কাপুরুষ নাকি মহাপুরুষ!

শনিবার, ১০ নভেম্বর ২০১৮

মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল : সত্যজিৎ রায়ের ১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মূল চলচ্চিত্রটির নাম ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’ যেটি পুরোপুরি দুটি ভিন্ন স্বাদের গল্পকে নিয়ে নির্মিত। ড্রামা জেনরের প্রথম গল্পটি কাপুরুষ এবং স্যাটায়ার কমেডি ধাঁচের দ্বিতীয় গল্পটি মহাপুরুষ।

কাপুরুষ

‘তোমার আসলে যেটার অভাব সেটা তো সময় না, অন্যকিছু!’ যৌবনে প্রেমিক অমিতাভ রয়কে তার প্রেমিকা করুণা এই লাইনটি বলে অমিতাভের জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছিল। সেই বয়সে অমিতাভের অভাব ছিল সাহসের, যার অভাবে তার জীবন থেকে করুণা হারিয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে আবারো অদৃষ্ট তাদের দুজনের দেখা করায় ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘জনৈক কাপুরুষের কাহিনী’ গল্প থেকে নির্মিত হয়েছে কাপুরুষ চলচ্চিত্রটি।

কলকাতার চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখক অমিতাভ রয় (সৌমিত্র চ্যাটার্জি) লেখার রসদ খুঁজতে ছোট এক শহরে এসে বিপদে পড়েন। তখন তাকে নিজ বাসায় আমন্ত্রণ জানায় সে অঞ্চলের চা বাগানের বড়কর্তা বিমল গুপ্ত (হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়)। সেই বাসায় গিয়ে অমিতাভের দেখা হয় বিমলের স্ত্রী করুণার (মাধবী মুখার্জী) সঙ্গে যে কিনা এককালে অমিতাভের প্রেমিকা ছিলেন। সুযোগের ছলে অমিতাভ করুণাকে বারবার জিজ্ঞাসা করে, তুমি এই বিয়ে করে সুখী তো! অরুণা ছলনার ভঙ্গিতে বিষয়টা প্রতিবার এড়িয়ে যায়। ফ্লাশব্যাকে জানা যায়, জটিল এক মুহ‚র্তে কেবলমাত্র সাহসের অভাবে করুণাকে বিয়ে করতে অসক্ষম হয় অমিভাভ। করুণা অমিতাভের বাড়িতে চলে আসার পরও অমিতাভ তাকে ফিরিয়ে দেয় কেবলমাত্র সাহসের অভাবে। তবে করুণাকে না পাওয়ার কষ্ট কুড়ে কুড়ে খায় অমিতাভকে, যার জন্য সে জীবনে বিয়েটাও করতে পারেনি। নিয়তি তাদের দুজনকে আবার এক করে দেয় ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। ছবির শেষে আমরা দেখতে পাই সাহসের অভাবী সেই কাপুরুষের একাকীত্বের হাহাকার। এই মানব মনের টানাপড়েনের গল্প নিয়ে নির্মিত কাপুরুষ।

‘কাপুরুষ’ চলচ্চিত্রটি পোশাক পরিচ্ছদের একটা দিক আলাদাভাবে না বললেই নয়। ছবির এক দৃশ্যে দেখা যায় মাধবী প্যাশেন্স খেলছেন, তার পরনে সফট সিল্কের শাড়ি ও পাথরের গয়না। মাধবীকে ছাপা সিল্কের শাড়িও পরতে দেখা যায় অন্য এক দৃশ্যে। এমন পোশাক তখনকার দিনে বিরল, আর ছাপা সিল্কের শাড়ির ফ্যাশনও তখন নতুন চল হিসেবে শুরু হয়েছে। সেই দিক দিয়ে কাপুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদ কতটা ট্রেন্ডসেটার। ছবিটির আরেক বিশেষ দিক কেবলমাত্র তিনজন অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়েই ছবিটির সফল সমাপ্তি।

মহাপুরুষ

আপনি কি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে নিজের দুই হাতের আঙুকে ঘোরাতে, কিংবা ওঠ, ওঠ বলে ভোরবেলা সূর্যকে জাগিয়ে তুলতে পারবেন? বিরিঞ্চিবাবা এ জিনিস অনায়াসে করতে পারেন! মহাপুরুষ চলচ্চিত্রের গল্পটি নেয়া হয়েছে লেখক রাজশেখর বসুর (পরশুরাম) ছোটগল্প বিরিঞ্চিবাবা অবলম্বনে।

ধর্ম নিয়ে ব্যবসা চলে আসছে সেই যুগ যুগ ধরে। ধর্মের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে এক বাবার প্রতারণা ও মানুষ ঠকানোর গল্পকে সেলুলয়েডে নথিভুক্ত করেছেন সত্যজিৎ রায়। ছবির গল্পে দেখা যায় স্ত্রীকে হারিয়ে কতটা বৈরাগ্যই পেয়ে বসে খ্যাতি-যশপ্রাপ্ত উকিল গুরুপদ মিত্রকে। ট্রেনে যাত্রাপথে তার দেখা মেলে বিরিঞ্চিবাবা নামের এক সাধুর। বিরিঞ্চিবাবার বয়স কত তা যেন কেউ জানে না। কথিত অমর এই বিরিঞ্চিবাবাই ঊ=সপ২ সূত্রটা খোদ আইনস্টাইনের মাথায় ঢুকিয়েছিলেন! এ ছাড়াও তিনি সংকেতে কথা বলতেন প্লেটোর সঙ্গে! গৌতম বুদ্ধ আর যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে নাকি একাধিকবার লিপ্ত হয়েছিলেন বিতর্কে। গুরুপদবাবুর ভক্তির জোরে বিরিঞ্চিবাবুকে ঠাঁই দেন তার কলকাতার বাসায়। কলকাতা শহরে তাই ক্রমাগত বাড়তে থাকে এই বাবার ভক্তসংখ্যা।

গুরুপদবাবুর মেয়ে বুঁচকির পাণিপ্রার্থী সত্য আর তার মেস-মালিক নিবারণ চেষ্টা করতে থাকে ভণ্ড বিরিঞ্চিবাবা ও তার শিষ্য কেবলরামের মুখোশ খুলে তাদের বাড়ি থেকে তাড়ানোর। এ কাজে তাদের সঙ্গে হাত লাগায় মেসের কিছু বোর্ডার ও গুরুপদ বাবুর বাড়ির চাকররা। আগুন লাগার ছুতো দেখিয়ে বিরিঞ্চি ও কেবলরামের ঠগবাজিকে হাতেনাতে ধরে ফেলা হয়। ছবিতে বিরিঞ্চিবাবা চরিত্রে চারুপ্রকাশ ঘোষ, কেবলরাম চরিত্রে রবি ঘোষ ছাড়াও আরো অভিনয় করেছেন সন্তোষ দত্তও ছিলেন প্রফেসর ননী নামের এক মজার চরিত্রে। পরশুরামের গল্পের রম্যরস, সত্যজিৎ রায়ের নির্মাণে মুন্সিয়ানা, অভিনেতাদের দুর্দান্ত অভিনয়ে ৬৫ মিনিটের মন ভালো করার মতো একটি ছবি এই মহাপুরুষ।

সত্যজিৎ রায়ের এই কাপুরুষ ও মহাপুরুষ নামটিই এদিক-ওদিক করে দিয়ে মহাপুরুষ ও কাপুরুষ নামে ২০১৩ সালে একটি ছবি মুক্তি দেন অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। তবে নামে ওলট-পালট থাকলেও অনিকেতের গল্প ছিল অবশ্য আলাদা।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj