জ্যাঠামণিকে যেভাবে দেখেছি

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৯

রাণা দাশগুপ্ত

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে ‘জ্যাঠামণি’ বলেই ডাকতাম। যে পরিবারে জন্ম আমার সে পরিবারেই জন্মেছিলেন বীরকন্যা প্রীতিলতা। তা-ই সেই ছোটবেলা যখন থেকে খানিকটা বুঝতে শিখেছি তখন থেকে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের গল্প শুনেছি। সেইসাথে শুনেছি মাস্টারদা সূর্যসেন, লোকনাথ বল, অনন্ত সিংয়ের সাথে বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর কথা। জালালাবাদ যুদ্ধে গলার এক পাশে গুলি লেগে আহত হলেও তিনি মারা যাননি। ভারি রোমাঞ্চকর মনে হতো তখন।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরুর পর বিপ্লবী বিনোদ চৌধুরীকে ‘ভারতীয় এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিয়ে যায়। কিছুদিন পর আমার বাবাকেও। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বছরখানেক পর দুজনেই বেরিয়ে আসেন চট্টগ্রাম কারাগার থেকে আরো কয়েকজনের সাথে। এর কয়েক দিন পর বাবা আমাকে নিয়ে বিপ্লবী বিনোদ বিহারীর বাসায় গেলেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন। স¯েœহে তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সে-ই হলো তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। বিপ্লবী বিনোদ চৌধুরী বাবাকে ছোট ভাইয়ের মতো ¯েœহ করতেন। দুজনের মধ্যে ছিল গভীর সখ্য।

আইনজীবী পিতার সন্তান ছিলেন বিনোদ চৌধুরী। শৈশবে পিতাকে হারিয়েছেন। কৈশোরে পদার্পণের আগে মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন এরপর থেকে ক্রমশই গোটা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের বাইরে ছিল না। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর আত্মত্যাগের ধারায় সিক্ত হয়ে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ব্রিটিশ গভর্নরের ওপর আক্রমণ চালাতে গিয়ে শহীদ হন বিনয়, বাদল, দীনেশ। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ‘অহিংস’ ধারার পাশাপাশি ‘সহিংস ধারায় ভারতের মুক্তি’- এ চিন্তাধারায় বাংলায় গড়ে ওঠা বিপ্লবী ‘যুগান্তর’ বিনোদ চৌধুরী দলের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন সেই ছোটবেলায়- চট্টগ্রাম কলেজে এফএ (আইএ) ক্লাসে ভর্তির পর। গোপনে তাঁরই সহপাঠী বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের (পরে ফাঁসিতে মৃত্যু) কাছে গোপনে অস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করেন, যোগ দেন মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী দলে। মাস্টারদা তখন একদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক, অন্যদিকে গোপন বিপ্লবী দলের প্রধান। ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে যে ক’জন চট্টগ্রামের পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করে ব্রিটিশ ইউনিয়নের জ্যাক পতাকা নামিয়ে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পতাকা উত্তোলন করে মাস্টারদাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ছিলেন তাঁদেরই একজন। ১৯৩০ সালের ১৮ থেকে ২২ এপ্রিল- এ ৪ দিন চট্টগ্রামকে গোটা ভারতে সা¤্রাজ্যবাদী শাসন থেকে স্বাধীন রাখার যে ইতিহাস সে ইতিহাসের অন্যতম ধারক তিনি। ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধে আহত হয়েও তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ব্রিটিশ সরকার জীবিত বা মৃত তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ৫০০ টাকার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন।

ব্রিটিশের কারাগারে থাকাবস্থায় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী তাঁর ছাত্রত্ব শেষ করেন। এমএ পাস করে বিএল ডিগ্রি নিলেও কখনো আইন পেশায় যোগ দেননি কিংবা কোনো কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করেননি। নিজ বাসভবনে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করে যা পেতেন তা দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। কারো কাছে হাত পাতেননি তিনি। এমনকি তাঁর অসুস্থতার সময়েও।

ইংরেজ আমলের মতো পাকিস্তানি আমলেও দীর্ঘকাল তিনি কারান্তরালে কাটিয়েছেন। আজন্ম দেশের মানুষের মুক্তির সাধনা করেছেন। অল্পাহারী সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি তাঁর পর্ণকুটিরে।

ব্রিটিশের কারাগারে থাকাবস্থায় বিপ্লবীদের অনেকেই ‘কম্যুনিস্ট পার্টির’ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেও বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ছিলেন তার ব্যতিক্রম। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী হিসেবে সে-ই যে কংগ্রেসী রাজনীতির সাথে যুক্ত হলেন আজন্ম সে-ই রাজনীতির ভাবাদর্শ মনেপ্রাণে গ্রহণ করে মানবসেবায়, সমাজসেবায় পথ চলেছেন। তিনি সর্বদা ন্যায় ও সত্যকে ধারণ করে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে অবিচল থেকেছেন। ক্ষমতার বা অর্থের প্রলোভন তাঁকে তাঁর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি।

ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে কংগ্রেস দলের সদস্য হিসেবে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ‘পাকিস্তান’ নামক উগ্র সাম্প্রদায়িক কৃত্রিম রাষ্ট্র থেকে অনেকে দেশত্যাগ করলেও, তিনি শত প্রতিক‚লতার মাঝেও দেশের মাটি ও মানুষকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হিসেবে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদদের আত্মাহুতির পর যে ক’জন সদস্য পার্লামেন্টে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চায় হয়েছিলেন তার মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন বিনোদ বিহারী চৌধুরী। ভাষার দাবিতে, স্বাধীনতার লড়াইতে চট্টগ্রামে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালনের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলনকে সংঘটিত করেন। এ ব্যাপারে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথেও সাক্ষাৎ করেন বিনোদ বিহারী চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করতেন, ‘দাদা’ হিসেবে সম্বোধন করতেন। ১৯৭৪ সালে দেশব্যাপী অরাজকতার সময় তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে তাঁকে নিজের জীবন নিয়ে সাবধান থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে সখেদে বলেছিলেন, ‘দাদা, বাঙ্গালীরা আমাকে মারতে পারে না।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হওয়ার পর এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি গোটা জাতিকে হত্যা করেছে।’

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকলেও তিনি রাজনৈতিক অনাচার, ব্যভিচার ও দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে তাঁর ভূমিকা পালন করেছেন। সব ধরনের হিপোক্রেসি, শঠতা ও কপটতার বিরুদ্ধে ছিলেন সদা সোচ্চার। ’৭৫-পরবর্তী রাষ্ট্র ও রাজনীতির সাম্প্রদায়িক পালাবদল কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তিনি। ধর্মীয়-বৈষম্যবিরোধী মানবাধিকারের আন্দোলনে নেতৃত্ব তিনি দিয়েছেন তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লড়াইকেও তিনি এগিয়ে নিতে সদা সচেষ্ট থেকেছেন। বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী তাঁর অতীত জীবনের মহৎ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু চট্টগ্রামের নয়, গোটা জাতির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেছিলেন।

শুধু এপার বাংলায় নয়, ওপার বাংলায়ও তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়। তা-ই তো কলকাতায় ১০৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর পর পশ্চিম বঙ্গ সরকার ও সেখানকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাঁর মরদেহকে সামনে রেখে শ্রদ্ধায় নতজানু হয়েছিলেন, সেই মরদেহ ঢাকা বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামানোর পর তাতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়েছিল মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের হাজারো জনতার ফুলেল শ্রদ্ধা জানানোর পর প্রয়াত বিপ্লবীর মরদের তাঁর জন্মভূমি চট্টগ্রামে নেয়ার জন্য হেলিকপ্টারেরও ব্যবস্থা করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। চট্টগ্রামে নেয়ার পর শুধু গার্ড অব অনারই তাঁকে দেয়া হয়নি, হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অযুত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁর মরদেহ দাহ হয়েছিল স্থানীয় অভয়মিত্র মহাশ্মশানে। আশির দশক থেকে প্রয়াত বিপ্লবীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। মৃত্যুতেও হেলিকপ্টারে মরদেহের সাথে সহযাত্রী ছিলাম ঢাকা থেকে চট্টগামে। সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গিয়েছিলেন তাঁর এপিএস, বর্তমানে সাংসদ সাইফুজ্জামন শিখর ও সাংসদ পংকজ নাথ।

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী ছিলেন বিপ্লবী যুগের শেষ নক্ষত্র। তাঁর মৃত্যুতে সেই নক্ষত্রেরও পতন ঘটে। বিপ্লবী যুগের সাথে আজকের যুগের তিনিই ছিলেন শেষ মেলবন্ধন। আজ তিনি ইতিহাসের কিংবদন্তি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj