জীবনের টানে

শনিবার, ৫ জানুয়ারি ২০১৯

নূর হোসেন

আড়াইটা বাজতে তিন মিনিট বাকি। লগ আউট বাটনে আঙুলের ছাপ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে তুষার। পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দেয়। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে জিও দা সিলভার গান শুনতে থাকে। হুন্দাই ব্রান্ডের কোস্টারটি সজোরে চলতে থাকে গন্তব্যের দিকে। গান শুনে আর জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। দেখতে থাকে ধনকুবেরদের অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্টগুলো যার কোনোটির সঙ্গে কোনোটির কিঞ্চিৎ মিল নেই, প্রত্যেকটিই নতুন ডিজাইনের মনে হয়। দেখতে থাকে পাশ দিয়ে যাওয়া পাজেরো আর প্রাডোর বহর।

ইংলিশ গানের সঙ্গে এসব দেখলে সত্যিই নিজেকে হারিয়ে ফেলে কল্পনার রাজ্যে। অনেক কিছুই মনে হয়। মনে মনে অনেক উচ্চাভিলাষী অসম্ভব টাইপের কিছু স্বপ্ন দেখে। অহেতুক প্রশ্ন ছুড়ে দেয় বিধাতার কাছে। সবাইকে সমান করলে না কেন? নিজেই উত্তর দেয়। সবাই সমান হলে প্রবাসী কারা হতো?

২৫/৩০ মিনিটের মাথায় গাড়ি এসে থামে মেসের দরজায়। কিছু খায় না। শুধু ফ্রুট জুসটা হাতে করে সোজা চলে আসে রুমে। তড়িঘড়ি করে অজু করে আসরের নামাজ সেরে ট্রাকস্যুট লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। খানিক হাঁটে, খানিকটা দৌড়ায়। ইয়ারফোন কানেই থাকে। কথা বলে দেশে অবস্থানরত পরিবারের সঙ্গে। অনেক কথা হয়। তৎক্ষণাৎ ছবি তুলে পাঠাতে বলে দুই ছেলের। ছবি দেখে। ছোটটা লেপমুড়ি দিয়ে খেলা দেখে, বড়টার সে সময় নেই। তার পরীক্ষা আসন্ন। তাই পড়ায় ব্যস্ত।

মনের ভেতর কী যেন হাহাকার করে ওঠে। হাঁটতে থাকে তবুও। শরীর ঘামায়। মাগরিবের জামায়াতে যেতে হবে, তাই আজানের আধঘণ্টা আগেই হাঁটার সমাপ্তি ঘটাতে হয়।

নামাজ শেষে কানে এবার হেডফোন লাগায়। ল্যাপটপে চালিয়ে দেয় পছন্দের সেই সিলভার গান।

দেখতে থাকে স্টোরেজে রাখা ছবিগুলো। মায়ের ফোল্ডার খোলে। মা চলে গেছে, ছবি দেখে ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়। মনের অজান্তেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে। ফোল্ডার বদলায়। ‘আমরা একত্রে ছিলাম’ লেখা ফোল্ডার ওপেন করে। অনেক ছবি আছে- যারা আজ চাকরিতে নেই, কেউ বা দুনিয়াতেই নেই। ফেলে আসা চাকরি জীবনের বিভিন্ন স্মৃতিতে হারিয়ে যায় ক্ষণিকের জন্য। চাকরিতে যখন ছোট পদে ছিল, কত জায়গাই না দাপিয়ে বেরিয়েছে সে!

পাশের বিছানায় সদ্য অবসরে যাবে এমন একজন এসে পেনশনের হিসেব করে।

তুষার গানে আর ছবিতে ডুবে থাকে। কোনো একটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই তার। ছবিতে মত্ত। গায়ে ছোঁয়া দিলে হেডফোন আলগা করে। প্রশ্ন করে। উত্তর দিয়ে আবার হেডফোন লাগায়।

ভাবতে থাকে, অর্থ কি মানুষের জীবন মানের পরিবর্তন ঘটাতে পারে? অনেক মানুষকেই তো দেখে সে যাদের অনেক টাকা আছে অথচ জীবন মানের হিসেব কষলে তারা তার কাছে শূন্য পাবে। তার মনে হয় শুধু অর্থই নয় বরং মানসিকতার উন্নয়নটা জরুরি। মানসিক পরিবর্তনই মানুষকে সুখ দিতে পারে। পারে জীবনমানের পরিবর্তন ঘটাতে। ভিন্ন মতও থাকতে পারে এ ব্যাপারে। তার মতো নগণ্যের মতামত আর কতটুকুই বা সঠিক হবে।

ছবি দেখে মন খারাপ হয়।

মায়ের কথা মনে পড়ে।

মা কোথায় আছে, কেমন আছে? এসব জানার খুব ইচ্ছে জাগে। স্ত্রী সন্তানসহ আপনজনদের কথা মনে পড়ে। ভাবতে থাকে, কোথায় পরিবার আর কোথায় সে। আপনজনরা কোথায় আর সে কোথায়।

আচ্ছা, আপনজনদের ছেড়ে তো একদিন নিরুদ্দেশ হয়েই যাবে তাই না? এ প্রবাসের অবসান ঘটিয়ে তো একদিন চিরপ্রবাসী হবে, তাই না। ওরা কতদিন তাকে মনে রাখবে? ওরা কি তার ফেলে যাওয়া কৃতকর্মের মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য খুঁজে পাবে? যেটা তাকে দীর্ঘসময় স্মরণ করতে সহায়তা হবে।

প্রশ্নের সংখ্যা বেড়েই যায় কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj