বেঁটে মানুষটার স্বপ্ন

শনিবার, ২৭ অক্টোবর ২০১৮

শামীম খান যুবরাজ

ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে জোড়ার জড়তা কাটাতে ডান হাতটি সামনের দিকে ঝাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটি ঘটে গেল। হাতটি চোখের পলকেই ঝাড় থেকে নুয়ে পড়া বাঁশের মতোই লম্বা হয়ে গেল। তারপর বাম হাত ঝাড়ল লোকটি।

বাম হাতেরও একই অবস্থা। ওটাও ঝাড়ের নুয়ে পড়া বাঁশ। মুহূর্তেই ফুলশার্ট হাফশার্ট হয়ে গেল। হাত দুটো কোনো রকম সোজা রেখেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। ডান পা নেড়ে দেখল ভয়ে ভয়ে। ওটা সদ্য গজিয়ে ওঠা বাঁশের মতো হয়ে গেল। লোকটির মাথা গিয়ে ঠেকল ঘরের সিলিংয়ে। এক পায়ে মাথা নুয়ে কোনোরকম দরজা দিয়ে বের হলো সে। বাম পা নেড়ে ওটাকেও বাঁশের মতো লম্বা করে নিল। এবার ফুলপ্যান্ট হাফপ্যান্ট হয়ে গেল।

এ অবস্থায় বাড়ির উঠোনে হাঁটতে লাগল সে। যত কদম দেয় ততই লম্বা হতে থাকে তার হাত-পা। আশ্চর্য! এমনটি কারো বেলায় ঘটেছে বলে বাপ-দাদার আমলের কেউ গালগল্পেও বলে যায়নি। তাহলে তার এমন দশা হলো কী করে?

আরে দূর যা, দশা বলছি কেনো! ভালোই তো লাগছে। এতদিন বেঁটে বলে সবাই ‘বাঁইট্টাইয়া’ ‘বাঁইট্টাইয়া’ বলে ক্ষেপাত। এবার দেখে যাও, যত্ত সব লম্বুর দল।

নিজে নিজে কথাগুলো বলতে বলতে ঘরের কাছাকাছি যেতেই ঘর তার কোমর অবধি নিচে চলে গেল। ঘরের পেছনের কড়ই গাছের ডালে শালিকের বাসা। খড়গুলো ঝুলছে। লোকটি কাছে গিয়ে বাসায় উঁকি দিতেই মুখ হা করে ‘চিঁই’ ‘চিঁই’ স্বরে ডেকে উঠল দুটি শালিক ছানা। ছানাগুলো হাতে নিয়ে বেশ আদর জমে গেল তার মনে। চুমু খেতে মন চাইল।

পাখির ছানাকে চুমু খাওয়ার কথা মনে আসতেই নিজে নিজে একগাল হেসে নিল সে। তারপর সত্যি সত্যি চুমো খেতে মুখটা বাড়াল। আর যায় কোথায়! সূঁচালু লম্বা নাকের ডগায় কামড় বসিয়ে দিল ছানাগুলো। কোনোরকম ছাড়া পেয়ে ছানা দুটোকে বাসায় রেখে হাঁটতে শুরু করল সে। কয়েক কদম এগুতেই জহিরের সঙ্গে দেখা। জহির আশ্চর্য হয়ে ফ্যালফ্যাল করে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। লোকটি বাঁশের মতো আঙুল দিয়ে জহিরের মাথায় টোকা দিয়ে ভেংচি কেটে বলল, বেশ তো ‘বাঁইট্টাইয়া’ ‘বাঁইট্টাইয়া’ বলে ব্যঙ্গ করতি, এখন দেখছি তুই পিঁপড়ের মতো হয়ে গেছিস।

জহির অপলক তাকিয়ে থাকল লোকটির দিকে। তাকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই হাঁটতে শুরু করল লোকটি। যতই হাঁটছে ততই বাড়ছে সে। তবে একটা জিনিস লক্ষ করল সে, যতটুকু সে লম্বায় বাড়ছে শরীর ততটা বাড়ছে না। টিঙটিঙে লম্বা হয়ে যাচ্ছে সে।

হাঁটতে ভালোই লাগছে তার। বাড়িঘর, গাছগাছালি সব তার কোমরের নিচে পড়ে আছে। মানুষগুলোকে এখন আর দেখাই যাচ্ছে না।

মনে মনে স্বস্তি পেল সে। যাক, ঘুম থেকে উঠে ‘বাঁইট্টাইয়া’ ‘বাঁইট্টাইয়া’ ডাক শুনতে আর ভালো লাগে না। এবার এমন বিরক্তিকর ঝামেলা থেকে মুক্তি পেলাম।

মাঠগুলোকে রঙতুলিতে আঁকা ছবির মতোই মনে হচ্ছে। একটু পর কিসের যেন একটা শব্দ পেয়ে পেছনে তাকালো লোকটি। ডানা দুটো ছড়িয়ে একটি চিল উড়ছে। সে ইচ্ছে করলেই হাত দিয়ে ধরতে পারে চিলটিকে। আবার ভাবল থাক, ও ওর মতোই থাক। আমি বরং একটু হেঁটে বেড়াই।

হাঁটতেই থাকল লোকটি। এখন নিচের দিকে তাকালে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। কোনোরকম আন্দাজ করে লম্বা বাঁশের খুঁটির মতো পা দুটো চালিয়ে যাচ্ছে সে। হঠাৎ শীতল বাতাস এসে মাথার চুলে ঢেউ দিয়ে গেল। বাহ! বেশ আরাম লাগছে তো। ঠাণ্ডা বাতাসের নরম ছোঁয়া পেতে লোকটি চোখ বন্ধ করে নিল। ওহ কি আরাম।

কিসের সঙ্গে যেন হঠাৎ ধাক্কা লেগে চোখ খুলল সে। আরে এ যে সাদা মেঘের সারি!

চারপাশে পেঁজা তুলোর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকটি হাত দিয়ে ধরে দেখল। কি নরম আর তুলতুলে! ইচ্ছে করলেই মেঘগুলোকে হাত দিয়ে যেখানে ইচ্ছে সরিয়ে দিতে পারে সে। তবে এখন তার সেসবের ইচ্ছে নেই। তার গলা শুকিয়ে গেছে। পানি পান করা দরকার। আরে, মেঘের রাজ্যে এসে পানির তালাশ!

আপন মনে হাসল সে।

মেঘের টুকরোগুলোকে মনে হচ্ছে একেকটা আইসক্রিম। উপরে চকোলেটের প্রলেপ দিতে পারলেই চকবার আইসক্রিম হয়ে যেত।

থাক, চকবারের চিন্তা করে লাভ নেই। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে।

এক টুকরো মেঘ হাতে নিল সে। মুখে পুরে নিয়ে কামড় বসাতেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হলো।

ঘুম ভেঙে গেল লোকটির। জেগে দেখে নিজের বিছানায় ভাইয়ের পাশে শুয়ে আছে সে। মুখের ভেতর বালিশের শিমুল তুলা। ছেঁড়া বালিশের তুলায় ভরে গেছে পুরো বিছানা। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে লোকটির ছোটভাই।

ভাইয়ের চোখে চোখ পড়তেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল সে। আড়মোড়া ভেঙে হাত নেড়ে দেখল একবার। আপন মনে হাসল।

ঘর থেকে বের হতেই জহিরের সঙ্গে দেখা। লোকটিকে দেখেই জহির হেঁকে উঠল, কেমন আছিসরে বাঁইট্টাইয়া।

লোকটি জহিরের কথায় কান না দিয়ে হাতমুখ ধোয়ার জন্য নেমে পড়ল পুকুরঘাটে। একদলা বাসি থুথু পানিতে ছেড়ে দিয়ে কুলি করে নিল।

কুলির পানি ফোয়ারার মতো চারদিকে ছিটিয়ে দিয়ে বলে উঠল, আল্লাহ, পরজনমে আজকের এই স্বপ্নটারে তুমি সাচ্চা বানাইয়া দিও। আর যারা আমারে বাঁইট্টাইয়া কয় তাগোরেও আমার মতো লম্বা কইরা বানাইয়ো। যাতে কেউ তাগোরে কষ্ট না দেয়। হাতমুখ ধুয়ে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে ঘাটলার ওপর দাঁড়ায় লোকটি। কি জানি ভেবে ডান হাতটাকে সামনের দিকে ঝেড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল হাতের দিকে। তারপর আপনমনে হাসতে হাসতে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

:: মীরসরাই, চট্টগ্রাম

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj