অদ্বৈতর সার্থক উত্তরসাধক : পিয়াস মজিদ

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ যে কোনো বিষয়ে আমি সন্জীদা খাতুন আপার মতামতকে মূল্য দেই। তো আপার কাছে যখন হরিশংকর জলদাসের জলমগ্ন গদ্যভূমির প্রশংসা শুনি তখন ভাবি তিনি নিশ্চয়ই দশের বাইরে, একটু আলাদা রকমের লেখক।

অনেকেই বলেন, প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কারই হরিশংকরকে পাদপ্রদীপের আলোয় এনেছে। আমি বলি এ পুরস্কার তো আরো অনেকে পেয়েছেন কিন্তু এভাবে পাঠকপ্রিয়তা কয়জনের বেড়েছে? যদিও পাঠকপ্রিয়তাই সাহিত্যসিদ্ধির মানদণ্ড মাত্র নয় তবে পাঠহ্রাসমান সমাজে হরিশংকরের ক্রমবিস্তার ভাবনাযোগ্য বিষয় বটে। এই জয় শুধু তার নয়, সাহিত্যেরও। আমরা বিশেষ আনন্দিত হই যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত হরিশংকর জলদাসের কথাসাহিত্যের প্রতি তার পাঠমুগ্ধতার কথা জানান। বাংলাদেশ ছাপিয়ে তার পাঠক এখন পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত।

একজন খ্যাতিমান কথাশিল্পী একটি পত্রিকায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাস্মারক রচনা হিসেবে প্রকাশিত হরিশংকর জলদাসের ‘তিতাস একটি নদীর নাম : উপন্যাস নয় মহাকাব্য’ শিরোনাম দেখে ঊষ্মা প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে এতটা বিশেষণ লাভের যোগ্যতা উপন্যাসটির আছে কিনা এই বলে। তার সামনে উপস্থিত আমি অনুমান করেছি অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং হরিশংকর জলদাস এই উভয় ‘জাউল্যার পোলা’কে গ্রহণে একরকম মানস-প্রতিবন্ধ কাজ করেছে সে আকাশচারী লেখকের। তবে হরিশংকর আমাদের এমন নিষ্ঠুর-প্রতিক্রিয়াশীল সাহিত্য-পরিসরে অদ্বৈতের মতোই তার নিঃশব্দ ক্রোধকে শিল্পের কুসুমিত উত্তর হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। সে জন্যই দহনকাল, রামগোলাম, জলপুত্র, মোহনা, অর্ক, হৃদয়নদী, একলব্য, প্রতিদ্ব›দ্বী, কাঙাল, সপ্তর্ষি, ইরাবতী, মাকাললতা, রঙ্গশালা, কোন এক চন্দ্রবতী, হরকিশোরবাবু, সে আমি নই আমি, এখন তুমি কেমন আছে, চিত্তরঞ্জন অথবা যযাতি বৃত্তান্ত-এর মতো গল্প-উপন্যাসে আখ্যানের অর্জুনক্ষম তীরবেগে, ভাষার দৃঢ়তা ও লালিত্যে তিনি অল্পসময়ে অর্জন করেন বাংলা সাহিত্যের এক বিশিষ্ট অবস্থান। মহাভারতের মাঠ থেকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক রুম পর্যন্ত বিস্তৃত তার কথাসাহিত্যিক এলাকা। আর বিশেষ করে বাক্সময় নদীতীরবর্তী জলমানুষের জনগল্প; যে জলজনমানুষ ব্যতীত আমাদের দেশ ও সাহিত্যের কোনো ডাঙ্গা পূর্ণতা পেতে পারে না।

নারীকে হরিশংকর জলদাস তার কথাসাহিত্যে দিয়েছেন নতুন পরিসর। কসবি উপন্যাসে যেমন সাধারণ নারীর নিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন ঠিক তেমনি আমি মৃণালিনী নই উপন্যাসে রবীন্দ্রজীবনের আপন নারীর অনাদৃত অবস্থাকে পরিস্ফুট করতে পিছুপা হননি। কারণ লেখক হিসেবে তার দৃষ্টি সর্বোতমুখী। প্রেম ও যৌনতা-উভয়ের সৌন্দর্য তার কথাবিশ্বের লক্ষযোগ্য বিষয়।

ভাষা সংক্রান্ত ট্যাবু তিনি তার সক্ষম-সবল-সাহসী হাতে গুঁড়িয়ে দেন নিমিষেই। লুচ্চা শীর্ষক গল্পবইয়ের শিরোনাম দেখে আমাদের অনেক লেখক পাঠককে আঁতকে উঠতে দেখেছি- এরকম শিরোনাম হয় নাকি সাহিত্যের! হরিশংকর জলদাস প্রমাণ করলেন আচরিক জীবনে আমরা যেসব শব্দ হরহামেশা ব্যবহার করি তা সাহিত্যে না আসার কোনো সঙ্গত কারণই নেই। কারণ সাহিত্য ও জীবন তার কাছে এক ও অদ্বৈত। এর আরেক দৃষ্টান্ত আমরা পাই তার আত্মজৈবনিক রচনা নোনাজলে ডুবসাঁতার-এর নানাপর্বে। কোনো পূর্বাপর বিবেচনায় না রেখে একমাত্র সত্যের কাছে দায়বদ্ধ থেকে যেন তিনি অবিকল তুলে ধরেছেন জীবনের যাবতীয় তিত ও মধু। স্বভাবতই অনেকের ক্ষুব্ধতার জন্ম দেয় এমন লেখা তবে হরিশংকর সাদা কালোর যথা-উপস্থাপনে একেবারেই নির্দ্বিধ।

প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গবেষণাগদ্যেও তার বিশিষ্টতা অপ্রকাশিত নয়। নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্ত জনজীবন তার উচ্চতর গবেষণার বিষয়মাত্র নয়, এই গবেষণাটি বাংলা কথাসাহিত্যের জলপরিসরকে কাঠামোবদ্ধ করেছে লেখকের যুগপৎ সৃষ্টি ও মননজাগর সত্তার সমাবেশে। লোকবাদক বিনয়বাঁশি তার আদিপর্বের গবেষণাগদ্য আর আমার দৃষ্টিতে তার সবচেয়ে স্মরণীয় গবেষণাকর্ম জীবনানন্দ ও তার কাল। দুই বাংলাতেই জীবনানন্দ দাশ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে ঢের কিন্তু বিশ্ব ও বাংলা-পরিপ্রেক্ষিতসমেত জীবনানন্দ ও তার অর্ধ শতাধিক বছর জীবনপরিক্রমাকে কালের যাত্রাধ্বনির সঙ্গে এভাবে অন্বিত করার প্রয়াসটি একেবারেই নতুন। আশ্চর্য বিষয়, আমাদের নামি জীবনানন্দ গবেষকেরা কাল-কলমুখর এই বইটি নিয়ে একেবারেই নীরব। আমার কর্ণফুলী, কৈবর্ত্যকথা, বাংলা সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ, নিজের সঙ্গে দেখা, জলগদ্য-এর মতো ননফিকশনাল গদ্যবইয়ে তিনি রেখে চলেন অনেক না-বলা কথা আর না-লেখা ফিকশনের সূত্রমুখ।

এই অসাধারণ গদ্যশিল্পীর সঙ্গে গত ২০১৭ এবং ২০১৮ এই দুবছরে দুবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভ্রমণের সুযোগ ঘটেছে আমার, মূলত অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং অদ্বৈত-চর্চার নিষ্ঠাবান সাধক শান্তনু কায়সার স্মারক অনুষ্ঠানে। দুটো অনুষ্ঠানই দেখেছি অন্তর্গত বিনয় ও স্পর্ধা প্রকাশ করে সাধারণ শ্রোতার মাঝে নিজের বক্তব্য অসাধারণভাবে উপস্থাপনে তার মুন্সিয়ানা। শান্তনু কায়সারের সঙ্গে তার একটি তিক্ত স্মৃতির উল্লেখ করেও সামগ্রিকভাবে তিনি কী কারণে নমস্য তার যথাব্যাখ্যা দিয়ে হরিশংকর জলদাস সমবেত আমাদের অনুধাবনে আনলেন আবার যে, মতান্তরই মনান্তর নয়। বিরোধ বা দ্ব›েদ্বর সৌন্দর্যকে আস্বাদন না করলে মানবজীবনের প্রকৃত স্বাদ অলভ্যই থেকে যায় আমাদের জীবনে।

এইতা সেদিন তিতাস আবৃত্তি সংগঠনের উদ্যোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুষ্ঠিত অদ্বৈত মেলার মঞ্চে আগত প্রধান অতিথি বনমালী ভৌমিককে স্বাগত করতে গিয়ে তিনি মুহূর্তেই তাকে আপন করে নিলেন এই বলে যে ‘বনমালী বাবু’কে আমি আগে দেখিনি বা তার সঙ্গে পরিচয় হয়নি কিন্তু আবার তিনি তো আমার অনেক কালের দেখা ও চেনা এই গানের সূত্রে- বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা…।’

২০১৭’র যাত্রায় আমরা নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের স্বীকার জনপদ নিজ চোখে ঘুরে আসার মানসে যাত্রা করি স্থল ও জলপথে, যে দুপথের মানুষের কথাই হরিশংকরের গদ্যও ধারণ করেছে পরম মমতায়। এই যাত্রায় পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরবিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের বাড়িতে গিয়েছি আমরা, সেখানে গিয়ে দেখিছি হরিশংকর দা যেন পুণ্যভূমি দর্শনের আনন্দে উদ্বেল। ঠিক ততটাই তাকে বিমর্ষ দেখেছি নাসিরনগরে ভাঙা দেবীমূর্তি-দর্শনে। হয়তো আমাদের উজ্জ্বল অতীত আর বিধ্বস্ত বর্তমানই তাঁর এই রূপান্তরের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। আর গোটা যাত্রাপথে তার রসস্ফ‚র্তিময় বাক্যালাপ আমাদের আড্ডাকে করে তুলেছিল প্রাণময়, যে প্রাণ তার সাহিত্য সংসারেরও মূলকথা। একটি বিষয় না বললেই নয়; আমাদের নাসিরনগর যাত্রায় দাদার স্বধর্মের একজন লেখক বারবার খাদ্য গ্রহণে নানান শুচিবাইয়ের কথা ব্যক্ত করছিলেন। আমরা অস্বস্তি বোধ করলেও কিছু বলিনি কেউ কিন্তু দাদা ঠিকই আমাদের কাছে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে এত ধর্মীয় শুচিবাই থাকলে একজন মানুষ লেখক হয় কী করে, তার বরং লেখক না হয়ে ধর্মাশ্রমের পাণ্ডা হওয়া উচিত ছিল।

হরিশংকর জলদাস লিখে চলেন আবার আমাদের লেখার বিষয়ও হন। এটা তার এই জীবনের অর্জন। আমি ভাবি অদ্বৈত মল্লবর্মণ আড়ালে থেকে হয়তো বলছেন, ‘এই তো আমার একজন সার্থক উত্তরসাধক পেলাম, নাম তার হরিশংকর জলদাস।’

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj