জলের আখ্যান

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৯

হরিশংকর জলদাস

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ১১

ঘুমাচ্ছে সুখলতা। পাশে রতিকান্ত। রতিকান্তের সুস্থ হয়ে উঠতে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছে।

সে রাতে মৃতপ্রায় রতিকান্তকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল সুখলতা। শুইয়ে দিয়ে যতটুকু জানে, শুশ্রƒষা করে গিয়েছিল সে। চেয়েছিল, ঘটনাটি মা-বাবার অগোচরে রাখার। কিন্তু সোমনাথ বিচক্ষণ। বুঝতে পেরেছিল, গত রাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। জামাই প্রায় মুমূর্ষু। কন্যা বিষণœতায় বিপর্যস্ত। ঠিক করল, এ ব্যাপারে নিজ থেকে কিছুই জিজ্ঞেস করবে না সে জামাই অথবা মেয়েকে। স্ত্রীকেও সতর্ক করল সোমনাথ।

পরদিনই হীরামোহন ডাক্তারকে ডেকে পাঠাল সোমনাথ।

হীরামোহন বলল, ‘কী হয়েছে মুখ খুলছে না তোমার জামাই আর মেয়ে। শরীরে আহতের তেমন কোনো চিহ্ন না থাকলেও মনের আঘাত যে তীব্র, বোঝা যাচ্ছে। আমার পরামর্শ- ওরা বলতে না চাইলে জোর করে জানতে চেয়ো না কিছু। আর হ্যাঁ, জামাইয়ের সেবাযতেœর যেন কোনো ত্রুটি না হয়। ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে সেরে উঠবে রতিকান্তি।’

আরও কিছুদিন গড়িয়ে গেছে। রতিকান্ত অনেকটা সেরেও উঠেছে। স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছে রতিকান্ত। কিন্তু সুখলতা আগের মতো স্বাভাবিক আচরণ করছে না। কথার মাঝখানে হঠাৎ হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছে সে। ঘুমের মধ্যে শিউরে শিউরে উঠছে।

আজ রাতে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে সুখলতা। রতিকান্তও ঘুমে আচ্ছন্ন। স্বপ্ন দেখছে সুখলতা- রতিকান্তকে দুজন জেলে নৌকায় তুলে নিল। মরণ-ঝাঁকুনি দিল রতিকান্ত। জেলেরা দড়াম করে পাটাতনে আছড়ে ফেলল রতিকান্তকে। ‘সুখলতারে!’ রতিকান্তের হাহাকার মেশানো কণ্ঠস্বর সুখলতার কানে এসে ধাক্কা দিল। তারপর জেলেদের হল্লোড় ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেল না সুখলতা। দেখল, নৌকাটি তরতরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আপ্রাণ সাঁতার কেটে গেল সে নৌকাটির পিছন পিছন। কিন্তু নৌকার গতিবেগের সঙ্গে ক্লান্ত শরীরের সে পেড়ে উঠল না। এক সময় জেলেনৌকাটি চোখের আড়ালে চলে গেল।

রাতের শেষ দিকে আলুথালু মন নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে এল সুখলতা। মা জিজ্ঞেস করে, ‘কী হইয়েছে সুখলতা? জামাই কোথায়?’

বাপ জিজ্ঞেস করে, ‘কী, কথা কইসনে ক্যান? জামাইকে কোথায় রেইখে এলি?’

সূর্যকিরণ মুখে কিছু বলে না। সুখলতার দিতে তাকিয়ে থাকে শুধু ভাইটি।

সুখলতার কপাল ভেঙেছে। জোছনা তার সবকিছু গিলে খেয়েছে। তার স্বামীকে খেয়েছে, তার সুখ আর স্বস্তিকেও খেয়েছে। তার নিরাপত্তাও কেড়ে নিয়েছে মরার জোছনা।

বিধবা হবার পর তার ওপর পর-পুরুষের কুনজর পড়েছে। কুমারী অবস্থায় কুমারিত্বই তাকে রক্ষা করেছে, বৈবাহিক জীবনে রক্ষা করেছে রতিকান্ত। রতিকান্তের মৃত্যুর পর সুখলতা যেন বেওয়ারিশ বস্তু। যারা এতদিন তাকে সমীহ করে চলেছে, তারা এখন তার দিকে বেআব্রু চোখে তাকায়। কাছ থেকে শিস দেয়, গা ঘেঁষে চলতে চায়। কেউ কেউ তার চোখের দিকে সটান তাকিয়ে ইঙ্গিতময়ভাবে কী যেন বলতে চায়।

মাঝবয়সী সুরমা মাছ একদিন প্রস্তাবই করে বসে, ‘আর কতদিন একা একা ভরা যৈবন নিয়া ঘুইরে বেড়াবে সুখু? কত রাইতই-বা ক্ষুধা লইয়া কাটাইবে? দেহের জ্বালা বড় জ্বালা রে সুখু। সময়মতো এই জ্বালা না মিটাইলে চাইরদিক আন্ধার আন্ধার লাগে।’

স্তম্ভিত মুখ নিয়ে সুরমা মাছের দিকে তাকিয়ে থাকে সুখলতা।

সুরমা জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার লাগে না আন্ধার?’

সুখলতার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সুরমা আবার বলে, ‘লাগে, লাগে। টইটম্বুর যৈবন যাদের, তারাই কেবল বুইঝতে পারে। আর পারে যাদের সোয়ামি অথবা বউ মারা গেছে। তোমার সোয়ামি মারা গেছে। আর আমার মারা গেছে বউ। দেহ-যন্ত্রণায় তুমি আর আমি সমান কাতর। তোমার মামি মারা গেছে অনেক দিন হইয়ে গেল। একা একা জীবন আমার।’

সুখলতার ভেঙে পড়া বাকি সুরমা মাছের কথা শুনে। সেদিকে খেয়াল নেই সুরমার। বলে, ‘তোমার যেমন যৈবন আছে, আমার যৈবনেও ভাটা লাগেনি। আমার ঘরে আইসে পড় তুমি, রাজরানি কইরে রাখব।’

পথিমধ্যে একদিন একা পেয়ে মোচমাছ বলে, ‘পাঙ্গাশ আর আমি একই জাতের। রতিকান্তের যেমন তিনটে কাঁটা আছিল, দেখ দেখ, আমার শরীরেও তিন তিনটে কাঁটা।’

তারপর চকচকে চোখে সুখলতার দেহের দিকে তাকিয়ে মোচমাছ আবার বলে, ‘রতিকান্তের স্বাদ লইছ এতদিন, এইবার আমার দিকে তাকাও। ভইরে দেব সবকিছু, দেহ মন সব কিছু।’ বলে মোচমাছ তার বিশাল গোঁফ নাড়াতে থাকে।

সুখলতা অসহায় কণ্ঠে বলে, ‘আপনার বোন ললিতা আর আমি একই বয়সী শ্যামলদা।’

শ্যামল বলে, ‘তাতে কী হইছে? ললিতা ললিতার জায়গায়, তুমি আমার বুকের মাঝে।’

সুখলতা হঠাৎ হেসে ওঠে। শ্যামল বুঝতে পারে, এ হাসি কেউটে সাপের হাসি। ফণা তোলে সুখলতা, ‘আমাকে খারাপ প্রস্তাব দেওয়া আর ললিতাকে প্রস্তাব দেওয়া একই কথা নয় কি শ্যামলদা?’

শ্যামল গাঢ় রিরংসার চোখে সুখলতার দিকে তাকাতে তাকাতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

স্বামীহারা একজন নারীর সমাজে কী যে করুণ অবস্থা, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সুখলতা।

এক গভীর রাতে সুখলতার দরজায় ঠুক ঠুক আওয়াজ হলো। সুখলতা দরজার কাছে গিয়ে কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কে? কে ওখানে? কোন হারামজাদা আমার দরজা ঠেলছে?’

বাহির থেকে করুণ কণ্ঠের উত্তর আসে, ‘আমি সুখলতা, আমি জগাই। দরজা একটু খোল না সই। সামান্য একটু কথা কওনর আছিল তোর লগে। দেখা করনর একটু সুযোগ দে না রে লতা। দেখা কইরেই চইলে যাব আমি।’

সুখলতা উত্তেজিত গলায় বলে, ‘চেঁউয়ার বাইচ্চা চেঁউয়া। সরদারের ছেলে হয়ে রাতের বেলা আমার ঘরের দরজা ঠেলছিস। দাঁড়া, কালকে তোর বাপ পঞ্চু সরদারের কাছে যাচ্ছি।’

জগাই বলে, ‘এত রাগ কইরতেছিস ক্যান সোহাগি! আমি তোরে বিয়া করুম। আজকে শুধু একবার সুযোগ দে।’

এবার সুখলতা চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘হারামির পোলা গেলি? বাবা-, মা-, তোমরা….।’

জগাই পালিয়ে যায়। নির্ঘুমে রাত কাটায় সুখলতা।

এত যে ঘটনা, এত যে চরিত্র- সবকিছুকে, সবাইকে স্বপ্নে দেখে সুখলতা, কিন্তু মা-বাবা-ভাইকে দেখে না। ঘুমের মধ্যে সে গোঁ গোঁ করতে থাকে।

অস্থিরতা কমে এলে সুখলতা মনে মনে ঠিক করে, আজ রাতের ঘটনা মা-বাবাকে জানাবে না। জানালে শুধু দুঃখ বাড়বে তাদের। সুরাহা হবে না কিছুর।

সে আরও স্থির করে, আগামীকাল বিকেলে মা-বাবাকে না-জানিয়ে পঞ্চু সরদারের বাড়ি যাবে। তার সঙ্গে দেখা করে তার ছেলে জগাইয়ের কুকর্মের সবকিছু খুলে বলবে। বলতে বলতে কেঁদে দেবে সে। কাঁদতে কাঁদতে সরদারের কাছে নিরাপত্তা চাইবে।

দুঃস্বপ্ন সহজে ভাঙে না। সুখলতা যে-দুঃস্বপ্নে হাবুডুবু খাচ্ছে, তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ভয়ে-উত্তেজনায় তার শরীর জরজর। সেই বিপন্ন মন নিয়ে জর্জরিত দেহে সুখলতা স্বপ্ন দেখে যায়।

সুখলতা স্বপ্নে দেখে- পরদিন একটু বেলা হলে মা-বাবার চোখ এড়িয়ে সরদারের বাড়ির পথে বেরিয়ে পড়েছে সে।

জলধি গাঁয়ের শেষ প্রান্তে পঞ্চু সরদারের বাড়ি। অপরাহ্ণের দিকে সে সরদারবাড়িতে পৌঁছায়। সরদার তখন বাড়িতে নেই। ভেতরবাড়ি থেকে জানানো হয়- সরদার ভিনগাঁয়ে সালিশে গেছে। সন্ধে নাগাদ ফিরবে।

সুখলতা সরদারের দেউড়িতে অপেক্ষা করতে থাকে।

একটা সময়ে পঞ্চু সরদার বাড়ি ফিরে। ভিতরবাড়িতে ঢুকবার আগে স্বভাববশে দেউড়িতে একবার উঁকি দেয়। বিষণœ সুখলতাকে দেখতে পায় সে। একটু থতমত খায় পঞ্চু সরদার। সোমনাথের মেয়ে না! সে এখানে কেন! ওই মেয়েটির জন্যই তো সংসারে আমার আগুন ধরেছে। ধীরলয়ে সুখলতার দিকে এগিয়ে যায় সরদার।

সরদার কাছে এলে সজল চোখে সুখলতা বলে, ‘বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি সরদারজি।’

‘কী বিপদ মাইয়া?’ চোখে-মুখে না-চেনার ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে সরদার বলে, ‘তুমি সোমনাথ ইলিশের মাইয়া না?’ সহানুভূতি মেশানো কণ্ঠস্বর পঞ্চু সরদারের।

‘হ্যাঁ সরদার। আমি সোমনাথ ইলিশের মেয়ে।’ একটা ঢোঁক গিলল সুখলতা। বলল, ‘আমাকে বাঁচান সরদারজি।’

সরদার বলে, ‘আহা মেয়ে! সবকিছু খুইলে বইলে না সমস্যাটা বুইঝতে পাইরব। ব্যবস্থাও লইব সেই অনুসারে।’

তারপর কণ্ঠস্বরকে কোমল করে বলে, ‘কী হইয়েছে সব খুইলে বল।’

সরদারের আশ্বাসের কণ্ঠ শুনে সুখলতা নিজের মধ্যে জোর খুঁজে পায়। ধীরে ধীরে তার জীবনের সকল কথা খুলে বলে। শেষে বলে, ‘বাবা আপনাকে আমার বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিল। আপনি বিয়েতে উপস্থিত থাকেননি সরদার।’

হঠাৎ পঞ্চু সরদারের চোখ দুটো ধপ করে জ্বলে উঠল। সেই চোখে ক্ষোভ আর অপমানের তীব্র জ্বালা। সেই ক্রোধ এবং জ্বালার আয়ুষ্কাল স্বল্পসময়ের। দ্রুত নিজেকে সংবরণ করে ফেলল সরদার। বলল, ‘পারিবারিক জটিলতায় একখান কাজে আটকে পইড়েছিলাম। তাই তোমার বিয়াতে সেই রাতে যেইতে পারি নাই।’

তারপর ¤øানমুখে বলেছিল, ‘তোমার সমস্যার কথা বল।’

পঞ্চু সরদারের কথায় সুখলতা তার জীবনের কথা বলে। জোছনা রাতের কথা, রতিকান্তের সঙ্গে তার সুখময় জীবনযাপনের কথা- একে একে বলে যেতে থাকে সুখলতা। পাড়ার গুণ্ডাদের কথা, মোচ মাছের অসভ্য প্রস্তাবের কথা, সুরমা মাছের কুপ্রস্তাবের প্রসঙ্গও পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে যায় সরদারের কাছে।

পঞ্চু সরদার সুখলতার কথা শোনে আর ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হতে থাকে। রমণেচ্ছা তার চোখ-মুখ-শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তার মধ্যকার রি রি ভাবকে বহুকষ্টে নিজের ভেতরে চেপে রাখে। সংহত-সংযত চেহারা নিয়ে পঞ্চু সুখলতার দুঃখকাহিনী শুনে যেতে থাকে। কিন্তু মনের লোভী চোখ দিয়ে সুখলতার শরীর চাটতে থাকে সে। তার লোলুপ চোখ দুটো সুখলতার শরীরের নানা বাঁকে গোত্তা খেয়ে খেয়ে ঘুরতে থাকে।

জগাইয়ের গতরাতের কর্মকাণ্ডের কথা সরদারকে বলবে কি না- এ নিয়ে দ্বিধায় ভোগে সুখলতা। বললে কি সরদার তার পুত্রের দোষ আমলে নেবেন? যদি নেনই-বা, তাহলে কি পুত্রের কুকর্মের উচিত বিচার করবেন সরদার? না করার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এই জগাই যে পঞ্চু সরদারের কুকর্মের ডান হাত। সমাজের যত রকমের অন্যায়-অবিচার, তাদের সিংহভাগই তো জগাইকে দিয়ে করান সরদার। সেই জগাইকে শায়েস্তা করবার উদ্যোগ কি সরদার নেবেন?

কিন্তু জগাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগটা না করলে যে সুখলতার ভেতরের জ্বালা মিটবে না। মূলত সরদার-বাড়িতে আসার মুখ্য-উদ্দেশ্যই তো জগাইয়ের অপকর্মের বিচার চাওয়া। আসল নালিশটাই যদি না করে, তাহলে এত দূর আসার মানেটাই তো মূল্যহীন হয়ে পড়ে। গত রাতে জগাই তার দরজা ধাক্কিয়েছে, আরেক রাতে কৌশলে বা জোর করে তার ঘরে ঢুকবে। তারপর কী করবে? উঃ! ভাবতেই গা শিউরে উঠছে সুখলতার। নাহ্! জগাইয়ের অপকর্মের কথা কিছুতেই সরদারের কাছ থেকে লুকানো যাবে না। সত্যকথাটা সরদারকে বলতেই হবে। মন স্থির করে সুখলতা, সাহসে বুক বাঁধে। জগাই যত বড় গুণ্ডাই হোক না কেন, তার গুণ্ডামিকে আর কিছুতেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

সুখলতা অস্বাভাবিক জোরালো কণ্ঠে বলে, ‘আর একটা কথা ছিল সরদারজি আপনার সঙ্গে।’

সুখলতার কথা পঞ্চু সরদারের কানে ঢোকেনি। ঢুকবে কী করে! সরদার যে তখন সুখলতার দেহ-সুষমায় হাবুডুবু খাচ্ছে। উত্তেজনার প্রাবল্যে তার শ্রæবণেন্দ্রিয় স্তব্ধ। তাই সুখলতার শেষ কথাগুলো খেয়াল করল না পঞ্চু সরদার।

সরদার যে তার শেষের কথাগুলো শোনেনি, সুখলতা অনুমান করল। তাই আবার বলল, ‘সরদারজি, আমার আরেকটা অভিযোগ আছে।’

সংবিতে ফিরল সরদার। দ্রুত বলল, ‘কার বিরুদ্ধে?’

স্পষ্ট গলায় সুখলতা বলল, ‘আপনার বড়ছেলে জগাইয়ের বিরুদ্ধে।’

‘ও তো ভালা ছাওয়াল। ও আবার কী কইরল তোমারে?’

‘গতরাতে জগাই আমার ঘরে ঢুকতে চেয়েছে।’

‘ধুর মাইয়া! কী যে কও না তুমি! জগাইয়ার মতো ভালা পোলা তোমার দরজা ঠেইলতে যাইব ক্যান?’

সুখলতা বলল, ‘আপনি বিশ্বাস করেন সরদারজি, আমি এক ফোঁটা মিথ্যা বলছি না। গতকাল গহিন রাতে জগাই আমার ঘরে ঢুকতে চেয়েছে। সুযোগ পেলে সে আমাকে বলাৎকারই করত।’

‘বলাৎকার করত!’ কৃত্রিম বিস্ময় পঞ্চু সরদারের চোখে-মুখে। ‘কী কও তুমি মাইয়া?’

‘আমি সত্যিই বলছি সরদার। আপনি এর উচিত বিচার করেন।’

‘উচিত বিচার!’ মুখ ফসকে বেরিয়ে এল সরদারের মুখ থেকে। তারপর সংযত গলায় বলল, ‘হ, উচিত বিধানই ত করণ দরকার এই অপরাধের। আমি জগাইয়ারে দেইখ্যা লমু। সরদারের ছাওয়াল হইয়ে এতবড় অপকর্ম! এই অপকর্মের বিচার না হইলে গেরামে গেরামে আমার নামে ডি ডি পইড়ে যাবে।’ সরদারের এই কথাগুলোর মধ্যে সত্য কতটুকু লুকিয়ে আছে, তা বোঝার ক্ষমতা সেই সময়ে সুখলতার মধ্যে ছিল না। সে সময় সুখলতা অনেকটাই বিহŸল ছিল।

তারপর পঞ্চু সরদার সুখলতার একেবারে কাছ ঘেঁষে বলল, ‘তুমি এই জইন্য মন খারাপ কইরো না মাইয়া। আমি যদি জগাইয়ার এই অপরাধের উচিত বিচার না করি, তাইলে আমার নাম পাল্টাইয়া দিয়ো। চেঁউয়া, জেলি, ভাউস্যা কাঁকড়া, চেরবডি- যে কোনো একখান নাম রাইখো আমার।’

একটু দম নিয়ে পঞ্চু সরদার আবার বলল, ‘এখন তুমি যাও মা। তোমার মা-বাপ চিন্তা কইরবে তোমার জইন্য। বইল্যা আইছ ত মা-বাপরে যে আমার বাড়িতে আইতেছ?’

সুখলতা ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়ে। মানে, বলে আসেনি।

পঞ্চুর চোখ ধপ করে জ্বলে ওঠে। এ আগুন কীসের একমাত্র পঞ্চু ছাড়া কেউ বুঝতে পারে না।

‘তাহলে আমি যাই সরদারজি?’ সুখলতা তৃপ্তির কণ্ঠে বলে।

‘আচ্ছা যাও…।’ বলেই হঠাৎ চুপ মেরে যায় সরদার। তার চোখ তখন বাইরে। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার।

আঁতকে ওঠে সরদার, ‘ইসরে! অন্ধকার হইয়ে গেছে যে! তোমার লগে কথা কইতে কইতে বুইঝতেই পারি নাই চাইরদিক অন্ধকারে ছাইয়া গেছে।’

সুখলতা বলে, ‘আমি ফিরে যেতে পারব।’

‘কী যে কও না মাইয়া! তুমি যদি শুধু তুমি হইতে, তাইলে কুনু বাধা দিতাম না। তোমার লগে যে টইট¤ু^র যৈবন আছে। এই যৈবনই যে তোমার কাল গো মাইয়া। এই রকম একখান রসবতী মাইয়ারে গেরামের অন্ধকার পথে ছাইড়া দি ক্যামনে। সরদার হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছে না?’

তারপর সুখলতার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পঞ্চু সরদার বলে, ‘তুমি একখান কাজ করো মাইয়া?’

সুখলতা চোখ তুলে তাকায়। মুখে কিছু বলে না।

‘তুমি আইজ রাইতখান আমার বাড়িতে থেইকে যাও। সকালে বাড়ির দিকে রওনা দিবা।’ একটু থেমে সরদার আবার বলে, ‘অই দেখো, দেউড়ির কোনায় বিছানা পাতা আছে, ওইখানে আরামসে একখান ঘুম লাগাও। আর হ্যাঁ, তোমার খাবার পাঠানর জইন্য আমি ভিতরবাড়িতে কইয়া দিতেছি।’

সুখলতার ইতস্তত ভাব যায় না। কিছু একটা বলতে চায় সুখলতা।

সরদার তা বুঝতে পারে। ডান পাখনাটা ওপর দিকে তুলে সুখলতাকে থামিয়ে দেয়। বলে, ‘তোমার দোনোমনার ব্যাপারখান আমি বুইঝতে পারি মা। তোমার নিরাপত্তার কুনুই অসুবিধা হইবে না এই সরদারবাড়িতে। খাওয়াদাওয়ার পর একেবারে নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া পড়।’

মনমরা সুখলতা দেউড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে। মিষ্টি চোখে সুখলতার দিকে একবার তাকিয়ে পঞ্চু সরদার ভিতরবাড়ির দিকে চলে যায়।

অন্দরমহলে যেতে যেতে কী ভাবে পঞ্চানন? তার কী সোমনাথ ইলিশের অপমানের কথা মনে পড়ে? সামাজিকভাবেই তো প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল সে! এটা মানতে অসুবিধা নেই যে, বিয়ের প্রস্তাবটা ভিন জাতের ছিল। ভিন জাতে বিয়ে মৎস্যসমাজ মেনে নেয় না, এটাও পঞ্চু সরদারের অজানা নয়। তার পরও তো এ ধরনের বিয়ে হচ্ছে। নিজের কথা বাদ দিই, রুমকি সুন্দরীকে না হয় আমি জোরজবরদস্তি করে বিয়ে করেছি, কিন্তু রতিকান্ত-সুখলতার বিয়েটা কি বেজাতে বিয়ে নয়? কই এই বিয়ে নিয়ে তো সমাজে কোনো হইচই হয়নি! বরং মৎস্যসমাজের সাধারণ থেকে গণ্যমান্যরাও এই বিবাহ-উৎসবে উপস্থিত থেকেছেন, আনন্দভোজে অংশগ্রহণ করেছেন। সে-ই শুধু ব্রাত্য হয়ে গেল! তার উপযুক্ত, সর্বাঙ্গসুন্দর জগাই-ই শুধু অবহেলিত হলো সোমনাথ ইলিশের কাছে! দিনের পর দিন অবহেলোার এই অপমান তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। কত রাত যে নির্ঘুমে কাটিয়েছে, তার কোনো হিসেব রাখেনি পঞ্চানন।

আজ সুযোগ এসে ধরা দিয়েছে তার হাতে। ও হে সুযোগ, তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগটা আমার হাতে তুলে দিলে বলে তোমার কাছে আমি অশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

বাইশ

ঘুম আর ভাঙে না। রতিকান্ত পাশ ফিরে শোয়। খাটটা একবার নড়ে ওঠে। ক্যাঁচ করে একটা শব্দও হয়। তাতেও সুখলতার ঘুমের বিঘ্ন ঘটে না। মরণঘুম যেন তাকে পেয়ে বসেছে।

সুখলতা পঞ্চু সরদারের দেউড়িতে অপেক্ষা করতে থাকে। বিছানার নিকটেও একবার যায়। দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তিতে আর গতরাত থেকে উদ্বিগ্নতায় সে জরজর। দু’চোখ জুড়ে ঘুম ভেঙে আসছে। শুয়ে পড়তে পারলে বাঁচে। কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষুধা তার চোখের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। সেই কোন সকালে বাড়ি থেকে যাত্রা করেছে সে! খেয়ে না-খেয়েই সুখলতা রওনা দিয়েছিল। সরদারবাড়িতে পৌঁছার পর কেউ তাকে খাবারের জন্য কোনো অনুরোধ করেনি বা প্রস্তাবও দেয়নি। একেবারে নির্জলা-উপোস যাকে বলে, সে রকমই উপোস দিতে হয়েছে তাকে। গোটা দিনের অনাহারের কারণে শরীরটা থরথর করে কাঁপছে সুখলতার। সে অধীর আগ্রহে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

একটা সময়ে তার অপেক্ষার কাল শেষ হয়। সরদারের রান্নাঘর থেকে নানা পদের খাবার আসে। দাসী সুখলতার সামনে বড় একটা পত্র রাখে। পাতার চারদিকে নানা খাবার সাজিয়ে দেয়। দাসী বলে, ‘খাইয়া লও গো ইলিশের মাইয়া। চোখ-মুখ চুপসে গেইছে তোমার। সারাদিন খাও নাই। তাড়াতাড়ি খাইয়া লও। নইলে যে সোনার অঙ্গ কালা হইয়ে যাবে!’ সুখলতার সারা শরীরে প্রশংসার চোখ বুলাতে বুলাতে দাসীটি বলে যায়।

মৃদু একটু হাসে সুখলতা। খেতে বসে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা তোমার নাম কী?’

‘দাসী। আমি হইলাম গিয়া সরদারবাড়ির পাঁচ নম্বর দাসী।’

‘দাসী!’ একটু অবাক হলো সুখলতা। সংযত করল নিজেকে। তারপর বলল, ‘বুঝলাম। কিন্তু দাসীদেরও তো একটা নাম আছে! মা-বাবার দেওয়া নাম!’

দাসী এবার বেদনায় চুর চুর কণ্ঠে বলল, ‘ছিল হয়তো একদিন আমার নাম। গরিব মাছের মেইয়ে আমি। চেরবডি জাত। চেরবডিরা ছোটজাত। তাদের গায়ে কুনু কাঁটা নাই, বলও নাই শরীরে। দেহটাও বড় নয় তাদের। এই সাগরের তলে আমরা সব ধরনের মাছের অবহেলার শিকার। যার যেইরকম ইচ্ছা, আমাদের লইয়া কইরতে পারে। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj