কীর্তি তোমার

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

মাকিদ হায়দার

পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্কুল টেক্সট বোর্ডের যে সকল বাংলা বই চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য পাঠ্য ছিল তার ভেতরে কিশোর উপযোগী গদ্য, পদ্য ছাপা হতো, সেই সকল বইয়ে বিশ্বের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আত্মজীবন ছাপতেন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। থাকতো পাকিস্তানের ¯্রষ্টার নাম এবং উর্দু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ইকবালের নাম। এমনকি উভয়ের ছবি, তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনার উল্লেখ থাকতো। যেমন পাকিস্তানের ¯্রষ্টা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বুদ্ধিমত্তার একটি ঘটনার বর্ণনা আমাদের মতো তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির কিশোরদের পড়তে হতো- এমনকি ষান্মাসিক কিংবা বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন থাকতো, জাতির জনক জিন্নার বুদ্ধিমত্তায় পরিচয় দাও।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে সেই সময়ে পড়তে হয়েছিল, জিন্নাহ যখন স্কুলে পড়তেন, তখন বোম্বে শহরের একটি স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে বাঁশি না বাজতেই কোমলমতি কিশোরেরা দৌড় শুরু করলে কিশোর জিন্নাহ উল্টোদিকে দৌড় শুরু করায় দর্শকরা হাসাহাসি শুরু করলে ড্রিল মাস্টার জিন্নাকে ডেকে নাকি জানতে চেয়েছিলেন, ‘তুমি কেন উল্টো দিকে দৌড় দিলে?’ জিন্নাহ সেই প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে ছিলেন বাঁশি না বাজতেই যারা দৌড় শুরু করেছিল, তারই প্রতিবাদে আমি উল্টো দিকে দৌড় দিয়েছিলেম। আমাদের মতো নবীনদের, শিক্ষকেরা জানিয়েছিলেন, জিন্নাহর দৃঢ়তার কথা এবং সাহসিকতার জন্য তিনি একদিন ব্যারিস্টারী পাস করে এসে হয়েছিলেন পাকিস্তানের পিতা। আমরা তখন অনেকেই ক্লাস শেষ করে পাবনা জিলা স্কুলের দক্ষিণ দিকের পুকুর পাড়ে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতাম, জিন্নাহর বাড়ি যদি বোম্বাই শহরে হয়, তাহলে লোকটি আমাদের পিতা হন কীভাবে? ১৯৫৭ সালে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হবার সুবাদে সে বছরের প্রথম দিকে মিষ্টি, টক, সোঁদা মিষ্টি গন্ধওয়ালা বই পিতা কিনে দিয়েছিলেন, পাবনা শহরের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি-বিপিন বিহারী লাইব্রেরি থেকে, আমাদের জিলাপাড়া বাড়িতে এসে প্রথমেই চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বই খুলে চোখে পড়লো গত বছরের বাংলা বইয়ে যাদের ছবি ছিল এ বছরের বইয়ে তাদের ছবি নেই এবং চতুর্থ শ্রেণির সেই মিষ্টি টক সোঁদা মিষ্টি গন্ধের বাংলা বইয়ে দেখতে পেলাম অন্য দুইজনের ছবি, একজনের মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফ, চুল ধবধবে সাদা বলেই মনে হলো আমার কাছে, সেই ছবির নিচে নাম লেখা দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অপর ছবিটি যার, তার দেখি মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, মনে হলো চোখ দুটি বেশ বড়, ছবির নিচেই নাম লেখা কাজী নজরুল ইসলাম।

সে বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ নামের এমটি কবিতা ও গল্প এবং কাজী নজরুলের ছিল, ‘লিচু চোর’, এছাড়া ছিল, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছবি এবং সংক্ষিপ্তাকার জীবনী। কয়েকটি গল্প আর কবিতা ছাড়াও পড়তে হয়েছিল স্ত্রী ক্ষিতীশ চন্দ্র বাচ্যপতির ব্যাকরণ। সেটি হারিয়ে গেলে পিতা কিনে দিয়েছিলেন ‘ব্যাকরণ কৌমুদি’। যতীন্দ্রমোহন বাগচি, সত্যেনদত্ত, কামিনী রায়ের কবিতাসহ কুসুম কুমারী দাশ রচিত ‘আদর্শ ছেলে’ এই নামের একটি কবিতা ছিল- আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে।

১৯৫৮ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন হঠাৎ একদিন আমরা শুনতে পেলাম, পাকিস্তানের নতুন একজন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, নাম আইয়ুব খান। তিনি নাকি মিলিটারিদের প্রধান হয়েই তড়িঘড়ি করে ‘মির্জা’ নামের একজনকে চেয়ার থেকে নামিয়ে দিয়ে সেই চেয়ারই দখল করেছেন। [তখন এবং এখনো বুঝতে অসুবিধে হয়, চেয়ার দখল হয় কি করে?] কে আইয়ুব খান, সেটি আমার জানবার প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজন ছিল পিতার সঙ্গে সেই বিপিন বিহারী লাইব্রেরিতে গিয়ে মিষ্টি, টক মিষ্টি গল্পের ইংরেজি, বাংলা, অঙ্কের বই কিনে, রাতে বইয়ের উপরে মলাট লাগিয়ে, পরের দিন স্কুলে যাবার সময় কাঁধের উপর ৫-৬টি বই নিয়ে স্কুলে যাবার যে আনন্দ ছিল সে আনন্দ আকাশে-বাতাসে মিলিয়ে গেছে বহু বছর আগে। তখনকার দিনে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে ১০-১২টি বই, পানির বোতলসহ দুপুরের খাবার টিফিন বক্সে ভরে দিত না আমার মা রহিমা খাতুন। আমার সহপাঠীর মায়েরাও দিতেন না, কেননা পাবনা জিলা স্কুলে সারা মাসের টিফিনের জন্য মাসিক বেতনের সঙ্গে ৮ আনা পয়সা বেশি দিতে হতো। সেই ৮ আনায় সারা মাসে আমাদের মিলতো ক’টি বিস্কুট, সিঙ্গারা মাঝে মাঝে লক্ষণ ঘোষের রসগোল্লা। ভাগ্যে জুটতো আমাদের।

শুধু যে মিষ্টিই জুটতো তাই নয়, পড়া না পাড়লে প্রথমে বেঞ্চে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন শিক্ষকরা। মাঝেমধ্যে বেত্রাঘাতসহ শারীরিক নির্যাতন। তারচেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল যখন কোনো শিক্ষক বলতেন তোরা যারা পড়ালেখা করিসনে, তোদের সবার বাড়ি আমার চেনা আছে; চেনা তোদের সকল পিতাদের। উনাদের গিয়ে বলে আসবো- তুই কাল ‘নেলডাউন’ হয়েছিলে, অথবা কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেম- যদি তোরা তোদের ক্লাসের পড়াগুলো, বানান ইংরেজি-বাংলা ঠিকমতো শিখে আসিস, তাহলে আমি আর যাবো না তোদের পিতার কাছে। আজকাল কি এই রকম শিক্ষক আছেন?

পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে এবার দেখলাম জসীমউদ্দীন নামের এক কবির কবিতা, আরেকজনের একটি কবিতা, কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে চতুষ্পদ প্রাণীদের নিয়ে রচিত কবিতা সিংহ-জিরাপ, হাতি, ঘোড়া, বাঁদর ইত্যাকার, ইত্যাকার বলছি স্মৃতিতে যেটুকু আছে তারই নিবেদন এইটুকু। যিনি ঐ সকল বন্যপ্রাণী নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন সেই কবির নাম ছিল অন্নদাশংকর রায়। এবং প্রজেশ কুমার রায়, কালীদাস, শাহাদত হোসেন এবং রবীন্দ্রনাথের গল্প কবিতা, নজরুলের কবিতা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামের এক লেখকের ‘বাঘ’ এবং সুন্দর বনের ওপর একটি লেখা। কোন দিক দিয়ে কোন ফাঁকে পড়াশোনা শেষ হয়ে গেল জীবন থেকে। পরিবর্তে এলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি বীরদর্পে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করলো। লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা, মা-বোনসহ ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হলেন একটি মানুষের উদাত্ত আহ্বানে। সেই মহান ব্যক্তি, তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরলেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালের আগেই ১৯৬৫ শেখ শহীদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল থেকে এক শীতের বিকেলে, মাত্র ৮ আনা রিকশা ভাড়া দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন শহীদ ভাইয়ের মামার বাড়ি। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে। শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে, মাঝে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা ’৭১-এর রক্তঝরা দিনগুলোয় পাড়ি দিয়ে কোনোরকমে বেঁচে গিয়েছিলাম আমাদের মতো তরুণেরা। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত হয়েই আমরা কয়েক বন্ধু মিলে পাবনা থেকে কলকাতায় গিয়েছিলেম, ১৯৭২ বিনা পাসপোর্টে। বিনা ভিসায় ভারতীয় বর্ডার গার্ডের শুধু একজন জানতে চেয়েছিলেন, বাঙালি অফিসার ছিলেন তিনি, আমরা জয় বাংলার কোন জেলার লোক, বন্ধু হারুঘোষ, পাবনা জেলাতেই, সেই অফিসার ভদ্রলোক একজন সিপাইকে ডেকে বললেন, ওই ৪ যুবককে নিয়ে গিয়ে আমার রুমে আটকে রাখো। আমি আসছি। ভয়ে আমরা ৪ জনই মুষড়ে পড়তে না পড়তেই ভদ্রলোক এলেন, সঙ্গে ২ জন সিপাই, তাদের হাতে ৫ জনের দুপুরের খাবার, সিপাইদের বিদায় দিয়ে প্রথমেই তিনি জানতে চাইলেন, পাবনার কোন মহল্লার ছেলে তোমরা, হারু জানালো আমাদের বাড়ি লাহিড়ী পাড়ায়, শামসুল হক জানালেন গোপালপুরে। গোপাল ঘোষ জানালেন ঘোষপাড়ায়, মিশনের উল্টো দিকে। আমি বললাম দোহার পাড়ায়।

ভারতীয় সেই বর্ডার গার্ডের অফিসার হারু দাশকে বললেন, ওই লাহিড়ী পাড়াতেই আমাদের বাড়ি ছিল এখন আমরা থাকি ভবানীপুরে। ইতোমোধ্যে টেবিলে খাবার এসে গেছে। তিনি আমাদের বললেন, লাহিড়ী পাড়ার প্রণবেশ সেনকে চেনো নাকি? আমার বন্ধুরা কেউ কেউ বললেন, নাম শুনিনি, তবে কমলেশ সেন, টুনাদা, টুনা সেন, পরেশদা, এদের নাম জানি, টুনাদা তো খুব ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতেন, একবার পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাডমিন্টন খেলায় পাবনা মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল শামসুল ইসলাম স্যার আর টুনাদা গোল্ড মেডেল এনেছিলেন ঢাকা থেকে। পরে সমগ্র পাকিস্তানের ব্যাডমিন্টন খেলায় পুরস্কার পেয়েছিলেন ওই দুইজন।

হারু দাশ থামতেই আমি বললাম, প্রণবেশ সেনের নাম আমি শুনেছি আমার বড় ভাই জিয়া হায়দারের কাছে। প্রণবেশ সেন আর জিয়া ভাই পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র ছিলেন ১৯৫২-৫৪ সালে। আরো শুনেছি তিনি এখন কলকাতার আকাশ বাণীতে চাকরি করেন। ভদ্রলোক একটু থেমে জানতে চাইলেন, বাণী সিনেমা হলটি কি আছে? গোপাল এবং শামসুল একসঙ্গেই জানালো আছে। হারু জানালো আমার পিতা ভানুদাশ ওই সিনেমা হলের ম্যানেজার। আমাদের বিদায়কালে সেই ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, পড়ালেখার খবর। বললাম, আমাদের পড়াশোনার সংবাদ তিনি শেষে বললেন, ওই এডওয়ার্ড কলেজে আমিও পড়েছি। কিছুটা সময় নিস্তব্ধতার ভেতরে কাটলো, শুনলাম ভদ্রলোকের একটি দীর্ঘশ্বাস। তক্ষুনি আমার মনে হলো, হয়তো তিনি তার অতীতের দিনগুলোর কাছে ফিরে গিয়েছিলেন।

সবশেষে জানতে চাইলেন কলকাতায় যাচ্ছ কেন? এক বন্ধু বললো, গড়ের মাঠের সেই পরীটি দেখতে। আরেকজন বললো, বিজ্ঞান জাদুঘর নাকি তারু মণ্ডল, হারু জানালো হাওড়া ব্রিজ। ভদ্রলোক হেসে সব শেষে আমার কাছ থেকে জানতে চাইলেন। সকলের কথাই তো শুনলাম, তুমি কাকে দেখতে চাও। বললাম, জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ি। এবং স্কুল জীবনে পড়া একটি কবিতার কবিকে। যদি তিনি বেঁচে থাকেন তাকে দেখতে যাবো। সেই কবির নাম কি? বললাম অন্নদাশংকর রায়। হঠাৎ তাকে দেখার ইচ্ছে হলো কেন? জানালাম, তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন জন্তু জানোয়ার নিয়ে- পরে তাঁর কবিতা পড়েছি, কবিতাটির গান হয়েছিল সেটিও শুনেছি। কি গান কি কবিতা, ভদ্রলোকের সেই প্রশ্নের উত্তরে জানালাম-

তেলের শিশি ভাঙলো বলে

তোমরা যেসব খুকুর উপর রাগ করো…

তিনি দ্বিতীয়বার জানতে চাইলেন, আর কোনটি, বললাম, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়, রায়বাবু লিখেছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে একটি অসাধারণ ছড়া, এবার বললেন শোনাও। শুনি

বঙ্গবন্ধু

যতোদিন রবে পদ্মা যমুনা

গৌরী মেঘনা বহমান

ততোদিন রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।

বিদায় নেওয়ার সময় জানতে চাইলেন পড়ালেখা শেষ করেছ কবে, বললাম,

স্যার অন্নদাশংকর রায়, কোন এলাকায় থাকেন, জানো কি? না বলতেই তিনি জানালেন কলেজ স্ট্রীটে গিয়ে এম সি সরকার নামের একটি পাবলিশিং হাউস আছে ওদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেই দিতে পারে স্যারের ঠিকানা।

কলকাতায় দর্শনীয় স্থান দেখে একদিন কলেজ স্ট্রীটে গিয়ে এম সি সরকারের প্রকাশনালয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেম, ওরা আমাকে দিতে পারেনি ঠিকানা। মাঝে আমাদের চারজনের খুব ইচ্ছে হয়েছিল সুচিত্রা সেনকে দেখতে যাবো। কথাটি হারুর মাসীকে বলতেই তিনি জানালেন তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না- আমরা তো পাবনা থেকে এসেছি তাও বললে দেখা করবেন না, উনার বাড়িতো আমাদের পাড়ায়। গোপাল থামতেই মাসী জানালেন আমাদের বাড়িও তো পাবনায়। গত পূজায় আমরা পাবনাবাসী রিফিউজিরা দেখা করতে গিয়েছিলেম, তখনি জানতে পারলেম, দারোয়ান জানালো দিদি কারো সাথে দেখা করেন না।

দেখা করেন না, শব্দটি বোধকরি অন্নদাশংকর রায়ের জন্য প্রযোজ্য নয়। ১৯৭২ সালের পরে একাধিকবার কলকাতায় গিয়েছি। ১৯৭৭, ’৭৮ সাল থেকেই অনুজ দাউদ হায়দার যখন শ্রী রায়ের বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে থাকতেন তখন আমরা পরিবারের সকলেই গিয়ে উঠতাম সেই ফ্ল্যাটের তিনতলায় দুটি রুম ভাড়া নিয়ে। সকালের নাস্তা দিতেন শ্রীমতি রায়, যাকে আমরা বলতাম দিদু। আর শ্রী রায়কে দাদু বলতাম। দাদুর সঙ্গে তার মৃত্যুর আগেও একাধিকবার সান্নিধ্য পেয়েছি। তখন লক্ষ করেছি, একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর সঙ্গে যে কেউই দেখা করতে পারতেন, তিনি দুইবার হয়েছিলেন আইসি-এস, বাংলাদেশ থেকে যারা যেতেন তাঁদের জন্য ছিল দরজা খোলা, সেটিও নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে। তাঁর মৃত্যুর বছর দেড়েক আগে কলকাতায় আমি আর জিয়া ভাই গিয়ে উঠেছিলাম তিনতলার ভাড়া ফ্ল্যাটে। খবরটি দাউদ হায়দার শ্রী রায়কে দিয়েছিলেন। খবর শুনে মিসেস রায় ডেকে নিয়ে সকালের প্রাতরাশে, জিয়া ভাই শ্রী রায় এবং আমি বসেছিলেম টেবিলে। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অগ্রজ আর তিনি দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা শেষে জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা একদিন ক্ষমতায় আসবে, এলে মৌলবাদীদের এবং তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচার করবেই।

জিয়া ভাই তখনি বললেন, দাদুতো ময়মনসিংহের জেলা জজ ছিলেন। এখন আপনার কি মনে হয় আইনের দৃষ্টিতে শেখ মুজিবকে হত্যাকারীদের ফাঁসি দেয়া সম্ভব হবে? অবশ্যই হবে তার আগে জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার উপদেষ্টাদের ভেতরে জনাকয়েক ব্যারিস্টার খুনি ফারুক এবং গংদের যে ফাঁসি দেয়া যাবে না বলে আমি আইন বানিয়েছি, সেটি সংসদে বসে আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় আসে তবেই ওই আইনটি বাতিল করলেই ১৯৭১-এর বাংলাদেশ বিরোধীদের এবং ১৯৭৫-এর খুনিদের অবশ্যই ফাঁসিতে ঝোলানো সম্ভব। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানালেন ব্রিটিশ আইনের একটি ধারার কথা।

দাদুর ভবিষ্যদ্বাণী যে এতটা সত্য হবে, কল্পনাও করতে পারিনি। তবে কল্পনাতে দেখতে পাচ্ছি, সামনের নির্বাচনে নৌকার মাঝি-মাল্লারা সেই পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় ভাসবেন। মাস্তুলওলা নৌকার উপরে সবুজ একটি পতাকা। আর পালে যেন দেখতে পাই শ্রী অন্নদাশংকর রায়ের কালজয়ী ছড়া,

যতোদিন রবে পদ্মা যমুনা

গৌরী মেঘনা বহমান

ততোদিন রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj