২নং প্যাভিলিয়ন

শনিবার, ৫ জানুয়ারি ২০১৯

রেদওয়ান সামী

বইমেলা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে কয়েক পা এগিয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার সঙ্গে আরো দুজন ছিল। রবি এবং রুবেল। ওদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুক্রবারের জন¯্রােতে হয়তোবা ওরা এতক্ষণে ভেসে গেছে বইমেলার ভিন্ন-ভিন্ন গলিতে। আমি কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে সেখানটিতেই। গেট দিয়ে ঢুকে, কয়েক পা এগিয়ে ২নং প্যাভিলিয়নের সামনে। এক ধরনের চুম্বকাকর্ষণ আমায় সামনে এগুতে দিচ্ছে না। মানুষগুলো আমার সঙ্হে ধাক্কা লেগে-লেগে ছিটকে পড়ছে অদূরে; অথচ আমি অনড়, ঠায় দাঁড়িয়ে। আমি যেন বরিশালের লঞ্চ-সুন্দরবন সাত। নদীতে ভাসমান কচুরিপানাগুলো লঞ্চের তলায় ধাক্কা খেয়ে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘনার অথৈ কালো জলে।

আমি ২নং প্যাভিলিয়নের দিকে এগিয়ে গেলাম। আহ, কত সুন্দর-সুন্দর বই। প্রচ্ছদগুলো থেকে চোখ ফেরানো যায় না। কৌত‚হল চেপে রাখতে পারলাম না। কে করেছে এমন নান্দনিক প্রচ্ছদ? একটা বই হাতে তুলে নিলাম। বইটির নাম পেনশনের ফাইল। লেখক সালাম সরকার। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রæব এষ।

মিনিট দশেক প্রচ্ছদটা দেখলাম। লেখকের কথা পড়লাম। লোভ সামলাতে না পেরে প্রথম গল্পটা পড়ে ফেললাম। দারুণ তো। সংগ্রহে রাখার মতো। বইটি বগলদাবা করে অন্য বইগুলো দেখছি। কোনটা রেখে কোনটা নেব বুঝে উঠতে পারছি না। ‘পেনশনের ফাইল’টা তুলে দিলাম সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেলসগার্লের দিকে। দেখুন তো বইটির দাম কত হয়?

প্রথমত আমি একটা হোঁচটের মতো খেলাম। এত সুন্দর একটি পরী আমার সামনে দাঁড়িয়ে? অধরে তার গোলাপি হাসি লেগেই আছে। এই ময়দার যুগেও মেয়েটি তার স্বকীয়তাকে ধরে রেখেছে। শ্যামলা বর্ণের মেয়েটিকে তাতে যেন আরো সুন্দর লাগছে। গতকাল ফেবুতে এক মেয়ে কবিকে দেখলাম। দেখতে সুন্দরী বটে। কিন্তু মেকআপের কারণে বিশ্রী লাগছিল। যেন পৃথিবীর সব ময়দা গুলিয়ে মুখে মেখেছে। মেয়েরা প্রকৃতিগতভাবেই সুন্দর। তাদের মেকআপ করা মুখ দেখলে গা রীতিমতো ঘিনঘিন করে।

বইটির মূল্য ১৫০ টাকা। সেলসগার্লটির কথায় আমি পার্থিবে ফিরে আসি। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। মেয়েটির সামনের উপরের দুটি দাঁত বাঁকা। ইঁদুরের দাঁতের মতো ছোট বাঁকা দাঁত দুটো মেয়েটির হাসির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। আচ্ছা, মেয়েটি কি জানে তার হাসি এত সুন্দর? আসলে আমরা কেউই রাখি না আমাদের সুন্দরের খবর। আমরা প্রত্যেকেই নিজ-নিজ স্থানে সুন্দর। কিন্তু সে খবর আমরা রাখি না। যেমন রাখেনি এই মেয়েটিও। তার বাঁকা দাঁতের হাসি যে কতটা মুগ্ধকর তা সে জানে না। কি জানি হয়তোবা জেনে থাকবে।

আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি মনে হয় লজ্জা পেল। লজ্জা ফুটিয়ে তুলেছে তার নাকের ডগার বিন্দু বিন্দু ঘাম। শহুরে মেয়েদের লজ্জা বস্তুটা একটু কম-ই। এই মেয়েটি লজ্জা পাচ্ছে কেন ঠিক বুঝতে পারছি না।

বইটি হাতে নিয়ে বললাম, লেখককে পাওয়া যাবে? নতুন বই। মেলা থেকে নিচ্ছি। অটোগ্রাফ ছাড়া কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে।

মেয়েটি তার স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে আরো কয়েক মাত্রা নিচু আওয়াজে বলল, লেখক আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবে। তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনি চাইলে আমার কাছ থেকেও অটোগ্রাফ নিতে পারেন। একটু অবাক হলাম, আমার জানা মতে লেখকরা তো প্রতিনিধি পাঠান না। এই লেখক পাঠিয়েছেন। না জানি কত বড় মাপের লেখক!

২.

মেলা থেকে বাসায় ফিরতে-ফিরতে রাত এগারোটা বেজে গেল। ক্লান্ত শরীর। মা বলতেন, ‘রাতে না খেয়ে ঘুমতে নেই। রাতে খালি পেটে ঘুমলে শরীর ভেঙে যায়।’ মার কথা রক্ষা করছি গত তিন বছর। মা নেই মার কথা রয়ে গেছে। মানুষ থাকে না। থেকে যায় স্মৃতি। আমি ফ্রেশ হয়ে হালকা-পাতলা কিছু খেয়ে নিলাম। পেনশনের ফাইলটি হাতে নিয়ে টেবিলে বসলাম। বইটি পড়া দরকার। দারুণ লেগেছিল প্রথম গল্পটা। বাকিগুলোও নিশ্চয় ভালো হবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। লেখকের কথায় পড়েছিলাম, বইটিতে পেনশনের ফাইল নামে একটি গল্পও আছে। গল্পটি একটি প্রতিযোগিতায় সেরা মুক্তিযুদ্ধের গল্প পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু এত রাতে পড়তে বসব কীভাবে? বড় ভাবী এসে তো গলা টিপে ধরবে। ‘এত রাতে আবার কিসের পড়া। ঘুমো বলছি। একদিন বলেছি না, রাত এগারোটার পরে আর কোনো পড়া নেই। সারাদিন পড়বি, সারারাত পড়বি তাহলে ঘুমবি কখন?’

মা মারা যাওয়ার পর থেকে এই মহিলাটিই আমাদের মায়ের মতো। কী করে যেন মায়ের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। আমাদের বুঝতেই দেয় না যে, আমাদের মা নেই, মারা গেছে।

আমি দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। জানালার পর্দাটা টেনে এনার্জি বাল্বটা জ্বালিয়ে দিলাম। বড় ভাবী যেন কিছুতেই বুঝতে না পারেন।

পেনশনের ফাইল বইটি খুলতেই চোখ পড়ল অটোগ্রাফের দিকে। ছোট্ট একটা ধাক্কা খেলাম। মিথিলা মিষ্টি। কাজী নজরুল স্টাইলে অটোগ্রাফ। দারুণ তো। মেয়েটির শুধু বাঁকা দাঁতের হাসি সুন্দর তা না, ব্রেনও হাসিটির মতোই স্বচ্ছ। পরের পৃষ্ঠা উল্টালাম। এবার আরো জোরেসোরে একটা ধাক্কা খেলাম। আট রংয়ের আটটা গোলাপ আঁকা। তাও আবার একটি ফিতা দিয়ে বাঁধা। ফিতাটির রং সবুজ। নিশ্চয় মেয়েটি এঁকেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্তে এত সুন্দর পরিপাটি হাতের কাজ করল কী করে? সে যাই হোক রহস্যটা ঠিক ধরতে পারলাম না। গোলাপ আটটা কেন? তাও আবার আট রংয়ের? মাথায় কিছু ঢুকছে না।

নিচে একটা টেলিটক মোবাইল নম্বর দেয়া। ফোন করে জিজ্ঞেস করে নেব নাকি? না, সেটা করা যাবে না। তাহলে আমায় বোকা ভাববে। কারো কাছে আমি বোকা হতে চাই না। শুধু আমি কেন কেউই চায় না।

দরজায় কার যেন টোকা পড়ল। রাত এখন একটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। কে হতে পারে এত রাতে। বাম হাতে বইটা পেছনে লুকিয়ে ডান হাতে দরজাটা খুলে দিলাম।

‘রবিন, তোমাকে না একদিন বলেছি রাত এগারোটার পর কোনো পড়া নেই, এখনো জেগে আছো কেন? রাত জেগে কী করছিলে?’

বড় ভাবীর কথা শুনে আমার কলজে শুকিয়ে গেল। হাত-পা কাঁপছে। কোনো সময় যেন বইটা পেছন থেকে পড়ে যায়! বড় ভাবী আমার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি গেলাম জানালাটার দিকে। ভাবী যেন না দেখে। তাই আস্তে করে পেনশনের ফাইল-বইটা জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম। পাঁচতলা থেকে বইটি নিচে পরতে একটু সময় নিচ্ছে। আমি তাকিয়ে থাকলাম বইটির দিকে। কোত্থেকে একটা মালবাহী ট্রাক এল হুইসেল দিতে দিতে। আর বইটি পড়তে-পড়তে ট্রাকের উপরেই পড়ল। বইটিকে বহন করে ট্রাকটা চলে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি সেদিকে। চোখ জোড়া ভিজে এল। অশ্রæ সংবরণ করতে জানালা দিয়ে উপরে তাকালাম। আকাশে চাঁদ উঠেছে। অপরূপ জোছনা। আমি ভাবীকে ডাক দিলাম, ‘ভাবী, দেখো আকাশে কত বড় একটা চাঁদ উঠেছে। ঝর্না ধারার মতো চাঁদের গা বেয়ে পড়ছে জোছনা!’

ভাবী বলল, ‘মায়ের কথা মনে পড়ছে রবিন? মন খারাপ করো না, আমি তো আছি। রাত অনেক হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ো!’

আমি শুয়ে পড়লাম। ভাবী আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর একটি স্বপ্ন দেখলাম। সেই ২নং প্যাভিলিয়ন। মেয়েটির বাঁকা দাঁতের হাসি। সবুজ ফিতে দিয়ে বাঁধা হাতে আঁকা আট রংয়ের আটটি গোলাপ। মালবাহী ট্রাক এবং এক রূপসী তরুণী চাঁদ।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj