চিন্তা চেতনার চৌহদ্দিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

শুক্রবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ, গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ গঠন, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, জানমালের নিরাপত্তা বিধান, ধর্ম পালন, নিজস্ব সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-বিশ্বাসের অবারিত চর্চা নিশ্চিত করা ইত্যাদি সাধারণ জাতীয় আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য মত প্রকাশের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন প্রতিটি জাতির জন্য অপরিহার্য।

দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অনেক সংগ্রাম-আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। গোটা জাতির অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়েই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।

স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে শুধু শাব্দিক অর্থে নয় প্রকৃত প্রস্তাবে অর্থবহকরণে সবাই সচেষ্ট থাকার অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। ভিন্নমুখী ব্যাখ্যার বাতাবরণে স্বাধীনতার অর্জন যাতে কোনোভাবেই ¤øান না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার আবশ্যকতা রয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করা তারচেয়ে বেশি কঠিন। চলমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং দেশীয় বাস্তবতায় এ বিষয়টি নানাভাবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাতির স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম ও পদক্ষেপ গ্রহণের দ্বারা অর্থনৈতিক শক্তির সমৃদ্ধি ছাড়া স্বাধীনতা টেকসই হতে পারেও না।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ উঠলে দেখা যাবে, বিগত আটচল্লিশ বছরে বাংলদেশের অর্জন একেবারে কম না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল, ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। প্রায় পাঁচ দশক সময় অতিক্রান্ত হলেও গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, বাস্তবতার আলোকে তা বলার সময় আসেনি। সহনশীলতা, ধৈর্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ মেলে। সংঘাত-সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে এখনো বেরিয়ে আসা যায়নি। জনগণ এখনো রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করে থাকেন। নাগরিকদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ চেতনা গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন উদ্বেগ ও শঙ্কামুক্ত, ঐকমত্যের বলীয়ান শক্তির। প্রয়োজন আস্থাবান, সুশাসন, সততা ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।

স্বাধীনতা অর্জনে বেশি প্রয়োজন সংগ্রাম ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য ও ন্যায়বোধ। এ ছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে জ্ঞান, বুদ্ধি, শিক্ষা ও সৎ বিবেচনাকে কাজে লাগানো একান্ত অপরিহার্য। জনগণ যথেষ্ট সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হয় এবং সদা সতর্ক থাকতে হয়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের এই মৌল চেতনায় সবাইকে অনুপ্রাণিত হওয়ার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ লড়াই, এ বিপুল আত্মত্যাগ নিছকই একটা ভূখণ্ড, জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা বা মানচিত্রের জন্য ছিল না। সুদীর্ঘকাল শোষণ ও বঞ্চনার, বৈষম্য ও বৈরিতার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের জন্য এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো পেতে চেয়েছিল, যা কতগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করবে। নাগরিকদের মধ্যে সেগুলো নির্বিঘ্ন চর্চার পরিসর তৈরি করবে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সেসব আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না বলে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে টেকেনি। মুক্তির সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসে একটি অনন্য ও অভিনব বাস্তবতা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য একদিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে অভিষিক্ত করে, অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে পাওয়া সেসব আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার এক কঠোর দায় আরোপ করে এবং অবারিত সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ তাই একাধারে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি আত্মমর্যাদা লাভের দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা।

স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশতক পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এলাম। আর দুই বছর পর এর স্বর্ণজয়ন্তী। এখন তাই আমাদের সময় হয়েছে, মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাওয়া সেসব আদর্শ ও স্বপ্নের দিকে বারবার ফিরে তাকানোর, তার কতটা আমরা পূরণ করতে পারলাম বা পারলাম না তার হিসাব কষে দেখার।

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের দুই দশকের আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে, যুদ্ধদিনে আত্মোৎসর্গের পেছনের অমর স্বপ্নের মধ্যে নিহিত হয়ে আছে সেসব আদর্শ, মূল্যবোধ আর স্বপ্ন তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে অনুভব করা হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র মধ্যে সেসব আদর্শ, মূল্যবোধ আর স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে আদর্শগুলো ধারণ করে তাদের অন্যতম হচ্ছে সব প্রকার শোষণ বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মানুষের সার্বিক বিকাশের মুক্তি, বিভিন্ন ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসহ বাঙালি জাতিসত্তা, উদার গণতন্ত্র, দল-মত নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িকতা, মৌলিক অধিকার অর্জনে সাম্য ও মানবাধিকার।

মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সর্বোপরি মুক্তির স্পৃহা যা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় জনমনে সংহতি নির্মাণ করেছিল, যে গুণাবলি দেশের জন্য শীর্ষ ত্যাগে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তা ¤øান হতে দেয়া হবে আত্মঘাতী প্রবণতা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় যে জনগণ অর্থবিত্তের সঙ্গে সম্পর্কহীন ও শেকড়বিহীন অবস্থায় মনোজাগতিক ভূমিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিল, স্বাধীনতার পর তারা ভৌগোলিক ভূমি ও অর্থবিত্তকে অধিকতর গুরুত্ব পাওয়াটাই আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। এতে যে মঙ্গলময় চিন্তা ও আকাক্সক্ষা আপন আত্মার ক্ষুদ্র বলয়কে ছিন্ন করে ব্যক্তিকে সর্বজনীন আবর্তে নিয়ে গিয়েছিল তা স্বাধীনতার পরপর যেমন ছিন্নপত্রের মতো ভেসে যায়, তেমনি বাস্তবতার চাপে স্বার্থান্ধ চিন্তার আবর্তে ব্যক্তির শুদ্ধ অবস্থান ও মূল্যবোধ গভীর অতলে হারিয়ে যায়।

বৃহত্তর চাওয়ার মাঝে যে ক্ষুদ্র চাওয়া এবং সংকীর্ণ চিন্তাগুলো চাপা পড়েছিল সেটাই স্বাধীনতার পর মুখ্য হয়ে ওঠায় গৌণ হয়ে ওঠে সর্বজনীন স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিসত্তার মর্যাদা। শক্তি ও ঔদ্ধত্যের কাছে পরাভূত হয় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা; গৌণ হয়ে ওঠে শান্তির অন্বেষণ। যে আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধেও দর্শন আবর্তিত হয় তা ক্ষতবিক্ষত হওয়ার কারণে গঠনমূলক দর্শন তৈরি অসম্ভব হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা-উত্তর সমাজে শূন্যতা, হতাশা, নৈরাজ্য ও ক্ষমতার ঔদ্ধত্য বা সংঘাত-সহিংসতার নেতিবাচক দর্শনের চর্চা, বিচারের প্রতি, জীবনের প্রতি এবং সামগ্রিক জীবনের ইতিবাচক প্রবাহের প্রতি আস্থা হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে জাতি কেবল আত্মপরিচয়ের সংকটে নয়, অস্তিত্ব সংকটেও নিমজ্জিত হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে প্রেম ও মানবতা নানামুখী ভেদজ্ঞানকে নিম্ন পর্যায়ে এনে বেদনার বাঁধন মাঝে মানবসত্তাকে সমুজ্জ্বল করেছিল, সেই প্রত্যক্ষ বেদনা নিম্নস্তরে নেমে আসায় বহিরাগত শত্রু অলক্ষ্য ছায়ামানুষ হয়ে ওঠে আর আপন মানুষগুলোই স্বার্থের টানাপড়েনে নতুন শত্রু হয়ে যায়।

এ প্রক্রিয়ায় লুটেরা অর্থনীতির উদ্ভব হয়ে সমাজ চিন্তা এবং রাষ্ট্রের দর্শনকে যাতে বদলে না দিতে পারে সে ব্যাপারে সবার সজাগ দৃষ্টি আরো প্রখর হওয়া প্রয়োজন। যাপিত জীবন, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়, জীবনের নানা আকাক্সক্ষাসহ সাধারণের অর্থবিত্ত ও সম্পদের যে কাঠামো মানুষের দর্শন ও মূল্যবোধ নির্মাণ করে, সেই স্থানটি স্খলনের মুখে যাতে না পড়ে সেদিকেও।

স্বার্থবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোতে নবতর আকাক্সক্ষা ও অভাবের জীবনে অধিকাংশ মানুষ হয়ে ওঠে এমন নুড়িপাথর, যার কাছে শ্যাওলা ও শেকড়ের গন্ধময় হারানো জীবনটি বর্জ্য বৈ কিছুই নয়। লোভ ও ভোগের আবর্তে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার অনুসন্ধানের স্পৃহা, নিজের অজান্তে সে হয়ে ওঠে ক্ষমতাবানদের ক্রীড়নক এবং ভোগবাদী সমাজের পণ্য। অদূরদর্শী চিন্তার কারণে গভীর চিন্তাগুলো ও আত্মার মৌলিক জিজ্ঞাসাগুলো গৌণ হয়ে ওঠে।

নির্বাচনে বিজয়ী দল ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রের প্রায় সব দ্বার রুদ্ধ করে দেশ পরিচালনা করার যে অভিযোগ এন্তার উঠে তার সঙ্গে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালানোর প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞার সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন। সত্যকে সত্য বলা মিথ্যাকে মিথ্যা এটাই নীতি-নৈতিকতা। প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার হচ্ছে এ ধরনের পরিবেশে সৃষ্টি হলে সবারই ক্ষতি। সব সেক্টরে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা দরকার বিশেষ করে সব রাষ্ট্রীয় (সরকারি কিংবা দলীয় নয়) প্রতিষ্ঠান, সেবা ও জনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনে। সব ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলার মানুষ পাবে তার হারিয়ে যাওয়া অধিকার। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নৈতিক মূল্যবোধ এই তিনটি বিষয় যদি সমাজে ও রাষ্ট্রে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ পায় তার অধিকার। মানুষ স্বাধীন থাকতে চায় ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্রনৈতিকভাবে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে যথার্থ বলেছেন যে, পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে কখনো মধ্যবিত্ত গড়ে ওঠেনি। তাই সেখানে সামন্ত, ভূস্বামী, পীর, মোল্লা আর জায়গীরদাররা যা বলে তাই জনগণ শোনে। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের বিকাশ হুমকির মধ্যে পড়লে যে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না। একাদশ সংসদ নির্বাচনে সংবিধানের প্রথম তিনটি শব্দে (‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’) যাদের মালিকানা ঘোষিত হয়েছে তাদের মত প্রকাশের অবাধ ও নির্ভয় সুযোগ সুনিশ্চিত করা হবে দেশ ও রাষ্ট্রের সবার সার্বিক স্বার্থেই।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj