দহনকাল >> শুধু উপন্যাস নয় ঐতিহাসিক দলিলও : বরুনকুমার চক্রবর্তী

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

গল্পলেখা সম্ভব হলেও উপন্যাস রচনায়, বিশেষত যদি তার সংখ্যাধিক্য তেমন রোমহর্ষক পর্যায়ে না পৌঁছায়, উপন্যাসিক উপন্যাস রচনায় প্রথম পর্যায়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজেকে বাদ দিতে পারেন না। অর্থাৎ কম-বেশি তা আত্মজৈবনিক হয়ে ওঠে। উপন্যাসিক যে আখ্যান বয়ান করেন তা উপজীব্য হয়ে ওঠে তাঁরই অভিজ্ঞতায়। এই অভিজ্ঞতার দুটি স্পষ্ট স্তর বিন্যাস- প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ। পরোক্ষ অভিজ্ঞতার তুলনায় নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে যে আখ্যানের বয়ান তাতে জোর বেশি। এক ধরনের ইনভলভমেন্ট কাজ করে বলেই এমনটা ঘটে। নদীকে আশ্রয় করে বাংলায় কম উপন্যাস রচিত হয়নি। সমরেশ বসু’র ‘গঙ্গা’ কিংবা তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ এই প্রসঙ্গে সহজেই পাঠকের মনে আসবে। কিন্তু এঁরা কেউই নিজের বিষয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন না। যেমন ছিলেন না মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মানদীর মাঝি’র ক্ষেত্রে। বিষয়ের সঙ্গে লেখকের কদাচিৎ প্রত্যক্ষ সংযুক্তি ঘটে। যেমন ঘটেছে ‘তিতাস একটি নদীর নামে’-এ অদ্বৈত মল্লবর্মনের ক্ষেত্রে। অদ্বৈত নিজে ছিলেন মালো। তেমনটিই ঘটেছে হরিশংকর জলদাসের ক্ষেত্রে ‘দহনকাল’-এ (২০১০)। অন্যান্য জলকেন্দ্রিক উপন্যাসে কখনো শোষণের চিত্রকে পরিস্ফুট করা হয়েছে, কখনো বা বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষের সামগ্রিক জীবন কাহিনীকে বিশ্বস্তভাবে রূপায়িত করা হয়েছে। আবার কোনো উপন্যাসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পরস্পরার সঙ্গে নবযুগের জীবনযাত্রার সংঘর্ষকে মূর্ত করে তোলা হয়েছে। ‘দহনকাল’ সেদিক থেকে বহুমাত্রিক উপন্যাস। প্রথমত তা আত্মজৈবনিক। লেখকের পদবিতেই তা স্বতঃই প্রমাণিত। কিন্তু গোষ্ঠীভুক্ত হওয়া আর গোষ্ঠীর অন্যদের মতোই জীবনসংগ্রামে ব্রতী হওয়া এক নয়। লেখক নিজে শুধু মৎস্যজীবীদের স¤প্রদায়ভুক্ত নন, তাঁর জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ অতিবাহিত হয়েছে মৎস্যজীবীদের সঙ্গে। জীবন বাজি রেখে বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে লেগেছেন সংসার প্রতিপালনের তাগিদে। উপন্যাসের নায়ক হরিদাস লেখক স্বয়ং। ব্যক্তিজীবনে লেখক যেমন তাঁর স্বল্পশিক্ষিত পিতৃদেব ও পিতামহী পরাণেশ্বরীর ঐকান্তিক আতিশয্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেউড়ি অতিক্রমণে সাফল্যের নজির রেখেছেন, উপন্যাসেও দেখি রাধানাথের ঐকান্তিক আগ্রহে এবং রাধানাথ- জননী চন্দ্রকলার সক্রিয় সহযোগিতায় হরিদাস কৃতিত্বের সঙ্গে স্কুলের গণ্ডি পার হয়, স্বপ্ন দেখে কলেজে পড়ার।

আঞ্চলিক উপন্যাস হিসাবেও দহনকালের যোগ্যতা ও রসোত্তীর্ণতা প্রশ্নাতীত। চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গার সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের যে জীবনালেখ্য রচনা করেছেন লেখক তাতে এদের সামগ্রিক জীবন কথা রূপায়িত হয়েছে বিশ্বস্তভাবে। কঠিন জীবনসংগ্রামে যুক্ত থেকেও হতভাগ্য মৎস্যজীবীদের বহুলাংশে যে দারিদ্র্য মুক্ত হতে পারে না সে জন্য দায়ী অন্য কেউ নয় মুষ্টিমেয় লোভী স্বার্থপর জলদাসই। এদের শোষণচিত্র বিশ্বস্তভাবে চিত্রিত হয়েছে এবং এক ধরনের প্রতিবাদও সোচ্চারিত হয়েছে প্রকারান্তরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসবকে অতিক্রম করে গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জ্বলন্ত বিভীষিকাময় বিবরণ। ঐতিহাসিক দলিলের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়েছে ‘দহনকাল’।

উপন্যাসের শুরু এইভাবে-

‘ওই চলেছে রাধানাথ জলদাস, হন হন করে। তার ডান হাতে সাত বছরের ছেলেটি ধরা হরিদাস’।

এরপর পাই আদাবস্যারের অর্থাৎ চিত্তরঞ্জন দে’র উঠান স্কুলের বিবরণ। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার জীবন গ্রামে প্রায় তিন পুরুষের শিক্ষক। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ নির্বিশেষে সকলের শিক্ষক তিনি। হরিদাসের জীবনে আদাবস্যারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আদাবস্যারের স্নেহভাজন হরিদাস। রাধানাথ নিজে মৎস্যজীবী, স্ত্রী বসুমতীকে সে তার মনোবাসনার কথা জানিয়েছে এই বলে ‘হরিদাসেরে আঁই পড়াইয়ম। মাছ মারাইন্যা জাইল্যা হইতাম দিতাম নো। পড়ালেখা শিখইন্যা জাইল্যা বানাইয়ম।’ বসুমতীও স্বামীর প্রস্তাবে সায় দিয়েছিল, আঁরার উগগা পোয়ারে অন্তত আঁরা শিক্ষিত গইয্যাম।’ লেখক প্রেক্ষিতটি বর্ণনা করেছেন :

এই মেছোপাড়ায় হরিদাসের বয়সী অনেক ছেলে আছে। কেউ বাপকে মাছ বাছাবাছিতে সাহায্য করে, কেউ মাছ ধরার উপকরণ বাপকে, বড় ভাইকে, বোনাইকে সমুদ্রপাড়ে পৌঁছে দেয়, আবার কেউ কেউ সকাল সন্ধ্যা এধার ওধার ঘুরে বেড়ায়। অর্থাৎ উপন্যাসে হরিদাসকে ব্যতিক্রমী ভূমিকায় দেখা গেল। হরিদাস পতংগা বোর্ড প্রাথমিক স্কুলে পড়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে সে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ক্রমে সে অষ্টম শ্রেণিতে ওঠে। বার্ষিক পরীক্ষায় সে প্রথম হয়। পতংগা হাইস্কুলের শিক্ষক শ্যামল সরকারের কাছে সে প্রাইভেট পড়ল ইংরেজি ও অঙ্ক। প্রতি সন্ধ্যায় দেড় মাইল মেঠো পথ অতিক্রম করে হরিদাস শ্যামল সরকারের বাড়ি যায়। ঠাকুমা চন্দ্রকলা দাসী ছুটির একটু আগে গিয়ে অপেক্ষা করে। ছুটির পর ঠাকুমা নাতিকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। হরিদাস এসএসসি পরীক্ষা দেয়। রেজাল্টের জন্য অপেক্ষারত সে। ভূপালের মুখে চট্টগ্রাম কলেজের গল্প শোনে, এখানকার শিক্ষকদের পাণ্ডিত্যের কথা শুনে তার চোখের সামনে যেন স্বপ্ন জগতের দরজা উন্মুক্ত হয়। সে অপেক্ষা করতে থাকে চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার জন্য। কিন্তু উপন্যাসের আখ্যান অন্যদিকে বাঁক নেয়ায় হরিদাসের স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয় না। সে অশক্ত পিতাকে অব্যাহতি দিয়ে সংসারের স্বার্থে রোজগারে নামে। জড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে।

হরিদাসের পিতা রাধানাথ সম্পর্কে জানতে পারি, হঠাৎ তার মাথায় ভূত চাপে লেখাপড়া করবে সে।

যশোদার বাপ যতীন্দ্রমোহন জলদাসের কাছে হাজির হয় লেখাপড়া করার জন্য। অ-আ শতকিয়া এমনকি অনপফ সে অধ্যয়ন করে। হঠাৎ করে শুরু করার মতো হঠাৎ করেই সে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। মাতৃভক্ত রাধানাথ চন্দ্রকলার সঙ্গী হয়ে ওঠে মাছ কেনাবেচা সবেতে।

অতএব রবিশংকর জলদাসের ব্যক্তিজীবনের অনেকখানি প্রতিফলন অন্তত তার শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে যে ঘটেছে তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। স্বল্প শিক্ষিত পিতাই রবিশংকরের মনে পড়াশুনার আগুনটি জাগিয়ে রেখেছিল আর পিতামহী পরাণেশ্বরীর সঞ্জীবনী শক্তির গুণেই রবিশংকরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে তার মাতার প্রভাব অনুল্লিখিত। উপন্যাসে দেখি হরিদাস কেবল এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সেখানে কিন্তু ঠাকুমার সঙ্গে তার মায়েরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন দেখি।

আঞ্চলিক উপন্যাস হিসাবে ‘দহনকাল’ কতখানি সার্থক এখন সে আলোচনায় আসা যাক। আঞ্চলিক উপন্যাস মানে নিছক বিশেষ এক ভৌগোলিক পরিবেশকে উপজীব্য করে রচিত উপন্যাস নয়। উপন্যাস সর্বোপরি মানবজীবন গাথা। মানুষের যেমন আছে খণ্ডিতরূপ তেমনি আছে তার আন্তর্জাতিক রূপও। মানুষ একদিকে বিশেষরূপের অধিকারী, অন্যদিকে আছে তার দেশকালোত্তীর্ণ রূপও। অবশ্যই আঞ্চলিক উপন্যাসে প্রাধান্য পায় মানুষের বিশেষ রূপটি। অর্থাৎ অঞ্চল বিশেষের প্রকৃতি এবং তার প্রভাব জাত মানুষ এই দুইকেই উপজীব্য করা চাই আঞ্চলিক উপন্যাসে। অঞ্চল বিশেষের মানুষের ভৌগোলিক সত্তাটিকে পরিস্ফুট করা চাই। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি ‘দহনকাল’ চট্টগ্রামের উত্তর পতেংগার জীবন আলেখ্য। এতদঞ্চলের জেলেরা হলো উপন্যাসের কুশীলব যারা জীবিকার তাগিদে সমুদ্রে যায় গৃহত্যাগ করে এবং দীর্ঘদিন, কয়েক মাস পর্যন্ত সমুদ্র মধ্যে অতিবাহিত করে। উপন্যাসে মূলত জলদাসেদের জীবন ও জীবিকাই মূর্ত হয়েছে। তাদের জীবন সংগ্রাম, তাদের জীবন চর্যা, বিশ্বস্তভাবে উপন্যাসে চিত্রিত। এমনকি কি কি ধরনের নৌকা তারা ব্যবহার করে, কি কি জাল ব্যবহারে অভ্যস্ত, কি কি মাছ জালে ওঠে, সমুদ্রগামী নৌকার পরিচর্যা, এই নৌকা ও জালের অধিকারের প্রেক্ষিতে জলদাসেদের মধ্যে শ্রেণি বিভাজন, শোষণ পীড়ন, তাদের জীবনছন্দ, ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষা অনুসৃত বিশ্বাস সংস্কার, উপাদান নির্ভর লোক সংস্কৃতির ব্যবহার সবই মজুত।

যে অঞ্চলটি উপন্যাসের পটভূমি সেই উত্তর পতেঙ্গা গ্রামটির পাই উপন্যাসে এভাবে- ‘গ্রামটির পূর্ব ও দক্ষিণ পাশটি কর্ণফুলী নদীর বেড়ে ঘেরা। পশ্চিমে উত্তাল বঙ্গে উপসাগর/উত্তরে হালিশহর গাঁ। উত্তর পতেঙ্গা গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেঠোপথ উত্তর থেকে দক্ষিণে কর্ণফুলীর মোহনা পর্যন্ত। রাস্তার পশ্চিমে সাগরের ঢেউ খেলানো বালিয়াড়িকে স্পর্শ করে গড়ে উঠেছে মেছো পাড়াটি যার বয়সকাল হবে দেড়শতাদিক। মেছেপাড়ার তিন দিকে মাঠ। সমুদ্রের নোনা জলের কারণে এসব মাঠে ফসল ফলে না, উর্বরতা শক্তি নিঃশেষিত।

জেলেদের একমাত্র জীবিকা মাছ ধরা তাও শান্ত পুকুর কিংবা কোনো জলাশয় অথবা খাল বিলে নয়। জীবন বিপন্ন করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা। অনিশ্চয়তাকে পাথেয় করে মৃত্যুর হাতছানিকে উপেক্ষা করে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। তাও কল্পনাতীত পরিশ্রমের উপযুক্ত পারিশ্রমিক মেলে না। প্রতি পদে পদে বঞ্চনা আর প্রতারণা। জেলেদের শিক্ষানবিসীর বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। রাধানাথকে দীর্ঘদিন বহদ্দারের নৌকায় গাউর খাটতে হয়েছে। গালিগালাজ সহ্য করতে হয়েছে। শুধু কি তাই ঠাণ্ডা পোড়া বাসি ভাত তরকারি খেয়ে কাটাতে হয়েছে কয়েকটি বছর। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর তবে যে রমনীমোহন বহদ্দারের নৌকায় জাল বসাবার অনুমতি পেয়েছে। শর্ত- জোয়ারের সময় প্রথমে তার জাল থেকে মাছ তোলা হবে তারপর সময় পেলে রাধানাথের জাল থেকে ধরা হবে মাছ। রাধানাথের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ এই অনৈতিক শর্ত মেনে নিতে হয়েছে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানতে বাধ্য হয়েছে সে। জেলেদের অলিখিত নিয়ম- বহদ্দারের একটি জালের মাছ তোলার পর পাউন্যা নাইয়ার জাল থেকে মাছ তুলতে হবে। পরে মাছ তোলা হবে বহদ্দারের অন্য দুটি বিহিন্দি জাল থেকে। আরও নিয়ম, বহদ্দার বসাবে তিনটি ও পাউন্যা নাইয়া বসাবে একটিমাত্র বিহিন্দি জাল।

মৎস্যজীবীদের ক্লেশকর জীবনের কথা সারাটা উপন্যাসে পাই। যে নৌকায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হয় তাকে বলা হয় জোয়া। এ নৌকার খোলে বারোজন গাউরের থাকার জায়গা, চৌদ্দজন মানুষের তিন মাসের জন্য খাদ্য পানীয় জল মেলে না তাই সমুদ্রগামী মৎস্যশিকারির কাছে পানীয় জল খুবই মহার্ঘ। হিসাব করে পান করতে হয়। কেননা জল নিঃশেষিত হলে স্থলভাগ থেকে তা আনার উপায় নেই। নৌকার থাকে চাল ডালের বস্তা, বস্তা বস্তা আলু, সবজি আর কাঠ। প্রথম দিকে কিছু সবজি রান্না হয়। পরে সে সব মেলে না। কেননা সবজির অধিকাংশই পচনশীল। কিছুদিন পর ওই সব সবজি খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। কমপক্ষে মাস তিনেক জেলেদের সমুদ্রে অতিবাহিত করতে হয়। নৌকায় একজন থাকে বড় মাঝি। সেই নৌকা চাল না করে। এরপরের জন ছোট মাঝি। তা ছাড়া থাকে বারোজন গাউর। এরা সাধারণ। এদের বেতনও আহামরি কিছু নয়। তিন মাসে কারো সাতকুড়ি’ কারো নয়কুড়ি’ কারো ‘এগারো কুড়ি’। কেবল বড় মাঝি পায় বাইশ কুড়ি’ থেকে পঁচিশ কুড়ি’, মাঝিদের বয়স হয় চল্লিশ থেকে ষাটের মধ্যে। বহদ্দাররা কম বয়সী মাঝি রাখে না। কেননা সিদ্ধান্ত যদি ভুল হয় তাহলে ভরাডুবির সম্ভাবনা। বড়মাঝির কথা ছোটমাঝি ও গাউররা বিনা দ্বিধায় পালন করে। গাউরদের বয়স যেমন অল্প তেমনি তারা বলিষ্ঠও।

সমুদ্র শক্তির প্রয়োজন সর্বাধিক। জাল থেকে মাছ তোলা থেকে শুরু করে গোঁজ পোঁতা ভয়ঙ্কর সমুদ্রের মোকাবেলা-সবেতেই জোরের দরকার। বারোজন গাউরের একজন পাচক তার পরিচিতি রাধইন্যা বলে। সে মাছ ধরে না, বাটনা বাটা, মাছ কোটা, ভাত তরকারি রাধাই তার কাজ। তা ছাড়া সে উচ্ছিষ্ট বাসন কোসনও ধোয়। বেতন তারই সব থেকে কম। সমুদ্র বক্ষে আহার বলতে মেলে সকালের পান্তা ভাত, দুপুরে ও রাতে অবশ্য রান্না করা ভাত জোটে।

লেখক জেলেদের জীবন সংগ্রামের বিবরণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন সম্পৃক্ত অন্যান্য সবকিছুরও পরিচয় দিয়েছেন। খবিরউদ্দিন মসজিদের ইমাম। তার স্ত্রী তেলের পিঠা তৈরি করেছিল ইমাম সাহেবের জন্য। উত্তর পতেঙ্গার মানুষজনের বিশ্বাস রাধেশ্যামের বাড়ির পিছনের অংশে সাঝবেলায় বা গভীর রাতে ভূত দেখা যায়। রাধেশ্যামকে দেখা গেছে তার দায়ে ধারদিতে। আবদুল খালেকের বাড়িতে বড় হুঁকো-কলকে ছিল বলে লেখক জানিয়েছেন। রাধানাথকে খাড়াও বানাতে দেখা গেছে। আদব স্যার জলচৌকিতে বসে পড়াতেন। রাধানাথ গলায় গামছা জড়িয়ে আদব স্যারকে প্রণাম করেছে। আদব স্যারের বাড়ি মোয়া, মুড়ি, মুড়ি মুড়কি নারকেল নাড় খাওয়ার উল্লেখ পাই। খু-উ বুইজ্যার কাঁধে বাক থাকার কথা পাই। দয়ালহরিকে বদনা ব্যবহার করতে দেখা গেছে। গানের আসরে ব্যবহৃত হয়েছে। কাসা, মন্দিরা কিংবা একতারা।

কালিদইজ্যায় চুল দাড়ি নখ কাটা নিষিদ্ধ। কাটলে অমঙ্গল হয় বলে বিশ্বাস। বহদ্দারের ক্ষতি হয়। যে কাটে তার অসুখ হয়। দরিদ্র্যের গৃহের কাঁসার থালা গøাস দেখা গেছে। হরিদাসকে তার মা হাত পাখার সাহায্যে বাতাস করেছে। হরিদাস খড়মের বায়না করেছে তার ঠাকুমা সে বায়না মিটিয়েছে। ইচাখালির জেলে পল্লীর কেউ মাংস খায় না। মুরগি হোল রামপাখী। অবতার রামচন্দ্রের অনুগত পক্ষী বলে তারা মুরগিকে ভক্তি করে। হরবাঁশি নানা অনুষ্ঠানে ঢোল সাজায়। যশোদার বাপ আগে থেকে পাটি বিছিয়ে রেখেছে। নানা জালের নাম পেয়েছি। হুরি, টাউঙ্গা, কাঠিজাল, বিহিন্দিজাল, পাতনিজাল ইত্যাদি। বেশকিছু প্রবাদ বাক্যের ব্যবহার দেখি- নুন আনতে পানতা ফুরায়, আষাঢ় মাস চাষার আশ, ভাবনা যত যাতনা তত, রমণী সীতা ধরণী গীতা, অনিলগতি জটিল অতি, নদীর তীর সমীর ধীর, বাড়া ভাত ছাই দিল, চোরেচোরে মাসতুতো ভাই, মগের মুলুক, চায়ের কাপে ঝড় তোলা, বেঁকা আড়গুলতই ঘি উড়ে, ঠেলার নাম বাবাজী, রাজাল্লাই রানী আর ভোজাল্লাই ভুজি, খাল কাডি কুঁইর ঢুকাইয়া, কাক পক্ষীও যে এন টেরনো পায়, অলস মাথা শয়তানের কারখানা, সুইচ হই ঢুকি, ফাল হই বাইর অইশে- প্রবাদগুলি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত।

মেছো পাড়ার হতভাগ্য মানুষগুলো মানুষের শোষণের যেমন শিকার তেমনি প্রকৃতির রোষেরও শিকার হয় তারা। সেই রোষের পরিণাম কি হয় লেখক তারও বর্ণনা দিয়েছেন বস্তুনিষ্ঠভাবে-

‘সে রাতে জলোচ্ছ¡াস হল, গোটা সমুদ্র উপকূল নোনা জলের নিচে চলে গেল। প্রবলবৃষ্টি চারদিকে আঁধার করে রাখল সমস্ত রাত। বাতাসের প্রচণ্ড তাণ্ডবে জেলেপাড়ার প্রায় প্রতিটি ঘরের চাল উড়ে গেল। মাথা হারিয়ে প্রতিটি বড় গাছ কবন্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। জলপুত্ররা কেউ গাছে চড়ে, কেউ বাঁশ ধরে, কেউ ঘরের চালে চড়ে জান বাঁচাল। কেতকি বুড়ি মারা গেল। গুরুপদর বারো বছরের ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গেল হরিদাসদের পুকুরে। নিকুঞ্জের বড়ছেলের লক্ষীর পাঁচালি-পড়া বউটিকে পাওয়া গেল বড় রাস্তার ধারে মাদার গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায়। বউটির লম্বা চুল ছিল। -তার লম্বা চুল আটকে গেল মাদার গাছের কাটায়। ভয়ে তার জিহ্বা বেরিয়ে গেছে। কোমর থেকে শাড়ির আঁচল নিচের দিকে ঝুলে গেছে। খালি গা। -হরিদাসের ভাই হরিমিলনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। -পুকুরপাড়ে খালের ধারে, খোলাজমিতে ছোট ছোট ডোবাতে গরু ছাগলের মৃতদেহ পড়ে আছে। এগুলোর ফাকে ফাকে মৃত মানুষের হাত পা উপর দিকে উঠানো। স্বজন হারা জেলে ও হিন্দু-মুসলমানের হাহাকারে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।

‘দহনকাল’- এ নানা চরিত্রের সমাবেশ। লেখক চরিত্রগুলোকে নিপুণ চিত্রকরের মতো সীমিত পরিসরে উপস্থাপিত করেছেন তথাপি সেগুলি বিশ্বস্ত চিত্রণ হয়ে উঠেছে। কয়েকটি তুলির আঁচড়ে টানা চিত্রের মতো উপন্যাসের চরিত্রগুলি। (সংক্ষেপিত)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj