উকুনপ্রেম

শনিবার, ৫ জানুয়ারি ২০১৯

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

প্রায় বাইশ বছর আগের সুশুভ্র নরম কাশফুলের সঙ্গে কিছু চাপা ফুলের পাপড়ি হঠাৎ আমার দৃষ্টিকে একবিন্দুতে স্থির করে দেয়! ছল ছল করে ওঠে শীতল চক্ষু জোড়া। পরম মমতা ও আবেগে আলতোভাবে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি সেগুলো। জরাজীর্ণ, রুক্ষ শুকনো সেই ফুল আর পাপড়িগুলোকে আমার বড্ড আপন লাগে। মনে হয় আজো যেন কোনো এক অপার্থিব অস্পৃশ্য সত্তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে ওগুলো। মাদকতাময় শরীরের ঘ্রাণ বয়ে বেড়াচ্ছে নিরন্তর। এসবে মুহূর্তে নস্টালজিয়াও পেয়ে বসে আবার। স্মৃতিকাতর ভগ্ন হৃদয়ে উঁকি দেয় যৌবনের প্রথম প্রেমের দুর্নমিত দুর্বার দুরন্ত সময়ের কথা।

সেগুন কাঠের প্রায় শতবর্ষী পুরাতন আলমিরাটা ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ হাতে লাগে যুুগপূর্বে সযতেœ তুলে রাখা স্মৃতিকথায়। ধুলোমাখা ধূসর বিবর্ণ নীল চামড়ার ডায়েরিটা হাতে এসে পড়ে। হৃদয়ে বেজে ওঠে পুরনো প্রেমোন্মুখ সময়কার মাতাল সুর ও ঝনৎকার নূুপুরের নিক্কন শব্দ। ফেলে আসা দিনের ঝুমজুম বৃষ্টির ছন্দময় দিন। বৃষ্টির বোল দেখে এখানেই লিপিবদ্ধ হতো কবিতার শব্দঋণ। ইশ! কত আরাধ্য বস্তু। এই তো আমার সেই কাক্সিক্ষত ডায়েরিটা!

শনি থেকে শুক্র, মাস তিথি নিয়ম করে এটাতেই লেখা হতো ভালোবাসার অমলিন অব্যক্ত কথামালা ও বর্ণিল পদাবলী। বৈচিত্র্যময় ফুলের পাপড়িগুলো ডায়েরির শুভ্র পাতায় প্রায় দু’যুগেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের ক্ষণ গণনা করে চলছে। একদিন কেউ একজন নিশ্চয় আসবে। ফুল-পাপড়িগুলো অবমুক্ত করে ইতিহাসের দায় শোধ করবে সেই সুহৃদজন। কালের নীরব সাক্ষী হয়ে স্মৃতিষ্মান দিনগুলোকে বারবার যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পুরো ডায়েরির পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠাজুড়ে ভালোবাসার রংয়ে খচিত কথামালাগুলোকে অনেকাংশে আড়াল করে রেখেছে ফুল-পাপড়ির ছোপ ছোপ ধূসর কালচে দাগ। আরো কিছুদূর পৃষ্ঠা ওল্টাতেই ভেসে ওঠে আমার প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি রুপার মুক্তোঝরা কমনীয় কোমল হাতের লেখা কবিতার দুটো ছত্র। দেবীর মতোই ছিল দেখতে রুপা। আমার তৃৃৃষার্ত ও বুভুক্ষ হৃদয় গোগ্রাসে পড়া শুরু করে কবিতার পঙ্তিদ্বয়- ‘নীল জোছনা কুড়িয়ে এলাম তোর-ই উঠোনটায়; দরজা খুলে আয় বেরিয়ে ভিজবি জোছনায়।’

সেই নব্বই দশকের কথা। রুপার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় পর্বটা হয় একটু নাটকীয়ভাবেই। কলেজে প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস চলছিল তখন। রুপা বসেছিল আমার ঠিক বাঁপাশে। থির হয়ে বসে থাকা একাগ্রচিত্তের মেয়েটির উষ্ণ নিঃশ্বাসের তপ্ত অণুগুলো আমাকে বারংবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল মুগ্ধের মতোই। রুপার দোদুল্যমান বেপরোয়া দীঘল কালো ঘন চুলগুলো জানালা গলিয়ে আসা দখিনা বাসন্তী শিরশির বাতাসে দোল খেয়ে আমার প্রেমার্দ্র হৃদয়ের সন্তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছিল কয়েকগুণ। ক্লাস প্রায় তখন শেষের দিকে। হঠাৎ লক্ষ করি, ঘাড় বেয়ে একটা দুষ্টু উকুন রুপার গহিন চুলের অরণ্য থেকে নিচের দিকে নেমে আসছে। প্রেমদূত এভারেস্ট বিজয় করে ফিরছে যেন। আমি খপ করে উকুনটাকে ধরে ফেলি!

রুপা ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খায়। চরম বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকায়। ‘এটা কী হলো? কোন ধরনের অভদ্রতা আপনার?’

সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমার বুঝতে বাকি নেই, ও আমাকে ভুল বুঝেছে।

‘এই ধরুন, আপনার জিনিস আপনারই থাকুক। এই জগতে যেচে কারো উপকার করতে নেই, উপকারীর ভাত নেই।’ এই বলেই উকুনটা রুপার নরম ও পেলব হাতের মুঠোয় চালান করে দিলাম!

লজ্জাও এত সুন্দর হয়! জানা ছিল না আমার। চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না সে কিছুুুুতেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ছোট্ট একটা শব্দ খরচ করে-‘সরি!’

ব্যস সেই থেকে শুরু হয় দুজনের একসঙ্গে পথচলা। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অতঃপর দুর্বার দুুুুরন্ত প্রেমের ছোটাছুটি। হৃদয়পুরের প্রেমের মিউজিয়ামে সেই প্রেমদূতখ্যাত ছোট্ট উকুনটাকে আমি আজো দুধকলা দিয়ে পুষে রেখেছি। অস্পষ্ট আলপনায় ভালোবাসার সাঁঝে প্রেমপিয়াসী আমি ছুটে চলি নিরন্তর আদিগন্তের মাঝে। রুপার লুকোনো আঁচলের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে লুণ্ঠিত হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা একে একে এসে জড়ো হয়। তার দীঘল কালো ঘনচুল ও নদীকান্ত চোখের কাজলের গভীরে আমার নিষ্পাপ প্রেমের মৃত্যু দেখেছি অগুনতিবার। তার পাপড়িময় ঠোঁটের গিরিখাদে প্রবাহমান নদীতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছি শত-সহ¯্রবার।

তারুণ্যের প্রেম কখনো ভোলা যায় না। তা হারিয়ে যেতেই আসে। সবকিছুকে ওলটপালট ও ধ্বংস না করে সে ক্ষান্ত হয় না। আঠারোর ওইটুকুন দুর্নমিত প্রেমও বুঝতে চায়নি কোনো কিছুই। পিপীলিকার পাখা গজে মরিবার তরে। আমারও গজেছে। যেচে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে গিয়েছি আমি। রুপার নিটোল দেহের ছন্দে মন্দাক্রান্তার আহ্বান কিংবা রক্তকোষে মাদকতা, অজানা শিহরণ, আর অবিরাম স্বগতোক্তি আমাকে মোহগ্রস্ত করে রাখত সবসময়। ওর স্ফুরিত অধরের রক্তমতায় জয়ের অদম্য স্পৃহা চুম্বন-দংশনে রক্তপিপাসু ইচ্ছের হুটোপুঁটি আমাকে প্রতিনিয়ত উন্মাদ করে দিত।

এই ক্লান্তিহীন পৃথিবীর পথচলায় প্রতিনিয়ত যুদ্ধরত হতভাগ্য জীবনের সঙ্গে নিষ্ঠুর বিষাক্ত ছোবল ধরায় নিয়তি। তেমনিভাবে খসিত তারার মতো রুপা হুট করে একদিন হারিয়ে যায় আমার জীবন থেকে। একদম চিরতরে। অন্যের হয়ে যায়। রুপারা অন্যের হয়ে যেতে জন্মায়। আজ আর আমার হৃদয়ের কোনো কথা রুপার কর্ণকুহরে প্রবেশের কথা নয়। ওর দৃষ্টিসীমানার যোজন যোজন দূরে থাকা এই আমার বেদনার নীলচে আলোকরশ্মিটা রূপার কর্ণিয়া ভেদ করে রেটিনার কোনো কোষকেও স্পর্শ করার কথা নয়। এসব বুঝার কথা নয় রুপারও। আমি তো তার আঁখিতে ঢেলে দিইনি আমার ক্ষরিত আবেগের দুফোঁটা লোনা জল! তারুণ্যের চপলতা ও অজানা সোনালি সুখের নেশায় একদিন যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, আজ সে মানুষটি নিশ্চিত, নির্ভার সুখের নেশায় বিভোর।

প্রেম আর জল এক অর্থে সমার্থক। জল আর প্রেম ছাড়া জীবন হয় ঊষর। আজ আমার কিছুুই অবশিষ্ট নেই। একফোঁটা জলও নেই, প্রেমও নেই। অদৃশ্য জলাবদ্ধতার চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে সবকিছু। আবেগী বেহায়া মনটা আমার নীরব নিথর হয়ে আজ শুধু ভাবে। বেদনার নীলভাবাকাশে হাতড়ে বেড়ায় হঠাৎ এসে হারিয়ে যাওয়া যৌবনের ক্ষরিত উকুনপ্রেমটুকু। হৃদয়পোড়া স্মৃতির চুপকথারা ধূূপছায়া হয়ে মুহুর্মুহু আমাকেই চতুর্দিকে ঘিরে ধরে। চারিদিকে শুধু প্রহসন আর প্রহসন, বেহায়া সাধক মন আজ হয়েছে অচলায়তনের ঘেরাটোপে বন্দি। সেখানে আমি অসহায়, নিঃস্ব, সঙ্গীহীন। আমি এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকব জানি। পৃথিবীর একান্ত নিভৃতচারী মানুষ হয়ে। মাঝেমধ্যে মাথার স্নায়ুগুলো অসহ্য বেদনায় কুঁকড়ে উঠবে, হয়তো কিছুটা মতিভ্রমও ঘটবে আমার। দূর-অদূরে কোথাও পরিচিত টুং টাং শব্দ হবে, খসে পড়বে পুরাতন ভাবনা দেয়ালের পলেস্তারা কিংবা একটা দুটো ধূসর বিবর্ণ পাতা। পাতাঝরার শব্দে চমকে উঠব আমি। মনে হবে এই বুঝি তুমি ফিরে এলে শ্রাবণের মেঘে ভিজে জবুথবু হয়ে। আবার কখনো কখনো মনে হয় নির্জন অলস দুপুরের ভাতঘুুম ভেঙে কিংবা মধ্য রাতের নিস্তব্ধতাকে খাক করে কেউ একজন হঠাৎ ডেকে ওঠবে- ‘রুপা, এই রুপা এই!’ মেঘাবৃত আকাশের ক্ষণপ্রভার মতো চকিত চাহনিতে আমিও বিহŸল আনন্দে রাজ্যের অবিশ্বাস নিয়ে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠব, জোরে হেঁকে উঠব, ‘কে ওখানে, কে?’

:: ছোটশরীফপুর, লালমাই, কুমিল্লা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj