যুদ্ধ করে করে মরতে শেখার মন্ত্র

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৯

ওমর কায়সার

১৯২৯ সালের একটি রাত। অমাবস্যা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফিরিঙ্গিবাজার অভয় শ্মশানঘাটে যেন অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে আছে। দিনের বেলায় আসতেও এখানে অনেকের গা ছমছম করে ওঠে। রাতের বেলাতো কথাই নেই। সেই অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে ঢেকে রেখে একজনের জন্য অপেক্ষা করছে ১৮ বছরের এক যুবক। এক সময় পিঠে যেন কিসের স্পর্শ পেলো। চমকে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। দেখে সাদা ধুতি, পাঞ্জাবি পরা এক লোক। এই লোকটাকেই দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল যুবক। এতদিন যাকে না দেখেই তারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশকে ভালোবাসতে শিখেছে, দেশের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত হয়েছে। সেই লোকটিই তার সামনে হাজির।

লোকটির নাম মাস্টারদা সূর্যসেন। আর যুবকটির নাম বিনোদবিহারী চৌধুরী। যুবকের বিস্ময়, আর ঘোর যেন কিছুতেই কাটে না। নেতার সঙ্গে প্রথম দেখার বিহŸলতা কাটলো নেতার কথাতেই। প্রথম দেখা, কিন্তু পরিচয় যেন বহু জনমের। আত্মীয়তা অন্তরের। তাইতো প্রিয় নেতা তার শিষ্যকে

প্রথম দেখাতেই জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, কিরে ভয় পেয়েছিস?

বিনোদ বিহারী ভয় সামান্য পেয়েছিলেন বৈকি। কিন্তু বীরের সামনে এসে চিরজীবনের নির্ভয়তার মন্ত্র নিয়ে যাবে যুবকটি কিছুক্ষণ পর। শুরু হবে তাঁর বিপ্লবী জীবনের নতুন আখ্যান।

উপনিবেশ কবলিত, বিদেশিদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে সংগ্রামের দীক্ষা নিতে দেখা করতে এসেছেন তিন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার সূর্যসেন প্রথমেই তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। জানিয়েছিলেন এই পথ বড় কঠিন। একটা অনিশ্চিত জীবন। বড় বন্ধুর বিপ্লবের পথ। পদে পদে এখানে বাধা। যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যু হানা দিতে পারে। অথবা সারাজীবন কারাবাস হতে পারে। নির্বাসনও লেখা থাকতে পারে নিয়তিতে।

কিন্তু বিনোদ কোনো কথা শোনেননি। বলেছিলেন, ‘ইংরেজদের অন্যায়-অত্যাচার নির্যাতন আমি মেনে নিতে পারি না। আমি প্রতিশোধ নিতে চাই।’ শুনে সূর্যসেন স্মিত হাসলেন। সেই হাসির মধ্যে তাঁর ব্যক্তিত্বের অসাধারণত্ব ফুটে ওঠে। ভরাট কণ্ঠে তাঁকে অভিবাদন জানালেন বিপ্লবের পথে। এই লোকটাকে দেখে মনে হয়নি চার বছর জেল খেটে ক’দিন আগেই মুক্তি পেয়েছেন। তিনি নাকি বলতেন, পুরো উপমহাদেশ একটা কারাগার হয়ে আছে। সেখানে জেলখানা কী আর মুক্তিই কী। এই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের সময় বিনোদ বিহারী কল্পনাই করতে পারেননি আর মাত্র পাঁচ বছর লোকটি বেঁচে থাকবেন। চার বছর পর তিনি আবার গ্রেপ্তার হবেন এবং পরের বছর দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাঁর ফাঁসি হবে। ততদিনে হাজারটা সূর্যসেন বিনোদ বিহারীদের মনে জন্ম নেবে। তাঁরাও হয়ে উঠবেন এক একজন মাস্টারদা সূর্যসেন। কারণ তাঁদের ভেতরে বিপ্লবের সেই বীজ তিনি বপন করে দিয়ে গেছেন। আর তাই এই তিন-চার বছরের মধ্যেই ঘটে যায় ব্রিটিশ সরকারের ভিত নড়ে দেয়ার মতো তুলকালাম করা সব কাণ্ড।

সূর্যসেনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরের বছরেই বিনোদ বিহারী তাঁর জীবনের প্রথম অপারেশনে যোগ দেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল। সূর্যসেনের নির্দেশে তাঁদের দলকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। চার দলের চারটি কাজ। প্রথম দলের কাজ ছিল ফৌজি অস্ত্রাগার আক্রমণ করা। দ্বিতীয় দলের দায়িত্ব ছিল পুলিশের অস্ত্রাগার দখল করা। তৃতীয় দল টেলিগ্রাফ ভবন দখলের দায়িত্ব পেল। চতুর্থ দলটির রেললাইন উপড়ে ফেলার কথা ছিল। বিনোদ বিহারী ছিলেন দ্বিতীয় দলে। এই অভিযান সম্পর্কে বিনোদ বিহারী বলেছিলেন, ‘নির্দেশ ছিল রাত ১০টার মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের দামপাড়া পুলিশ লাইনের আশপাশে উপস্থিত থাকার। আমরা মিলিটারির পোশাক পরে, আলমারি ভাঙার জন্য দুখানা শাবল নিয়ে যথাস্থানে উপস্থিত হলাম।… আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে আমাদের দলের আরেকটি অংশ দামপাড়া পুলিশ লাইনের পাহাড়ে উঠে প্রহরীদের আটক করবে এবং বন্দে মাতরম ধ্বনি তুলবে।’ সেই ধ্বনি তুলেই সেদিন অস্ত্রাগার দখল করে সেখানকার সব অস্ত্র নিজেদের করায়ত্ব করেছিলেন বিপ্লবীরা। এই দিনটিই ইতিহাসে চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ নামে পরিচিত। সেদিন তারা অস্ত্রাগার দখলের পর পুরো চট্টগ্রাম শহর দখলে নিয়ে ফেলেছিলেন। বিপ্লবী নেতাকর্মীরা দামপাড়া পুলিশ লাইনে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। গুনে গুনে চারদিন সেই সময় চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল। তাইতো বিনোদ বিহারী বলেন, ‘সাতচল্লিশের ভারতভাগ- দেশভাগ কিংবা একাত্তরের ত্রিশ লাখ প্রাণের আত্মাহুতির বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ আমরা আগেই পেয়ে গিয়েছিলাম।’

যুব বিদ্রোহের চারদিন পর ২২ এপ্রিল চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে প্রথম সম্মুখসমরে অংশ নিয়েছিলেন বিনোদ বিহারী। এইদিন জালালাবাদ পাহাড়ে অবস্থানরত ৫৪ জন বিপ্লবীর ওপর ব্রিটিশ সৈন্যরা আক্রমণ চালিয়েছিল। এই যুদ্ধেই শহীদ হয়েছিলেন ১৫ বছরের যুবক হরিগোপাল বল। আহত হয়েছিলেন বিনোদ বিহারী। তিনি গলায় বুলেটবিদ্ধ হয়েছিলেন।

এরকম কত যুদ্ধ, মহামারী, মন্বন্তর, দাঙ্গা, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ বহু ঘটনার সঙ্গে একটা মানুষ যুক্ত ছিলেন, প্রত্যক্ষ করেছেন একটা মানুষ। বাঙালির একশ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে সমান্তরালভাবে বয়ে গেছে তাঁর জীবন। কালের সাক্ষী এই মানুষটি সমকালীন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গেও সব সময় সক্রিয় ছিলেন। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে যে কোনো অন্যায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সরব সাক্ষী, মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, জালালাবাদ পাহাড় কিংবা অস্ত্রাগার দখলের স্মৃতিবিজড়িত লালখানবাজারের পুলিশ লাইন, কিংবা পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবের মতো নীরব হয়ে যাওয়া মানুষটি এই বাংলার মানুষের মনে চিরজীবন মনুমেন্ট হয়ে থাকবেন।

তিনি যুদ্ধ, মহামারী, মন্বন্তর, দাঙ্গা, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ হাজারো ঘটনা একটা মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন এক জীবনে। বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে সমান্তরালভাবে বয়ে গেছে তাঁর জীবন।

বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী কালের সাক্ষী। সারাটা জীবন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন। বয়সকে তুচ্ছ করে কারো কাঁধে ভর না দিয়ে নব্বই বছর বয়েসেও তিনি বিভিন্ন সমাবেশে উপস্থিত থাকতেন মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য।

১৯২১ সাল। বিনোদ বিহারী তখন ১১ বছরের এক দুরন্ত কিশোর। তাঁর বাবা আইনজীবী কামিনি কুমার চৌধুরী ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। বাবার সংগ্রামী চেতনা খুব স্বাভাবিকভাবে কিশোর বিনোদ বিহারীর মধ্যে সঞ্চারিত হয়। বাবার মতো বিলেতি কাপড় ছেড়ে খদ্দেরের কাপড় পরতে শুরু করেন। বাহুল্যবর্জিত অনাড়ম্বর জীবনযাপন বেছে নেন। রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়ে জনপ্রতিনিধি হলেও কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। বহু প্রলোভন ও হাতছানি উপেক্ষা করেছেন। ছাত্র পড়িয়ে সংসার চালিয়েছেন। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এক রকম সন্ত-সুলভ জীবনযাপন করছেন তিনি।

১৯১১ থেকে ২০১৩ সাল। এই ১০৪ বছরে গ্রহজুড়ে, বাঙালির জনজীবনে ঘটে গেল কত উত্থান-পতন। কত যুগের অবসান আর উন্মেষ ঘটলো। ইতিহাসের এই বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি হয়ে গেছেন ইতিহাসেরই অংশ। মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিনোদ বিহারীসহ তরুণ বিপ্লবীরা সর্বপ্রথম ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চট্টগ্রামকে এক পর্যায়ে মুক্তাঞ্চলও ঘোষণা করেছিলেন তাঁরা।

চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে ঐতিহাসিক সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিনোদ বিহারী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘হঠাৎ একটা গুলি আমার গলার বাঁ দিকে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ঘণ্টাখানেক অচেতন ছিলাম। লোকনাথ দা, শান্তি নাগ, বনহরি দত্তের ডাকে সংবিত ফিরে পেলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম সৈন্যসামন্ত নেই। গলায় তখন অসহ্য যন্ত্রণা। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। বিপ্লবীরা লেঙ্গুট ছিঁড়ে আমার গলায় ব্যান্ডেজ করে দিলেন। আমাদের এক ক্লাসফ্রেন্ড রজত সেন। সে বলল, তোর কষ্ট হচ্ছে খুব, না? তোকে তাহলে গুলি করে মেরে দিই? তখন শুনছি রজতকে উদ্দেশ্য করে লোকদা (বিপ্লবী লোকনাথ বল) বলছেন না, ও বাঁচবে। ওকে গুলি করতে হবে না। ওকে আমরা নিয়ে যাব’। এভাবে মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি।

জালালাবাদ পাহাড়ের সম্মুখযুদ্ধে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও দমে যাননি তিনি। বেশ কিছুদিন গোপনে চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ হন। এরপর তিন বছর আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরে ধরাও পড়েছেন। কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে তিন তিনবার। কিন্তু যে মানুষ একবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি আর কিছুকে ভয় করেননি। মানুষের মুক্তির দাবিকে নিজের জীবনেরও ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন বারবার। এ দেশের মানুষের কাছে তাই তিনি আজ জীবন্ত কিংবদন্তি।

তার দীর্ঘজীবনে ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশা ও নানা ঝড়ঝাপ্টা পার করেছেন তিনি। তবু দেশের জন্য ভাবনা এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়েননি। একবার মোমিন রোডের বাসভবনে গিয়েছিলাম। তিনি ব্যথাতুর কণ্ঠে বললেন, ‘অক্টোবরের ২৪ তারিখে আমার বুকটা ভেঙে গেছে। আমার ছেলে বিবেকানন্দ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’ দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে ভুগে মারা যান বিনোদ বিহারীর ছেলে বিবেকানন্দ। তবু পুত্রশোকে কাতর বিপ্লবী স্বদেশের সমসাময়িক ঘটনার খোঁজখবর নিতে ভোলেননি। রামুর সহিংস ঘটনার পর প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন। সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন, ‘রামুতে মানুষের ঘর পুড়িয়ে, ভগবান বুদ্ধের মূর্তি ভেঙে কার লাভ হলো? যারা এসব কাণ্ড করেছে তারা কি মানুষ? শুধু দুইটা পা থাকলে তো আর মানুষ হয় না। দেশটা কি অমানুষে ভরে গেছে? মানুষ হতে হলে থাকতে হবে হৃদয়- যা অপরকে ভালোবাসতে সাহায্য করবে, থাকতে হবে হাতের মতো হাত- যা দিয়ে অপরের জন্য কাজ করা যাবে। যারা রামুতে মানবতাবিরোধী এমন ঘটনা ঘটালো তাদের এসব কিছু ছিল বলে মনে হলো না। সব কিছু যেন এলোমেলো করে দিতে তৎপর হয়েছে কোনো শক্তি, কেউ কারো কথা শুনতে চাইছে না।’

মৃত্যুর কথা ভাবতেন না এই শতবর্ষী বিপ্লবী। বরং যত দিন বাঁচবেন ততদিন মানুষের কাজে লাগবেন, তাদের সঙ্গে থাকবেন, এই তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল। বলেছিলেন ‘যুদ্ধ করে করে মরে মরে দেশকে রক্ষা করার শিক্ষা নিয়েছি আমি। জীবনের শেষ মহূর্ত পর্যন্ত দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা আমি ছাড়তে পারবো না। ভালোবাসা ছাড়া দেশ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না কেউ। দেশকে ভালোবাসতে শিখতে হবে।’

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj