বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ

শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮

অযথা এন্টিবায়োটিক সেবন ক্ষতির কারণ, বিনা প্রেসক্রিপশনে তা কিনতে বারণ

ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মানব জাতির প্রধান অস্ত্র এন্টিবায়োটিক। অতিরিক্ত, অপর্যাপ্ত ও অযৌক্তিক এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু উদ্ভব হচ্ছে। এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু ব্যক্তির জন্য প্রাণঘাতী হওয়া ছাড়াও সমাজে ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন দ্রুত বিস্তার লাভ করে?

মানুষ, পশুপাখি সবার শরীরেই অণুজীব বাস করে। অহেতুক এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করলে ওই সব অণুজীব অধিকাংশই মারা যায়, কিন্তু দুই একটি যা বেঁচে থাকে তারা ওই এন্টিবায়োটিকটিকে অকার্যকর করার জন্য বিশেষ জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশেষ কায়দা বা রাসায়নিক অণু তৈরি করে। ফলে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিকটির প্রতি বেঁচে যাওয়া অণুজীব প্রতিরোধী হয়ে যায়। এ বিষয়টিকে ‘ঝবষবপঃরড়হ চৎবংংঁৎব’ বলে।

অণুজীব অতি দ্রুত বংশ বিস্তার করে। একটি অণুজীব এক দিনে নিদেনপক্ষে ১০১২ (দশ হাজার কোটি) সংখ্যক নতুন প্রজন্ম উৎপন্ন করে থাকে। তাই প্রতিরোধী অণুজীবের বিস্তারও দ্রুতই ঘটে আসছে।

সারা বিশ্ব জুড়ে অহঃরসরপৎড়নরধষ জবংরংঃধহপব একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং জীবাণুসমূহ এন্টিবায়োটিকের প্রতি তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করেই চলেছে। জীবাণুসমূহ বহু প্রকার এন্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে পড়েছে। ফলে কম বা বেশি দামি সব প্রকার এন্টিবায়োটিক সংক্রমণ চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে; বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ধরনের রোগ জীবাণু ব্যক্তির জন্য প্রাণঘাতী হওয়া ছাড়াও সমাজে ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের সৃষ্টি করতে পারে। উল্লেখ্য, ডড়ৎষফ ঐবধষঃয অংংবসনষু, ২০১৫-তে অহঃরসরপৎড়নরধষ জবংরংঃধহপব চৎবঢ়ধৎবফহবংং, ঝঁৎাবরষষধহপব ্ জবংঢ়ড়হংব অমবহফধ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তা ছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ পলিসি ও নির্দেশিকা প্রণয়নপূর্বক এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে ইতোমধ্যেই কৌশলপত্র, কর্মপরিকল্পনা, ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন ইত্যাদি প্রণয়ন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছরের মতো এ বছর ১২-১৮ নভেম্বর এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ পালন করবে। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সহনীয় মাত্রায় আনয়নের জন্য চিকিৎসকসহ সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অতীব প্রয়োজন।

‘বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ (১২-১৮ নভেম্বর) ২০১৮’-এর প্রতিপাদ্য বিষয়- অযথা এন্টিবায়োটিক সেবন ক্ষতির কারণ, বিনা প্রেসক্রিপশনে তা কিনতে বারণ।

ওই সপ্তাহকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং দেশীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে, বিভাগীয় পর্যায়ে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একযোগে সপ্তাহটি পালন করা হবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিরূপ প্রভাব

** স্বল্প সময়ে স্বল্প ব্যয়ে সংক্রমণ চিকিৎসা হয় না।

** বিশেষ করে শল্য চিকিৎসার সফলতা অর্জন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।

** দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় উপার্জন ব্যাহত হয় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।

** চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।

** ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। জিডিপি (এৎড়ংং উড়সবংঃরপ চৎড়ফঁপঃ) ১%-এর অধিক কমে যায় এবং স্বাস্থ্যসেবার পরোক্ষ খরচ প্রত্যক্ষ খরচের তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে অনুমান করা হয়।

** কার্যকরী নতুন ওষুধ উৎপাদন সময় সাপেক্ষ বিধায় অনেক সময় সংকট দেখা দেয়।

এ পরিস্থিতির পেছনে মানবসৃষ্ট কিছু কীর্তিকলাপ সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

** নিজে নিজে এন্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ সেবন করা।

** দরকার না থাকার পরও এন্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেয়া।

** সঠিক সংক্রমণে সঠিক এন্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা।

** সঠিক মাত্রা ও সঠিক সময়কাল অনুসরণ না করে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা।

** দামি ও বাজারে নতুন আসা এন্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপত্রে লিখার বিশেষ প্রবণতা বা স্টাইল।

** পশু পালন কাজে পশুতে সংক্রমণ চিকিৎসা বা প্রতিরোধ এমনকি দৈহিক বৃদ্ধির জন্যও এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়।

** হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খামারগুলোতেও উপরে উল্লিখিত উদ্দেশ্যে এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়।

** মানুষ, পশু পাখি সবার বর্জ্যরে মাধ্যমে নিঃসরিত হয়ে এন্টিবায়োটিক পরিবেশের উপাদানের সঙ্গে মিশে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি ভূমিকা পালন করছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশি^ক কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছে ‘এএমআর’-এর উদ্ভব ও বিস্তার যেন ধীরগতিতে হয় সে লক্ষ্য নিয়ে কর্মকাণ্ড।

** সংক্রমণের হার ও বিস্তার কমানো।

** উপযুক্ত এন্টিমাইক্রোবিয়াল প্রাপ্তির উন্নতি সাধন।

** এন্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের উন্নতি সাধন।

** স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ এবং অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ঝঁৎাবরষষধহপব) সক্ষমতা বাড়ানো।

** বিধিবিধান প্রয়োগ।

** নতুন ওষুধ ও টিকা উদ্ভাবনে উৎসাহদান।

সিডিসি/স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, এ যাবৎ কি কি করেছে?

** বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ‘এআরসি’ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

** খসড়া জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করে তার আলোকে নিম্নের কমিটিসমূহের অনুমোদন নেয়া হয়েছে।

** জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি।

** জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি।

** কোর ওয়ার্কিং গ্রুপ।

** জাতীয় কর্মকৌশল (উৎধভঃ ঘধঃরড়হধষ ঝঃৎধঃবমরপ চষধহ) ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।

** ঘধঃরড়হধষ চষধহ ড়ভ অপঃরড়হ, টংবৎ’ং এঁরফবষরহব ধহফ খধনড়ৎধঃড়ৎু ঝঙচ ধহফ ঞৎধরহরহম গড়ফঁষব প্রণয়ন করা হয়েছে।

** বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সার্ভেইলেনস কাজ করার জন্য লযিসটিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।

** খধনড়ৎধঃড়ৎু ইধংবফ ঝঁৎাবরষষধহপব ড়হ অগজ ঢ়ধঃঃবৎহ: রহ ধপঃরড়হ ঁহফবৎ ঃযব ধমৎববসবহঃ ড়ভ এঐঝঅ, ঈউঈ, টঝঅ

সিডিসি/স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

* সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করে মানুষ, মাছ ও পশু পাখিতে এন্টিমাইক্রোবিয়াল সার্ভেইলেনস কার্যকরভাবে চালু করে তদনুযায়ী যৌক্তিকভাবে এন্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের সংস্কৃতি চর্চা করা।

* ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এন্টিমাইক্রোবিয়াল বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ।

* এন্টিমাইক্রোবিয়াল সার্ভেইলেনস কার্যকরভাবে চালু করে তদনুযায়ী যৌক্তিকভাবে এন্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের সংস্কৃতি চর্চা করা।

* জাতীয় পর্যায়ে রেফারেন্স ল্যাব ও উচ্চমানের গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং ল্যাব নেটওয়ার্ক গঠন করা।

* হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্রাধিকার দিয়ে নিশ্চিত করা।

* আইন ও বিধিবিধান প্রয়োগ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এন্টিমাইক্রোবিয়াল উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাত করার ব্যবস্থা গ্রহণ।

* তৃণমূল পর্যায়ে মেডিকেল প্রাকটিশনারদের এন্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ।

* ওষুধের দোকানদারদের সচেতন করে তাদের সহযোগিতা নেয়া।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারে মেডিকেল পেশায় নিয়োজিত সবাইকেই উপলব্ধির জায়গাটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে উন্নতি করে নিয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে হবে।

ডা. শ ম গোলাম কায়সার

ডিপিএম, এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কনটেইনমেন্ট, ভাইরাল হেপাটাইটিস ও ডায়রিয়া কন্ট্রোল প্রোগ্রাম রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর,

মহাখালী, ঢাকা।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj