিক জব্বার সালামের জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠিত হলো। ষাটের দশকে কলকাতা থেকে ফিরে এলেন এই বিপ্লবী বিনোদ বিহারী বাংলাদেশে। তার দুই পুত্র ভারতেই রইলো। তার স্ত্রী বিভা চৌধুরী চট্টগ্রামে অপর্ণাচরণ গার্লস হাই স্কুলে চাকরি নিলেন এবং বিনোদ দা চট্টগ্রাম শহরে রহমতগঞ্জ নিজ গৃহে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করলেন।

সেই ষাটের দশকের শেষ ভাগে তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি বাড়িতে বসেই স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। খুব যতœসহকারে বাচ্চাদের গণিত ও ইংরেজি পড়াতেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী। তাঁর পাণ্ডিত্য ও ধৈর্য ছিল অসাধারণ। আমার ছেলেমেয়েদেরও পড়াতেন এই পণ্ডিত ব্যক্তি। এরপর থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৭৩ সালে কলকাতা থেকে বিপ্লবী কল্পনা দত্ত, গণেশ ঘোষ, অনন্ত সেন চট্টগ্রামে এসে প্রবর্তক সংঘে উঠেছিলেন। সে সময় বিনোদ দার সঙ্গে একবার সভা করেছিলেন, সে সভায় আমিও ছিলাম।

একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আমি চট্টগ্রামের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। সব সময় তিনি সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার পরামর্শ দিতেন আমাদের। আজীবন থেকেছেন সক্রিয়, সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।

নব্বইয়ের দশকে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন হওয়ার পর হতে যুক্ত হন বিনোদ বিহারী চৌধুরী।

জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করেছি আমি। এসব আন্দোলনেও বিপ্লবী বিনোদ বিহারী আমাকে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। জীবনের শেষ সময় রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অন্যায়-অবিচার ও অপরাধের বিরুদ্ধে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন তিনি। দেশ স্বাধীন হলেও যে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, একথাও বারবার বলে গেছেন তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় চট্টগ্রাম বিপ্লব ও আধ্যাত্মিকতার স্থান। আর তাই তো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গোটা বাংলাদেশের মধ্যে চট্টগ্রামের অবদান অনেক বেশি। দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে বিনোদ বিহারীর মতো আমাদের স্বপ্ন সার্থক হবে। বিপ্লবীকে এর চেয়ে আর কী উপহার দিতে পারবো আমরা?

এই মানুষটির প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj