একজন হরিশংকর জলদাস : শান্তিরঞ্জন ভৌমিক

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

হরিশংকর জলদাস বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক। তিনি আমার নিকটতম, আপন মানুষ, আত্মার আত্মীয়। তাঁর সম্পর্কে কিছু লেখা বিব্রতকর। কারণ নির্মোহ থাকা সম্ভব নয় বা আবেগ গ্রাস করতে পারে, এখানেই প্রতিবন্ধকতা।

হরিশংকরের সঙ্গে পরিচয় বেশি দিনের কথা নয়। ২০০১ সালে আমি পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা) হিসেবে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে যোগদান করি। কয়েক মাস পর হরিশংকর বদলি হয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। তখনই তাঁকে প্রথম দেখি, পরিচয় হয়। বিভাগে বারোটি পদ, অধ্যাপক পদ শূন্য, আমরা এগারোজন, পুরুষ শিক্ষক চারজন। সকলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠলেও হরিশংকরের সঙ্গে অন্যরকম ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হতে থাকে। অন্যেরা স্যার বা শান্তিবাবু সম্বোধন করলেও তিনি আমাকে ‘দাদা’ বলে ডাকতে থাকেন। এ অধিকার না দিলেও কীভাবে যেন তা স্থায়ী হতে থাকে। আমি ‘আপনি’ বললেও ‘হরিশংকর’ বলেই সম্বোধন করতাম। কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের ঘনিষ্ঠতা এতই প্রগাঢ় হলো, হরিশংকর আর তা পোশাকী অবস্থানে ধরে রাখতে চাইছিল না। একদিন আমাকে বলল, ‘দাদা, সামনের কলেজ বন্ধ সপরিবার কুমিল্লায় বেড়াতে যেতে চাই। কুমিল্লা তেমনভাবে আমাদের দেখা হয়নি।’ বলে রাখি- আমার আবাস কুমিল্লা শহরে, সেখানে আমার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে থাকে। আমি সপ্তাহান্তে যাতায়াত করি, চট্টগ্রামে রামকৃষ্ণ আশ্রমে থাকি। হরিশংকর কোনো এক ছুটিতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে বেড়াতে আসে, ৪/৫ দিন থাকেন। এভাবে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কটি বিস্তার লাভ করে এবং হরিশংকরের পরিবার আমার পরিবারের সদস্যদের নিকটজন আপনজন ও আত্মীয় হয়ে যায়।

হরিশংকর ছাত্রজীবনে লেখালেখি করেছে কিনা জানি না, তবে অধ্যাপনা জীবনে একাডেমিক বিষয়ে ছোট ছোট বই লিখেছেন। তা কোনো উল্লেখযোগ্য নয়। তখন তাঁর লেখার সিংহভাগ প্রবন্ধবিষয়ক। তিনি একদিন বললেন, ‘দাদা, আপনি তো বাংলা একাডেমির সদস্য, আপনার যাতায়াত আছে। আমি আপনার সঙ্গে একাডেমির এজিএম-এ যেতে চাই। আমি যেতে পারব? তখন ততটা কড়াকড়ি ছিল না। বললাম- ‘চলেন’। বাংলা একাডেমির এজিএম সাধারণত প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়। আমি যেহেতু কুমিল্লা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পাই। আমি হরিশংকরসহ ঢাকায় যাই এবং একাডেমির এজিএম-এ যোগদান করি, তা সম্ভবত ২০০২ সালের ডিসেম্বর, তিনি সঙ্গে ক্যামেরা নিয়েছেন, তখন মূলত বাংলাদেশের লেখক বা বিশিষ্টজনদের ততটা চিনতেন না। উদ্বোধনের পর ফেলোশিপ দেয়ার পর্ব শেষ হলে উন্মুক্ত লনে চা-পানের ব্যবস্থা। সেখানে চা-পানের জন্য গেলাম। সেখানেই পরস্পরের মধ্যে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ইত্যাদি। আমি একজনকে দেখিয়ে বললাম- ‘শংকর, তাঁকে চিনেন?’ বললেন- ‘না’। বললাম, ‘তিনি সূর্যদীঘল বাড়ি’ রচয়িতা আবু ইসহাক’। শংকর কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলা শুরু করলেন এবং ছবি তুললেন। তারপর বললাম, শংকর, তাঁকে চিনেন?’ ‘না, দাদা’। বললাম, ‘তিনি বিচারপতি হাবিবুর রহমান’। কাছে গেলেন, কথা বললেন, ছবি তুললেন। দেখা হলো তাঁর ও আমার শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামানের সঙ্গে। এভাবে রামেন্দু মজুমদার, সৈয়দ শামসুল হক- অনেকের সঙ্গে। লক্ষ্য করলাম শংকর আবেগে আপ্লুত। এভাবে এক অজানা যাত্রা শুরু হলো। শংকরের মননে এক ধরনের নির্মাণ-শৈলী সৃষ্টি হতে থাকে এবং এক সময় তাঁর ‘জলপুত্র’ রচিত হয় এবং মাওলা ব্রাদার্স থেকে অনিশ্চিত আশঙ্কায় প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি বের হওয়ার পর হরিশংকর হয়ে পড়েন বাংলা কথাসাহিত্যের ‘জলপুত্র’। যেহেতু স্মৃতিকথায় বিচরণ করছি- তাই তাঁর পরবর্তী সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করছি না, এ লেখায় তা সম্ভবও নয়। তাঁর স্বীকৃতি আজ পাঠক সমাজে সমাদৃত। আমি তাঁদের দলেরই একজন। গর্বের সঙ্গে বলছি- একদিন হরিশংকর আমার পেছনে হেঁটেছিল, এই তো সেদিন। অল্পদিনেই সমানে সমানে হেঁটে চলেছেন এবং এক সময় আমাকে অতিক্রম করে এতটাই এগিয়ে গেছেন- আমি পেছন থেকে তাঁকে দেখতে পাই, সামনে হাঁটার যোগ্যতা ও সামর্থ্য সবটাই হারিয়ে ফেলি। এ আমার অক্ষমতা বা পরাজয় নয়- আমার জীবনের উজ্জ্বল প্রাপ্তি। একদিন আমার সঙ্গে হরিশংকর ছিল। এখন আমি তাঁর সঙ্গে আছি।

আমি হরিশংকরের অগ্রজ প্রতিম। এ বিবেচনা শুধুই তাঁর। আমি তাঁকে কোলে-পিঠে করে বড় করিনি। তাঁর মধ্যে বড় হওয়ার সব সম্ভাবনা আগেই নিহিত ছিল, বলতে পারি- তা সময়-সুযোগ এবং সাহচর্যের জন্য স্তিমিত ছিল। তাই তাঁর মূল লেখালেখি শুরু হয়েছে অনেকটা পরিণত বয়সে। তারপরও বলব- তা হয়তো পূরণ হয়ে গেছে এবং ইতিহাসে-আলোচনায় স্বীকৃতিও লাভ করেছেন। বহু সম্মান-পুরস্কার সাক্ষ্য দেয়।

হরিশংকর তথাকথিত দলিত সমাজের প্রতিনিধি-লেখক। তাঁর লেখায় ব্যাপকভাবে এ বিষয়টি জায়গা দখল করে রেখেছে। সে জন্য তাঁর অহংকার ভিন্নমাত্রায় প্রোজ্জ্বল। বেদব্যাস থেকে অদ্বৈত বর্মণ তাঁর, আপনজন, পূর্বপুরুষ, হিসেবে অহংকারের বাতিঘর। শংকরের মগ্নচৈতন্যে আঘাত এসেছে সমাজের একশ্রেণি তথাকথিত অভিজাত স¤প্রদায়ের হীন মানসিকতাসমৃদ্ধ কুরুচিপূর্ণ আচরণ থেকে। চট্টগ্রামে তিনি কলেজ শিক্ষক, কলেজ অধ্যক্ষ। কিন্তু সামাজিকভাবে ‘জাইল্যার পোয়া’। চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগদান করলেন প্রফেসর দিল আফরোজ। তিনি শংকরকে ‘জাইল্যার পোয়া’ বলেই সম্বোধন করতেন, এমনকি বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (অ.ঈ.জ) শংকর যেন পদোন্নতি না পায় সে জন্য মূল্যায়নে মিথ্যাভাবে কম নম্বর দেন। অধ্যক্ষ মহোদয় বিষয়টি অবগত ছিলেন বলে তিনি নিজ দায়িত্বে ও ক্ষমতায় মূল্যায়ন করে নম্বর পাল্টিয়ে দেন। চট্টগ্রাম শহরে তাঁর বাসা-ভাড়া পেতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় দলিত সমাজের লোকবলে। বিশেষত হিন্দু এলাকায় তিনি তখন বাসা-ভাড়া নিতে পারেননি। এখন অবশ্য অনেকটা দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছে। শংকরের মেয়ের বিয়ে হয় তথাকথিত উচ্চবর্ণে-ছেলে-মেয়ের জানাশোনার প্রাবল্যে। ছেলের পক্ষ প্রচণ্ড বিরোধিতা করেও যখন তা বাধাপ্রাপ্ত ঘটাতে পারলেন না, তখন তাঁদের তথাকথিত মানসম্মান রক্ষার্থে শংকরকে কুমিল্লায় মেয়ে বিয়ের আয়োজন করতে হয়েছে। এসব অনেক কারণেই তাঁর মনে যাপিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নিবিড়ভাবে তাঁর লেখনীতে অনেকটা প্রতিবাদ স্পৃহা রচিত বলে আমি মনে করি।

জিজ্ঞাসা করেছি- ‘শংকর, কেন? আপনি তো চট্টগ্রাম শহরে অনেক টাকা ভাড়া দিয়ে থাকেন, সেখানে একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে থাকেন না কেন?’ শংকরের সহজ উত্তর- ‘আমি জাইল্যার পোয়া, আমি আমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না। আমি যে মাটি থেকে উঠে এসেছি, তা আমার কাছে পবিত্র, আমার অহংকারের ভিত্তি। আমি আলাদা হয়ে গেলে আমার আপনজনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। আমি বেইমান হয়ে যাব। দাদা, আমি আমার শেকড়কে অস্বীকার করতে পারি না, পারব না। তারাই যে আমার সব। আমি তাদের প্রতিনিধি।’ তারপর আর কোনো কথা চলে না। শুধু মনে মনে উপলব্ধি করি- মানুষ কখন ‘জাইল্যার পোয়া হয়, ব্রাহ্ম?ণ-বৈদ্য-কায়স্থ ইত্যাদি হয়?’ আসলে তথাকথিত সমাজে উচ্চ শ্রেণির অধিকারী কারা? উত্তর পেয়ে যাই শংকরের জীবনযাপনে, আচরণে ও মননর্চায়। তাই তো তিনি আমার আপনজন, নিকটজন ও আত্মার আত্মীয়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj