অশনি সংকেত

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি ২০১৯

আলী ইমাম

প্রকৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক কলাম : পর্ব ১৫

মহাবিশ্বের মাঝে পৃথিবী নামক গ্রহটি এক মহাবিস্ময় রূপে বিবেচিত। আখ্যায়িত। কারণ এখন পর্যন্ত একমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে বিকশিত হয়েছে প্রাণসত্তা। পৃথিবীর শ্যামল সবুজ পরিবেশ এই প্রাণসত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তিল তিল করে পরিবেশ এবং প্রতিবেশের সুষমামণ্ডিত রূপকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে।

মহাবিশ্বের এই বিশালত্ব রবীন্দ্রনাথকে অভিভূত করেছিল। সেই বিস্ময়বোধ থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন : …নক্ষত্রজগতের দেশকালের পরিমাপ পরিমাণ গতিবেগ দূরত্ব ও তার অগ্নি আবর্তের চিন্তনাতীত প্রচণ্ডতা দেখে যতই বিস্ময় বোধ করি এ কথা মানতে হবে বিশ্বে সবার চেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় এই যে মানুষ তাদের জানছে এবং নিজের আশু জীবিকার প্রয়োজন অতিক্রম করে তাদের জানতে চাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন শান্তিনিকেতনের বিশ্ব বিদ্যা সিরিজের জন্য ‘বিশ্ব-পরিচয়’ গ্রন্থটি। সঙ্গীতের ভাষায় লিখেছিলেন,

‘আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।’ পৃথিবীর প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে চিন্তাশীল লেখকেরা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেছেন। তারা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন ভূমণ্ডলের রূপকে।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,

দিনরজনী কত অমৃত রস উথলি যায় অনন্ত গগনে।

পান করে রবি শশী অঞ্জলি ভরিয়া-

সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি

নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে।

আমাদের দেশের এক প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী ছিলেন ড. নওয়াজেশ আহমদ। যার ক্যামেরার লেন্সে অপূর্বভাবে ধরা পড়েছিল বাংলাদেশের পেলব, জলজ প্রকৃতি। তিনি এ দেশের নিসর্গকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রে’র মন উতল করা অপরূপ বর্ণনার চিত্রায়ন করেছিলেন। তার আর একটি অসাধারণ শৈল্পিক প্রয়াস হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের বর্ণিত রূপসী বাংলার ধারাবাহিকতা । এ কাজে তিনি সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। একান্ত মগ্ন হয়ে রূপসী বাংলার প্রতি ছত্র, প্রতি অক্ষর-যোজনা, প্রতি শাব্দিক বিন্যাসকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে তার দার্শনিক মনটিও সম্পৃক্ত হয়েছিল। তিনি প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্যের অন্তরালের নীরব স্পন্দনকে আবিষ্কার করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিল তার মনন চিন্তার উৎস। যিনি বলেছিলেন যে, ‘গাছেরও প্রাণ আছে।’ সেই প্রাণের আকুতিটুকু শোনার জন্য সারা জীবন কার্যকরভাবে ব্যয় করেছেন ড. নওয়াজেশ আহমদ। তিনি প্রকৃতি ও পরিবেশের অন্তর্নিহিত অনুরণনকে অনুভব করার জন্য সর্বদা প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে চেয়েছিলেন। তার কাছে ভীষণ প্রিয় ছিল নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উদ্ভিদবিজ্ঞানী বরলগ-এর উক্তি, ‘গাছ কথা বলে ফিসফিস করে। তা বুঝতে হলে তার খুব কাছাকাছি থাকতে হবে।’

তিনি এ কথা ভেবে প্রচণ্ড দুঃখ পেতেন যে আধুনিক সভ্যতার বস্তু প্রবণতা মানুষকে কীভাবে প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। ভোগবাদী মানুষ বিনষ্ট করে চলেছে প্রকৃতিকে। নেমেছে বিধ্বংসীকারকের ভূমিকায়। নিসর্গকে হারিয়ে মানুষ রিক্ত হয়ে পড়ছে। বসুন্ধরার অপূর্ব সুষমা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ড. নওয়াজেশ আহমদ ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারার একজন মানুষ। তিনি অবিরাম বিচরণ করতে ইচ্ছুক ছিলেন বাংলাদেশের অনুপম নিসর্গজগতে পরিভ্রমণ করতে। সে কারণে কান পেতে শুনতে চেয়েছেন মহা অশত্থের গান। বট বৃক্ষ তাকে নিসর্গ চেতনা জাগরণের বিষয়ে আগ্রহী করেছিল। বটতলাই হচ্ছে গ্রাম-বাংলার মানুষজনের মিলনস্থান। বট বৃক্ষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশেই পূজিত হয়ে থাকে। দক্ষিণ চীনের ফুজহাউ নামের শহরটি পরিচিতি পেয়েছে বট শহর হিসেবে। শহরটির বিভিন্ন অঞ্চল বট বৃক্ষ দ্বারা সুশোভিত।

বৈদিক ঋষিদের একান্ত বিশ্বাস ছিল যে বট বৃক্ষের ছায়া সুশীতল পরিবেশ তাপিত হৃদয়ে শান্তি আনয়ন করে। শরীরের ক্লান্তি নিবারণ করে থাকে। প্রাচীন মিসরে বট বৃক্ষকে বন্দনা করা হতো বৃক্ষদেবতা ওসিরিসের সাথে।

গৌতম বুদ্ধ অশ্বত্থ তলে দীর্ঘ সময় একাগ্রচিত্তে ধ্যানমগ্ন থেকে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। চার হাজার বছর পূর্বেও চীনা সন্ত সাধকরা বটতলাকে নির্বাচন করতেন ধ্যানের স্থান হিসেবে।

কবি জীবনানন্দ দাশ অতি অন্তরঙ্গভাবে বট বৃক্ষকে দেখেছিলেন। তার বট উপলব্ধি ছিল সুদূরপ্রসারিত। তার এমন উপলব্ধি হয়েছিল যে যুগান্তরের গল্প ডেকে আনে বটের শুকনো পাতা। সেই অনুভব শক্তিতে জারিত হয়ে লিখেছিলেন,

‘ছড়ায়ে রয়েছে তারা প্রান্তরের পথে পথে নির্জন অঘ্রাণে, তাদের উপেক্ষা করে কে যাবে বিদেশে বলো।’

ড. নওয়াজেশ আহমদ বাংলাদেশের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনাশের বিষয়ে ব্যথাতুর ছিলেন। তাই আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘বন বনানি ধ্বংস হয়ে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায় বিহঙ্গের কলকাকলি। সেই সঙ্গে নিসর্গের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্যও বিলীন হয়ে যায়। পরিবেশ আজ দূষিত বিত্রস্ত। নিসর্গ তবুও আপন ভুবনে ক্রিয়াশীল- কখনো সাবলীল আবার কখনো আতঙ্কিত। সব মিলে এই প্রকৃতি, জীব ও জড় উপাদানে সম্পৃক্ত, সদা স্পন্দিত। এক কথায় জীবনপ্রবাহে সমুজ্জ্বল।’

আমি ড. নওয়াজেশ আহমদের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে এসে প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রহস্য আবিষ্কারে ব্রতী হই। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে আমি বিটিভিতে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগদান করি। সেখানে যোগদানের প্রধান আকর্ষণ ছিল মুস্তাফা মনোয়ার। যার সৃষ্টিশীল কাজগুলো আমাকে সর্বদা মুগ্ধ করে রাখত। তার প্রিয় বন্ধু ছিল ড. নওয়াজেশ আহমদ। মুস্তাফা মনোয়ারের অপরিমেয় উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’কে চিত্রায়িত করেন ড. নওয়াজেশ আহমদ।

মুস্তাফা মনোয়ার একান্তভাবে চাইছিলেন টিভি পর্দায় আমাদের ষড়ঋতুর রূপ বৈচিত্র্য ফুটে উঠুক। আমি প্রস্তাব করলাম টিভিতে ফিলার হিসেবে জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’র ভিডিও চিত্র প্রচার করা যেতে পারে। টেলিভিশনের সম্প্রচার কার্যক্রমে দুটো অনুষ্ঠান প্রচারের মাঝে কিছুটা সময় পাওয়া যায়। ঐ শূন্য সময়টাকে অনেক সময় যে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে প্রামাণ্য অনুষ্ঠান দিয়ে ভরানো হয় তাই পরিচিত ‘ফিলার’ নামে। সাধারণত ফিলার হিসেবে সরকারি বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হতো। আমার প্রস্তাব ছিল ফিলার প্রচারের ঐ স্বল্প সময়টুকুতে যদি আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপকে প্রচার করা যায় তবে তা চমৎকার ভিস্যুয়াল আবেদন সৃষ্টি করবে। আমার প্রস্তাবটি টিভির তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক মুস্তাফা মনোয়ারের কাছে আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হলো। তিনি ‘রূপসী বাংলা’র ফিলার প্রচারের জন্য সম্মতি প্রদান করলেন। বললেন, ‘তুমি অবশ্যই এসব নির্মাণে জন্য ড. নওয়াজেশ আহমদকে সম্পৃক্ত করবে। তিনি চমৎকারভাবে আলো ছায়ার রূপকে মূর্ত করতে পারবেন।’

আমি আনন্দিত চিত্তে তখন ড. নওয়াজেশ আহমদের সাথে যোগাযোগ করলাম। ‘রূপসী বাংলা’ আমার সর্বাধিক প্রিয় বই। আমি ‘রূপসী বাংলা’ পাঠ করার সময় আচ্ছন্ন হয়ে যেতাম। কাব্যগ্রন্থের পঙ্ক্তিসমূহের নেপথ্যে প্রকৃতির সুষমামণ্ডিত রূপকে অনুভব করে আমি বিভোর হয়ে যেতাম। প্রকৃতি যেন সেখানে পরতে পরতে রহস্যের ভাঁজকে উন্মোচন করছে। ‘নতুন সৌন্দর্য এক দেখিয়াছি- সকল অতীত ঝেড়ে ফেলে-নতুন বসন্ত এক এসেছে জীবনে, শালিখেরা কাঁপিতেছে মাঠে মাঠে- সেইখানে শীত।’

ড. নওয়াজেশ আহমদের সাথে পরিচিত হয়ে দেখলাম জীবনানন্দের প্রকৃতি বর্ণনার চিত্রায়ণের প্রতি তার প্রবলতর আগ্রহ। তিনি জানালেন, ‘জীবনানন্দের কবিতা অসাধারণভাবে চিত্রকল্পময়। তিনি যেন ‘রূপসী বাংলা’র ছত্রে ছত্রে ভিস্যুয়াল ফর্মের এক অপূর্ব জগত তৈরি করে গেছেন। আমরা টেলিভিশনের এই কার্যক্রমে অবশ্যই সেই ভিস্যুয়াল জগৎটিকে মূর্ত করে তোলার জন্য চেষ্টা করব।’

প্রবল উৎসাহ নিয়ে শুরু হলো আমাদের কার্যক্রম।

ড. নওয়াজেশ আহমদ আমার কাছে যেন দার্শনিক সত্তায় আবির্র্ভূত হলেন। তিনি জানালেন, ‘এই ভূমণ্ডল যেন একটি কদম ফুল। অপূর্ব আর সূ² এক ফুলেল কাঠামো। আরও তাকিয়ে দেখলে নবতর অনুভূতি জাগবে। এর পাপড়িগুলোর রয়েছে এক আশ্চর্য গাঁথুনি। এর কেশর, পরাগ কেমন এক এক বৃন্তে গাঁথা। আরো গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে শুধু কোমল অভ্যন্তরে নয়, এর বৃতি, রেণু এক অতি জটিল তন্তুতে গাঁথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি কণায় কণায়।

ড. আহমদ আমার সামনে জীবনান্দকে নতুন এক প্রেক্ষপটে উপস্থাপিত করলেন। জানালেন জীবনানন্দের প্রতি তার প্রবল আস্থার কথা। কারণ কবি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বিশ্ব প্রকৃতির মায়াজালকে। সে কারণে লিখেছিলেন, ‘ঘাসের বুকের থেকে কবে আমি পেয়েছি যে আমার শরীর-

সবুজ ঘাসের থেকে, তাই রোদ ভালো লাগে- তাই নীলাকাশ মৃদু ভিজে সকরুণ মনে হয়- ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোন এক ঘাস-মাতার শরীরের সুস্বাদ থেকে নেমে।’

শুরু হলো ‘রূপসী বাংলা’র ভিডিও চিত্রায়নের পালা। মুস্তাফা মনোয়ার বুঝিয়ে দিলেন চিত্রায়নের সময় কীভাবে ক্যামেরার কৌণিক অবস্থান থেকে ফ্রেমের মাঝে নান্দনিকতাকে মিশিয়ে দেয়া যায়।

জীবনানন্দের সেই শাশ্বত চরণকে আমরা ধ্রæব সত্যের মতো স্মরণ করলাম :

আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়- হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশায় বুক ভেসে একদিন আসিব এই কাঁঠাল ছায়ায়।

ড. আহদে বেশ জোর দিলেন এই কাঁঠাল ছায়ায় শব্দটির প্রতি। বললেন, এতে বাংলার চিরায়ত একটা ছায়াহিম ভাব মিশে আছে। আমাদের উচিত হবে এই কাঁঠাল গাছের ছায়াকে ক্যামেরার ফ্রেমে আলোছায়ার মাধুরীতে এমনভাবে ঘনীভূত করে রাখা যাতে ছায়ার আলতো নরম পরশটুকু পাওয়া যায়।

আমরা শ্যুটিং করলাম ভাওয়াল বনাঞ্চলের বিশাল কাঁঠাল বাগানে। কাঁঠালের রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। আমি যখন প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়ার’ শ্যুটিং করেছিলাম বগুড়ার মহাস্থানগড়ে তখন সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ইতিহাসবিদ ড. এনামুল হক জানিয়েছিলেন একটি বিচিত্র তথ্য। কাঁঠাল সম্পর্কে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ ৭ম শতাব্দীতে এই অঞ্চলে এসে প্রশংসা করেছিলেন।

বর্ণনাটি তার ভ্রমণ কাহিনীতে ছিল :

…পুবদিকে আরও এগিয়ে গঙ্গানদী পার হয়ে ৬০০ লি মতন পথ পার হয়ে এবার এলাম পুন্ড্রবর্ধনে। এই রাজ্যটিতে ঘন বসতি। অনেক জলাশয়। দোঁয়াশ মাটি। যার ফলে শস্য অপর্যাপ্ত। এখানে সমাদৃত বিশাল কাঁঠাল ফল। এর ভেতরের পায়রার ডিমের মতো ছোট আকারের হলুদ কোষগুলো সুগন্ধিতে ভরা। এই ফল ডালে ও গুড়ি উভয় স্থানেই ধরে।

আমরা প্রামাণ্য অনুষ্ঠানটিকে অধিকতর বৈচিত্র্যপূর্ণ করার জন্য উদ্ভিদ রাজ্য সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি পরিবেশন করতাম।

কাঁঠালের আদি জন্মভূমি হচ্ছে বাংলাদেশ ও ত্রিপুরার উঁচু লাল মাটি অঞ্চল।

রামায়ণে পঞ্চবটি বনের যে উল্লেখ রয়েছে তা হলো, চন্দন, কদম, কাঁঠাল, লকুচ (ডেউয়া) গাছ। ‘পনম’ হচ্ছে কাঁঠালের সংস্কৃত নাম।

এগারো শতকের কবি চক্রপানি প্রশংসা করেছেন কাঁঠালের দ্রব্যগুণের। বলেছেন, পনম অতি মধুর শ্রম ও দাহ নিবারক, রুচিকারক। কাঁঠালের পাতা সর্পবিষের প্রতিষেধক।

আমরা জীবনানন্দের কাঁঠাল বৃক্ষের করলাম তারই পঙ্ক্তি সাজিয়ে :

কাঁঠাল গাছের তলে হয়তো বা ধলেশ্বরী চিলায়ের পাশে-

তবুও কাঁঠাল জাম বাংলার- তাহাদের ছায়া যে পড়িছে

আমার বুকের পরে, আমার মুখের পরে নীরবে ঝরিছে

খয়েরি অশত্থপাতা- বৈচি, শেয়ালকাঁটা আমার এ দেহ ভালোবাসে।

ড. নওয়াজেশ আহমদ ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ। তিনি চাইতেন জীবনানন্দের বর্ণনাভঙ্গির বিশ্বস্ত রূপায়ণ। চিত্রগ্রাহককে খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন কীভাবে দৃশগুলো তুলতে হবে। বৃক্ষ থেকে পাতা ঝরার দৃশ্যের পেলব করতে চাইতেন।

ঝিনাইদহের মল্লিকপুরে গিয়েছিলাম পৃথিবীর সবচাইতে বৃহৎ মহাবটের করার জন্য। সেই গাছ থেকে শত শত ঝুরি নেমে সেই বিরাট এলাকাটিকে রহস্যময় করে তুলেছে।

ড. নওয়াজেশ আহমদ সেই দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন ‘জোনাকির রঙে ঝিলমিল মোলায়েম সন্ধ্যা নেমে আসে মল্লিকপুরের প্রান্তরে। শতাব্দী প্রাচীন এই মহাবট সবুজ পাতা, শালিক, দোয়েল, লাল ফল বুকে নিয়ে এক আকাক্সক্ষার গান গেয়ে উঠল যেন। হাজার পাখির কলকাকলিতে মহাদ্রুম কল্লোলিত। মনে হলো পৃথিবীর সব পাখি এসে আশ্রয় নিয়েছে এই মহাবনস্পতির বিশাল, বিস্তৃত শাখা-প্রশাখায়। পশ্চিমের রক্তিম আভা ধীরে ধীরে চুপসে গিয়ে ফিকে নীল হয়ে যায়। সে ধূসর আলোয় মহাদ্রুম মুহূর্তে যেন জননীর আলিঙ্গনে সব পাখি, কীটপতঙ্গ বুকে জড়িয়ে নিল আলগোছে।’

ড. আহমদ ‘রূপসী বাংলা’র ফিলার নির্মাণ করার সময় যেনবা উপনীত হলেন এক ঘোরলাগা অবস্থায়। জীবনানন্দ তার রহস্যময় প্রকৃতি চেতনাকে আমাদের মাঝে অপূর্বভাবে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন।

ড. নওয়াজেশ আহমদ দীর্ঘদিন থাইল্যান্ডের গ্রামীণ বুদ্ধ মন্দিরে কাজ করেছেন। তার কাজের বিষয়টি ছিল গ্রামীণ নিসর্গের মাঝে বুদ্ধ মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী কীভাবে মানুষের ধ্যানমগ্নতায় সাহায্য করে থাকে। কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ তাপিত হৃদয়কে ¯িœগ্ধ, প্রসন্ন করে তোলে। নমিত করে তোলে।

জীবনানন্দের অনুভবে :

‘আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে বসে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো- গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে- আসিয়াছে শান্ত অনুগত- বাংলার নীল সন্ধ্যা- কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে :

জোনাকি আসিবে শুধু; ঝিঁঝি শুধু সারারাত কথা কবে ঘাসে আর ঘাসে।’

ড. নওয়াজেশ আহমদের বাড়ি মানিকগঞ্জের পারিল-নাওয়াধাতে। সেখানে তাদের সুপ্রাচীন বাড়িটির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। পারিলের পৌষ সংক্রান্তির লোকায়ত মেলাতে যাওয়ার জন্য তার বন্ধুবান্ধবদের মাঝে বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন ড. আহমদ। গ্রামীণ পরিবেশে গিয়ে নাগরিক বিদগ্ধজনরা যেন তাদের হারানো শৈশবকে খুঁজে পায়। তিনি এই সমাবেশটি করেন প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে গিয়ে যেন মানুষ শিকড় সংলগ্ন হয়। এই সংলগ্নতা তাকে স্বদেশের অপরূপ পরিবেশের প্রতি সচেতন করে তুলবে।

‘রূপসী বাংলা’র চিত্রায়ণের জন্য সেখানে একবার গিয়েছিলাম। নাট্যজন আলী জাকেরও বেশ উৎসাহী ছিলেন সেখানকার নিসর্গ শোভিত অঞ্চলের ছবি তোলার জন্য। শক্তিশালী লেন্সযুক্ত মূল্যবান ক্যামেরা নিয়ে যেতেন তিনি। উদ্ভিদ জগতকে পরিচিত করানোর গাইড হিসেবে থাকতো ড. নওয়াজেশ আহমদ। তারা দুজন বুনোফুলের ছবি তুলতেন। আক্ষেপ করে বলতেন, ‘নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আর সঠিকভাবে গাছপালা চেনে না। ড. নওয়াজেশ আহমদ পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য ভয়ানক ব্যথাতুর ছিলেন। প্রাকৃতিক সম্পদের চরম সংহার তাকে অনিবার্যভাবে বিষণœ করে তুলত। যে সংহারের ফলে দেশের সমগ্র প্রাণমণ্ডলের পরিবেশ ভীষণভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই বিলোপনে সবচেয়ে বিপর্যস্ত হয়েছে উদ্ভিদ জগত।’

জীবনানন্দের কবিতার পঙ্ক্তিসমূহের চিত্রায়ণের মাধ্যমে মানুষকে পরিবেশ, প্রতিবেশ সম্পর্কে ‘রূপসী বাংলা’র প্রতি সচেতন করার প্রয়াস নেয়া হয়েছিল।

‘অশত্থ বটের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী,

ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠোনের শালিকের তরে।’

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj