বাংলা কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গ এবং হরিশংকর জলদাস : হুমায়ূন মালিক

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

হরিশংকর মূলত সাবঅল্টার্ন সোসাইটি তথা অচ্ছুৎ, শোষিত, বঞ্চিত, পতিত, দলিত মানুষের রূপকার হিসেবে ইতোমধ্যে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। এরই মধ্যে নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে রচিত তাঁর গল্পগ্রন্থ জলদাসীর গল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে সমুদ্রের জেলেদের নিয়ে জলপুত্র, দহনকাল, ধাঙ্গড়দের নিয়ে রামগোলাম বাংলা কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে পাঠক-সমালোচকদের বিবেচনায় এসেছে। তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ ছোটগল্পে নিম্নবর্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গও আমাদের সাহিত্যে এতদবিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে দাবি করা যায়।

কথাসাহিত্যে বারাঙ্গনা চরিত্র একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক চরিত্র হিসেবে। তবে প্রোটাগনিস্ট হিসেবে তার উপস্থিতিও কম নয়। সমারসেট মমের ‘দি রেইন’ থেকে হালের গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের আমার দুঃখভারাক্রান্ত বেশ্যাদের স্মৃতিকথা এর উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলা কথাসাহিত্য তার ব্যতিক্রম নয়। রবীন্দ্রনাথ বা রক্ষণশীল বঙ্কিম একে প্রশ্রয় না দিলেও শরৎচন্দ্র অপরিসীম দরদ দিয়ে চরিত্রটি এঁকেছেন। অতঃপর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি, শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপদ বধূ, সমরেশ বসুর বারো বিলাসিনী, সমরেশ মজুমদারের তিন নম্বরের সুধারানী এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উলেখের দাবিদার। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বেশ্যাবৃত্তি বা বেশ্যাপাড়া নিয়ে যে সব উপন্যাস রচিত হয়েছে তার মধ্যে রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষর (প্রকাশ : ১৯৮৪) ও সেলিনা হোসেনের মোহিনীর বিয়ে (প্রকাশ : ২০০২) উল্লেখযোগ্য। এরই মধ্যে গণিকা ও গণিকালয়কে বিষয় করে প্রকাশিত হয়েছে হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস কসবি।

বাংলা কথাসাহিত্যে কসবি এ ধারার এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কর্ণফুলী নদী তীরে প্রায় তিনশ বছরের পুরনো চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার বেশ্যাপল্লীর পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত। একটি বেশ্যাপল্লীতে বস্তুত যা যা থাকে, যা যা ঘটে তার এক শিল্পিত বিশ্বস্ত সাহিত্য-দলিল এই কসবি। একেকটি চরিত্রকে হরিশংকর এমন সুকৌশলে এঁকেছেন যে তারা হয়ে উঠেছে তাবৎ বেশ্যাপট্টির সে শ্রেণির চরিত্রের প্রতিনিধি; হোক সে বেশ্যা, মাসি, বেশ্যার দালাল কী খদ্দের এবং এভাবে উপন্যাসটি একটি বৃহত্তর প্রতীকী চরিত্র পায়, যদিও কসবি মূলত একটি বাস্তবধর্মী উপন্যাস। এই উপন্যাসে যেসব বারবণিতার চরিত্র উঠে এসেছে তারা হলো দেবযানি, পদ্মাবতী, চম্পা, বিজলি, আইরিন, বনানী, বেবি, ইলোরা, মার্গারেট, জুলিয়েট, সুইটি, মমতাজ, রীতাকুমারী, কুলসুম, অনিতা, সুরভি, রোকেয়া, উমা ও শিউলি। এ ক্ষেত্রে পদ্মাবতী বিশেষ গুরুত্ব পেলেও প্রোটাগনিস্ট দেবযানী; এই কেন্দ্রীয় চরিত্র ঘিরেই উপন্যাস। সে নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদী তীরের বীরপুর জেলেপাড়ার মেয়ে, আদি বা প্রকৃত নাম কৃষ্ণা। তার বাবা শৈলেশ দাস। শৈলেশ স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে গ্রাম ছেড়ে চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার বেশ্যার দালাল শামছুর আশ্রয় নেয়। এই শামছুর হাতেই পরবর্তীতে কৃষ্ণা সাহেবপাড়ায় বিক্রি হয়। প্রেমিক তপনের হাত ধরে কৃষ্ণা যখন চট্টগ্রামে পালিয়ে আসে তখন ঘটনাটি ঘটে। তপন হোটেলে রাত কাটিয়ে কৃষ্ণাকে বিক্রি করে চলে যায়। অতঃপর কঠিন, করুণ, বেদনাময় এক পরিণতির মধ্য দিয়ে দাসপাড়ার কৃষ্ণা সাহেবপাড়ার গণিকা হয়। এখানে তার নাম হয় দেবযানী এবং সে হরিশংকর জলদাসের লেখনিতে সম্পন্ন বারাঙ্গনা হিসেবে বাংলা কথাসাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র হয়ে ওঠে। এখানে তপনের প্রতি দেবযানীর প্রতিশোধপ্রবণ মনের যে বাঁকবদল লেখক দেখিয়েছেন তা অত্যন্ত চমৎকার। দেবযানী হয়ে ওঠার পর তপনকে খুঁজে বের করে পাওনা বুঝিয়ে দিতে কিন্তু সে তা পারে না, কারণ বিচার তার হয়ে গেছে কিংবা তাকে কিছু তার করারই থাকে না। দুর্ভাগ্য, ট্রেনে কাটা পড়ে সে এখন ইস্টিশনে ভিক্ষা মাগে। দেবযানীকে লেখক শুধু একটি সামাজিক চরিত্র হিসেবেই অঙ্কন করেননি তার মনোদৈহিক দিকগুলোও তুলে এনেছেন এবং যা কিনা অসাধারণ। কসবির শুরু থেকে এর উদাহরণ দেয়া যাক-

কখনো কখনো কাস্টমারের সঙ্গে কারবার শেষ করে দেবযানী যখন খেলাঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার সমস্ত মুখে এক ধরনের অনুরাগের প্রলেপ মাখানো থাকে। তবে সেটা অল্প সময়ের জন্য। দীর্ঘ বিশ বছরের অভিজ্ঞতায় সেলিম এটা বুঝে গেছে, অনুরাগের আভাটি অল্প সময়ের জন্য হলেও খাঁটি। এই ধরনের মেয়েরা মনমতো কাস্টমার পেলে কিছু সময়ের জন্য বাস্তবতাকে ভুলে যায়। প্রকৃত প্রেমিকার শিহরণ অনুভব করে শরীরে, কখনো কখনো মনেও। শরীরের শিহরণ বেশিক্ষণ টিকে থাকে না, অন্য কাস্টমার এসে তা দুমড়ে মুচড়ে দেয়। শরীর বেচাকিনার এই বাজারেও মনের শিহরণ অনেকক্ষণ, মাঝে মাঝে কয়েকদিনও স্থায়ী হয়। তখন দেবযানীদের মতো মেয়েদের মন থাকে ফুরফুরে, আচরণ হয় গেরস্থি নারীর মতন।

(কসবি, পৃষ্ঠা-৭)

বেশ্যাপট্টি নিছক দেহ বা কাম বিকিকিনির হাট নয়। আর্থসামাজিক নানা জটিল বিষয় এতে জড়িত, জড়িত বেশ্যাপট্টির কুটিল রাজনীতি। তার ভেতর এক কঠিন, মানবেতর, দুর্বিষহ, অস্বাভাবিক জীবনযাপন করে মাসি, সর্দার, দালাল, বারবণিতা আর তাদের সন্তানরা। এসব বিষয় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাঁর উপন্যাসে তুলে এনেছেন হরিশংকর জলদাস। একটি মাত্র ডায়ালগে বিষয়টি তিনি কেমন দক্ষতায় তা তুলে আনেন তুলে ধরা যাক-

আমার আছে, শত্রু আমার আছে। বলে চেয়ার ঢেলে উঠে পড়েছিল মোহিনী মাসি।

বেসিনের দিকে যেতে যেতে বলেছিল। এই পাড়ায় সবাই সবার শত্রু। মেয়েদের শত্রু সর্দার-মাসি-মাস্তানরা। আবার মাসিদের শত্রু সর্দার-মাস্তনরা। সর্দার নিরীহ ম্যাদামারা মাসিদের পছন্দ করে। আমি ম্যাদামারা নই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি আমি। এই জন্য কালু সর্দার আমাকে শত্রু মনে করে। মনে করে- আমি তার বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি। আমার ক্ষতি করতে তাই সে উঠেপড়ে লেগেছে। সে জানে- আমার সবচাইতে বড় দুর্বলতা তুমি। সেই দুর্বল জায়গায় আঘাত দিতে সে দ্বিধা করবে না। তাই বলছিলাম সাবধানে চলাফেরা করিস বাবা। তোর জন্য যাতে আমাকে চোখের জল ঝরাতে না হয়। (কসবি, পৃষ্ঠা ১২৬)

লেখক শুধু বেশ্যাদের জীবন এবং বেশ্যাপট্টির সমাজ চিত্রই দক্ষতার সঙ্গে আঁকেন না এই কৈলাসের মধ্য দিয়ে কসবির সামাজিক অঙ্গীকারও রূপায়িত হয়। লেখক এ কাজটিও মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের আলোকে এমনভাবে করেন যে তা ¯েøাগান হয়ে ওঠে না। কৈলাস এক সময়ের বেশ্যা এই মোগিনী মাসির সন্তান। কৈলাস বেশ্যাদের পাড়ার কুচক্রি মাসি ও মাস্তানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত করার প্রয়াস নেয়। বেশ্যাদের অধিকার সচেতন করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখানো, সপ্তাহে একদিন ঘরে কাস্টমার না তুলে বিশ্রাম ইত্যাদি স্বার্থ নিয়ে কৈলাস সংগ্রাম করে। এ নিয়ে সে প্রথমে বিরোধী শক্তির হাতে মার খায়। কালু মাস্তান আর তার সহযোগীরা বনানীর সঙ্গে বাদ-বিবাদে জড়িয়ে পড়লে কৈলাস তাঁদের রুখে দাঁড়ায় এবং মার খায়। শেষ পর্যন্ত লেখক কৈলাশকে দিয়ে বৈপ্লবিক কিছু ঘটান না বরং অপশক্তির হাতে তার মৃত্যু হয়। এটাই বাস্তব। তাকে দিয়ে বৈপ্লবিক কিছু না করলেও লেখক চরিত্রটিকে দেবযানীর চেতনা-বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত করেন-

‘দেবযানীর খুব ইচ্ছে ছিল কৈলাসবাবুর সঙ্গে একবার কথা বলার। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কৈলাসবাবুকে একবার দেখার ইচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে দেবযানীর মধ্যে আকুলিবিকুলি করেছে। যে যুবকটি পতিতা মেয়েদের জন্য, তাদের যারজ সন্তানদের জন্য এত কিছু করেছে- তাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যেতো। কিন্তু দেবযানীর সে ইচ্ছে কখনো পূর্ণ হয়নি, পূর্ণ হবার নয়ও সে ইচ্ছে। (কসবি, পৃ- ১৩৮)

কসবিতে শুধু কসবিদের জীবনকথাই উঠে আসেনি, এ ক্ষেত্রে পটভূমির সমকালীন সমাজ ও পরিবেশও পাঠকের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখকের হাতে যেন ভিজুয়ালাইজেশনের জাদু আছে। সে জাদুতে অভিভূত হয়ে আমরা সাহেব পাড়ার শুরু বা পত্তন যেমন চাক্ষুষ করি তেমনি তার জমজমাট যৌবন। কর্ণফুলী নদী, স্ট্র্যান্ড রোড, পাকিস্তান বাজার, ফকিরপাড়া, মাঝিরঘাট, লায়ন সিনেমা, রঙ্গম, সিনেমা প্যালেস, আন্দরকিলা, রাস্তাঘাটসমেত তৎকালীন চট্টগ্রামের সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ এখানে মূর্ত ও বাঙ্ময় হয়ে ওঠে এই এক গণিকা পল্লী ঘিরে।

কসবিতে আমরা কসবির জমজমাট যৌবন যেমন প্রত্যক্ষ করি তেমনি তার পরিণতি, এর মধ্য দিয়ে কসবি জীবনের ট্র্যাজিডি যেন পূর্ণতা পায়। উদাহরণস্বরূপ আমরা প্রথমে পদ্মাবতীর রূপ দর্শন করি-

দেবযানির আগে, ‘এই পাড়ায় পদ্মাবতীর খুব নামডাক ছিল। পদ্মাবতী অসাধারণ রূপসি ছিল। পদ্মাবতী যাকে তাকে ঘরে বসাত না। তার জনাকয়েক বাঁধা কাস্টমার ছিল। তারাই পদ্মাবতীর রূপে-রসে ডুবসাঁতার কাটত। পদ্মাবতীর ডিমান্ডও ছিল অনেক বেশি। তার কাস্টমাররা ছিল বনেদি।’ (কসবি, পৃ. ১১)

এখন এই পদ্মাবতীর পরিণতি-

তাকে দেখে দেবযানী ‘আর্তচিৎকার করে উঠল। … পদ্মার মুখমণ্ডল জুড়ে পোড়া মাংসের পিণ্ড। ঝলসানো চামড়া।’ সে এখন পেটের দায়ে দেবযানী ও মোহিনী মাসির করুণা প্রার্থী।

লেখকের বর্ণনা থেকে গণিকাদের পরিণতির এক সর্বজনীন চিত্র তুলে ধরা যাক- ‘খুব সকালে পাতকুয়ার পানি নিতে আসে বুয়ারা। জলমেয়ে ওরা, ওরা আফতাবচি; এরা পতিতা পাড়ার পানি সরবরাহকারী। গাল থোবড়ানো, বুক চুপসানো ভাঙা যৌবন তাদের। ছেঁড়া কাপড় পরা, ব্লুাউজের এখানে ওখানে ফুটোফাটা। ওরাও এক সময় এই পাড়ার পতিতা ছিল। যৌবন চলে যাওয়ার পর তাদের কাস্টমার কমে যায়। নিরুপায় হয়ে তারা পতিতাবৃত্তি ছেড়ে এ-ঘরের ও-ঘরের ফাইফরমাস খাটতে শুরু করে। কেউ যুবতী পতিতাদের গা-গতর টিপে দেয়, পরিপাটি করে চুল বেঁধে দেয়, কেউ তাদের কাড়চোপড় ধুয়ে দেয়, কেউ বাড়িতে বাড়িতে পানি সরবরাহ করে। পতিতাদের দেয়া টাকাতেই তাদের ভরণপোষণ চলে।’ (কসবি, পৃ-৬২)

কসবিদের দেহ ও স্তন বর্ণনায় হরিশংকর বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। মিলান কুন্ডেরা তাঁর এ বুক অফ লাফ্টার এন্ড ফরগেটিং-এ নারীর সমৃদ্ধ দেহ ও বিচিত্র স্তনের যে চিত্র আঁকেন তা পাঠক ও সমালোচকের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্রশংসিত হয়। হরিশংকর কসবিতে দেবযানীর ব্যাধিমুক্তির পর দেহ বিকাশের যে বর্ণনা দেন এবং বিভিন্ন চরিত্র যেমন আইরিনের মুখে স্তনের যে বর্ণনা দেন তা প্রশংসাযোগ্য। তবে এসব সাধারণ পাঠকের কাছে অশ্লীল, অরুচিকর বলে মনে হওয়ার অবকাশ বা ঝুঁকিও আছে।

কোনো একটি বিষয়কে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা ও বিচার বিশ্লেষণ করার তথাকথিত এক আধুনিক বৈশিষ্ট্য শিল্প-সাহিত্যে প্রচলিত আছে। কসবিতে হরিশংকর জলদাস তার বাইরে দাঁড়িয়ে নির্মোহ, নিরপেক্ষ, স্বতন্ত্র এক সাহিত্য রুচির পরিচয় দিয়েছেন। বেশ্যাবৃত্তির মধ্যেও যে ভালোলাগা, ভালোবাসা আছে, কখনো কখনো খদ্দেরও যে তাদের বিশেষ উপভোগ্য হয়, এ জীবনও যে কখনো কখনো স্বাভাবিক, স্বাভাবিক আনন্দ-বেদনা-হাস্যরসের, রিলিফের হরিশংকর সে বাস্তবকে তুলে আনেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে যে কারণে তার কসবি যেমন একপেশে হয়ে ওঠে না তেমনই কসবির কমিটমেন্ট হয় না স্থ’ূলতায় ভারাক্রান্ত।

এবার কসবির আঙ্গিক সম্পর্কে বলা যাক। এতে শৈল্পিক ঘোর আছে কিন্তু জটিলতা নেই। লেখক উপন্যাসটিতে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, নরসিংদী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তবে বেশির ভাগ চরিত্র সর্বজনীন এক ভাষায় কথা বলে যা প্রমিত চলতি ভাষার কাছাকাছি, যা চরিত্র অনুযায়ী আঞ্চলিক নয়; লেখক হয়তো পাঠকের সঙ্গে কমিউনিকেশনের সুবিধার জন্য তা তৈরি করেন। হরিশংকর জলদাস এখানে অধিবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, মায়াবাস্তবতা, এমনকি চেতনা-প্রবাহরীতির খুব একটা ধার ধারেননি, যার কোনো প্রয়োজনও নেই; এ ক্ষেত্রে তিনি যে আঙ্গিক, যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন তা তাঁর বিষয় অনুযায়ী যুৎসই, যথার্থ এবং অনন্য। কসবি নানা কারণে বাংলা কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে দাবি করা যায়।

হরিশংকর জলদাসের গবেষণালব্ধ সাতটি প্রবন্ধের সংগ্রহ ছোটগল্পে নিম্নবর্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ। প্রবন্ধগুলো যথাক্রমে গল্পকথা, গল্পকারের কথা, রবীন্দ্রগল্পে নিম্নবর্ণ, বনফুলের গল্পপাঠের ভূমিকা, শরদিন্দুর ইতিহাস গন্ধী গল্প : অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্র, অদ্বৈতের ছোটগল্প : বুভুক্ষু মানুষের কথকথা, দুটো ছোটগল্প : প্রসঙ্গ নৃশংসতা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মনোবাস্তবতার শিল্পী। উল্লিখিত শিরোনামগুলো থেকেই হরিশংকর জলদাসের বিষয় নির্বাচন ও দৃষ্টিভঙ্গির মোটামুটি পরিচয় মেলে। তবে প্রবন্ধগুলো পড়ার পরই শুধু উপলব্ধি সম্ভব প্রাবন্ধিকের দৃষ্টিভঙ্গির তীক্ষèতা, যুগপৎ তাঁর তীক্ষè উদ্ভাবনী ক্ষমতার।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে হরিশংকর জলদাস নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গল্প-উপন্যাস লিখেছেন যা এই প্রবন্ধগ্রন্থে তাঁর নিম্নবর্গের মানুষের গল্প নিয়ে গবেষণারই এক সৃষ্টিশীল ধারাবাহিকতা। এরই মধ্যে নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে রচিত তাঁর গল্পগ্রন্থ জলদাসীর গল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে সমুদ্রের জেলেদের নিয়ে জলপুত্র, দহনকাল, বারবণিতাদের নিয়ে কসবি, ধাঙ্গড়দের নিয়ে রামগোলাম বাংলা কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে চিহ্নিত বা মূল্যায়িত হয়েছে।

(সংক্ষেপিত)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj