বর্ষা…

শনিবার, ২৭ অক্টোবর ২০১৮

হাসান সাইদুল

আকাশটা আগের মতো মেঘাচ্ছন্ন দেখায় না। ঝিরঝির বৃষ্টি কিংবা মেঘের গর্জন আর আগের মতো দেখা যায় না। বর্তমান বর্ষার প্রকৃতি এমনই বোধ হয়। বিগত বর্ষার মৌসুমে এমনই হয়ে আসছে। আবার অনেক সময় অন্য মাসেও ঝড়বৃষ্টি হয়ে থাকে। মোটামুটি উল্টো রথে চলছে যেন সব। এ শুধু প্রকৃতির ছায়ায় বেঁচে থাকা মানুষগুলোর দায়েই। নিজেদের ভুল আর কুসংস্কার প্রথা নতুন নতুন প্রথা জারি করার মাঝেও আচমকা অঘটন ঘটে যায়।

রাকিবও ওইদিন বড় একটা ভুল করে ফেলেছিল বটে। আসলে ভুল না। তার মোবাইলেই নম্বরটা ছিল। আচমকা ফোন দিয়ে দিল। ও প্রান্ত থেকে মিষ্টি স্বরে শুধু হ্যালোই বললেন। বাকি কথাগুলো বর্ষার বিপরীত ঋতুর মতো।

রাকিব শুধু নামটাই জানতে পারল। ভালোই হলো। ও প্রান্তের মেয়েটির নাম বর্ষা। কিন্তু মোবাইলে কথা বলে বুঝা যাচ্ছে তার হৃদয়ে গ্রীষ্মের প্রখর খরা বিরাজ করছে।

শীতে বরফের কুণ্ডলি থাকলে হয়তো ভালোবাসা দিয়ে গলানো যেত কিন্তু প্রখর খরা কিভাবে ঠাণ্ডা করতে হবে রাকিব বুঝে না। একদিন দু’দিন তিন দিন ফোন দেয়। বর্ষা বিরক্ত হয়। গালমন্দ না করলেও ঝাড়ি দেয়।

– আচ্ছা আপনার কি লজ্জা হয় না আমি এত কথা বলি তারপরও ফোন দেন?

– লজ্জা করে কিন্তু কিচ্ছু করার নাই।

– কিচ্ছু করার নাই মানে? আপনি ফোন দেন কেন?

– ভালো লাগে তাই।

– কি ভালো লাগে? আমি তো আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি। ঝাড়ি দেই!

– হ্যাঁ দেন তো। ওটাও ভালো লাগে। কারণ যাকে ভালো লাগে তার সবই ভালো লাগে।

– আজব তো। যাকে দেখেননি জানেননি তাকে ভালো লাগার কি আছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

– বুঝার দরকার নেই। আপনার খারাপ ব্যবহারটা চালিয়ে যাবেন আর আমি ফোন দিতে থাকব। ব্যস আর কিছু না। ভালো থাকবেন।

বলেই রাকিব ফোন রেখে দিল। ওই প্রান্ত থেকে বর্ষা কয়েক বার হ্যালো! হ্যালো বলছিল। পরে কয়েকবার ফোন দিল বাট রাকিব ফোন তোলেনি। তাও ইচ্ছা করে।

হঠাৎ কেমন একটা অনুভূতি কাজ করছে বর্ষার হৃদয়ে। মনে হয় বেশি বকাঝকা করে ফেলেছে রাকিবের ওপর। একটা ছেলে আমাকে না দেখে কতো কাকুতি করছে কিন্তু আমি খারাপ ব্যবহার করছি কেন।

সে কি বলতে চায় তাও তো শুনছি না। আমিও যে তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি। তার প্রতিদিনের ফোন করাটা খুব ভালো লাগছে। ছেলেটা কি আমার প্রেমে পড়েছে? কিন্তু দু’দিন হলো ফোন দিচ্ছি সে তুলছে না কেন? কোনো অসুখ-বিসুখ হলো না তো!

নাকি আর ফোন দেবে না আমাকে সে? বর্ষার তিক্ত গর্জন আজ প্রেমের প্রবাহে পরিণত হয়েছে। রাকিবের ফোন নম্বরটা দেখছে মোবাইলে। নিজের মনেই ভাবছে বর্ষা, সে কি আমার সঙ্গে দেখা করবে? আমাকে দেখলে যদি সে পছন্দ না করে? যদি আমাকে ভুলে যায়!

হঠাৎই রাকিবের ফোন। দেরি না করে বর্ষা ফোন তোলে।

– কি? কি ভাবছিলে?

– কই না তো কিছুই ভাবছিলাম না। আগে বলো দুদিন ফোন ধরছিলে না কেন?

– আমি ফোন দিলে তো তুমি বিরক্ত হও। যাকে মন থেকে ভালোবাসি সে যেন বিরক্ত না হয় সে জন্য ফোন দেই না। বা ফোন তুলিও না।

– এই কথা? আমি সব সময় খারাপ ব্যবহার করব এটা তুমি বুঝলে কি করে?

– হ্যাঁ তাই তো আমি বুঝব কি করে? এখন বুঝিয়ে দাও?

– তুমি আজ আমার সঙ্গে দেখা করো।

রাকিব একটু অবাক হয়। যে মেয়ে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করত একদিন ফোন তুলিনি বলে আজ দেখাও করতে চায়। মনে হয় প্রেমে পড়েছে। কাজ হয়েছে।

– আচ্ছা দেখা করে তো কথাই বলবে তাই না? এখন বলো কি বলতে চাও।

– শুধু কথা বলব না তোমাকে দেখব।

– ও তাই? তারপর কি করবে?

– তারপর কি করব সেটা পরে শুনো। তুমি বিকেলে শাহাজাদপুর এসো আমি ওখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।

ঠিক সময় রাকিব নির্দিষ্টস্থানে গিয়ে হাজির। বর্ষা লাল রঙের শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে হাতে লম্বা একটা মোবাইল। পাশে ব্যাগ। তুমি বর্ষা। মুচকি হেসে উত্তর দেয়, তুমি তো রাকিব।

অনেক দিন কথার পর দেখা তোমার কেমন লাগছে?

আমার যা লাগছে তা বলা যাবে না।

বলো না রাকিব। বলো লক্ষী, বলেই বাম হাত ধরে বর্ষা। আলাদা একটা অনুভূতি রাকিবের শরীরে প্রবেশ করে। সত্যি সত্যিই যেন বর্ষা রাকিবের প্রেমে পড়েছে। রাকিবের বিশ্বাস হচ্ছে না।

বর্ষা তুমি কি সত্যিই আমার হাত ধরেছো? বর্ষা আরেকটু শক্ত করে ধরে। হ্যাঁ ধরছি তো তোমার বিশ্বাস হয় না। হ্যাঁ হয় হয়। জি হয়েছে। এখন কি করবে?

– কি করব তোমাকে নিয়ে একটু হাঁটব তারপর বাসায় চলে যাব।

– ও আচ্ছা।

– লক্ষী সোনা প্রথম প্রথম তোমার সঙ্গে যে খারাপ ব্যবহার করেছি তা কিন্তু তুমি মনে রেখো না।

– তাই নাকি। কেন মনে রাখব না?

– আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমার সঙ্গে বাকি জীবন থাকতে চাই।

– এই কথা। দু’এক মাস কথা আজ দেখা হতেই এতটুকু। আমিই বুঝি তোমার জীবনে প্রথম?

– এমন প্রশ্ন করছো কেন?

– তোমার সঙ্গে হেসে-খেলে কথা বলেছি তাই দেখা করতে চেয়েছো। আজ আমাকে ভালোবাসার কথাটা বলেছো। কাল বা পরশু তোমাকে যখন অন্য কেউ আমার মতো করে পটাতে চাইবে তখন কি করবে…!

রাকিবের কথা শুনো বর্ষার কপাল কুঁচকে তাকায়। একটু অন্যমনস্ক হয়। নিচুস্বরে রাকিবকে বলে ওঠে, অন্য কেউ আমাকে পটাবে কেন? আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। অন্য কেউ এখানে আসার কথা আসবে কেন?

– আমি যেভাবে এসেছি।

– না অন্য কেউ আসার সুযোগ নেই।

– আমি তোমাকে বিশ্বাস করব কিভাবে?

কিভাবে বিশ্বাস করাব তোমাকে! বলেই কান্নামুখো হয়ে যায় বর্ষা। চোখেও বর্ষার ঢেউ। রাকিব বুঝতে পারে বর্ষার ভালোবাসাটা সত্যই সন্দেহহীন। আসলে কে কখন কার প্রেমে পড়ে যায় বলা যায় না।

কলম রাখার মতো পকেটের মতো শ্রেষ্ঠ কলমদানি আর নেই। ঘুমের চেয়ে বড় ওষুধ নেই আর মন রাখার মেয়েদের মতো শ্রেষ্ঠ পাত্র আর নেই। রাকিব বোধ করে। তবুও একটু বাজিয়ে দেখে বর্ষাকে সে।

আজ আমাদের প্রথম দেখা আরো কয়েকদিন সপ্তাহ মাস যাক। আমাকে বুঝার চেষ্টা কর তারপর কান্না কর। এখন কান্না করলে পরে যখন তোমাকে মারব তখন কে কান্না করবে?

মানে?

মানে বুঝো না। আমাকে খুব বেশি বেশি ভালোবাসবে। আর যদি এত উল্টোপাল্টা করছো তাতো বুঝবেই আমি কি করি তখন বর্ষার ঢেউ আর তোমার চোখের জলে কোনো কাজ হবে না। এরই মাঝে বৃর্ষ্টি শুরু হলো।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি বর্ষার গায়ে এসে পড়ে। এলো চুল নিমিষে আঁকড়ে ধরে বর্ষার পিঠ। দু’চার ফোঁটা বৃষ্টি বর্ষার গাল বেয়ে পড়ছে রাকিব খুব ভালো লাগে।

কি বৃষ্টিতে ভিজব না বাসায় যাব? বর্ষা বলে ওঠে। পরে হাত ধরে দুজন হাঁটতে থাকে।

::গুলশান, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj