হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে বিধৃত জীবন : মহি মুহাম্মদ

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

দলিত প্রান্তজনের জীবনচিত্র হরিশংকর জলদাসের কথাসাহিত্যের প্রধান অনুষঙ্গ। বিষয়ভেদে তাঁর উপন্যাসের ভাষা ও চারিত্র্য পাল্টে যায়। তিনি তাঁর উপন্যাসে শুধু কাহিনী লেখেন না, সমাজকেও লেখেন। শুধুমাত্র জেলেজীবন নয়, তাঁর গল্পের চরিত্ররা নানা পেশা থেকে উঠে এসেছে। কখনো তারা সমাজের নিচু স্তরের জেলে, চাষি, আবার কখনো শিক্ষক, গৃহিণী, দোকানদার, শিক্ষিতজন কিংবা সমাজের মান্যগণ্য কেউ। তাদের মনের সংগুপ্ত কিংবা তাদের প্রাত্যহিক আচার-আচরণের নিটোল বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর গল্পে। হরিশংকর আমাদের আটপৌরে জীবনের গল্প শুনিয়েছেন। তাঁর গল্প খেটে-খাওয়া মানুষের স্বপ্ন ভাঙার ইতিহাস। তাঁর গল্প বঞ্চিতজনের সংগ্রামের ইতিহাস। তাই হরিশংকর জলদাসের গল্পগুলো আমাদের ভাবায়। মনে দাগ কাটে, আমাদের অনুভূতিশীল মনকে জাগ্রত করে। তাঁর গল্প আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় নদ-নদী, সমুদ্রের উপক‚লে বসবাসকারী মানুষের জীবনব্যাখ্যান ও তাদের প্রাত্যহিক জীবনের টানাপড়েনের নানা ঘটনার সঙ্গে। সেই ঘটনার অন্তরালে মানবিক-অমানবিক ঘটনায় জর্জরিত পাত্র-পাত্রীদের জন্য আমাদের মনে জেগে ওঠে মমতা, জন্ম নেয় দুর্মর ভালো লাগা। শুধু তাই নয়- জাগে ঘৃণা কিংবা বিবমিষাও। তারই ভেতর থেকে কখনো কখনো জেগে ওঠে সমবেদনা। সেই বেদনার রং কখনো শাদা, কখনো বা কালো। প্রান্তিক মানুষের জীবনশিল্পী হরিশংকর গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তুলে এনেছেন সমাজের এবং সমাজমানুষের ছবির পর ছবি। তাঁর উপন্যাসগুলো হলো- জলপুত্র (২০০৮), দহনকাল (২০০৯), কসবি (২০১১), রামগোলাম (২০১২), মোহনা (২০১৩), হৃদয়নদী (২০১৩) আমি মৃণালিনী নই (২০১৪) প্রতিদ্ব›দ্বী (২০১৪) এখন তুমি কেমন আছ, (২০১৫) সেই আমি নই আমি (২০১৬), একলব্য (২০১৬), অর্ক (২০১৭), রঙ্গশালা (২০১৭) ও ইরাবতী (২০১৭)।

২.

অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) ছিলেন একজন জেলে। তিনি লিখেছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৫৬), যা বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব পেয়েছে। তাঁর ঠিক ৫২ বছর পর হরিশংকর জলদাস দ্বিতীয় জেলে হিসেবে লিখলেন ‘জলপুত্র’ (২০০৮) ও ‘দহনকাল’ (২০১০)। এতে জেলে স¤প্রদায়ের অপ্রাপ্তির বেদনা, হতাশা, বঞ্চনা, ক্ষুধা-শোষণের হাহাকার, কাম-ক্রোধ ও অশিক্ষার অন্ধকার- সবই অসাধারণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের জেলেজীবন নির্ভর যেসব উপন্যাস আছে সেসব উপন্যাসে জেলেদের জীবিকা নির্বাহ করার উৎস হল নদী। জেলেদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার এখানে নদী। আর হরিশংকর জলদাসের ‘জলপুত্র’ উপন্যাসে জেলেরা যায় সমুদ্রে। এখানে সমুদ্র বিশেষ একটি ভূমিকা পালন করেছে। সমুদ্রই ওদের জীবন নিয়ন্ত্রণ কর্তা। এ উপন্যাসে জেলেদের বারো মাসের বর্ণনা আছে। আছে দুঃখ ও সুখের কথা। জেলেদের পূজা-পার্বণ উঠে এসেছে এখানে।

জেলেরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। ঝড়-জলে ভিজে তুলে আনে সমুদ্র থেকে মৎস্য। তারপরও তাদের অধিকাংশ কাটায় অনাহারে- তৃষ্ণায়। তারা স্বপ্ন দেখে দুবেলা দুমুঠো খাবারের, কিন্তু অনেক সময় তা জোটে না। আবার কেউ কেউ তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়। যেন এটাই প্রথা ওদেরকে ঠকিয়ে ওদেরকে উচ্ছেদ করলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। দুঃখ-কষ্টের তীব্র কশাঘাতে দানা বাঁধে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ আস্তে আস্তে সংগ্রামে পরিণত হয়। আর সেই সংগ্রামে দু-একজন নিহত হবার মধ্য দিয়েই ঝিমিয়ে পড়ে জেলেসমাজ। প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে আবার কখন কে আসবে তাদের মধ্যে যে শক্ত করে নিজের সমাজকে আঁকড়ে ধরবে, দাবি-দাওয়ার কথা মুখের ওপর বলতে পারবে।

শুক্কুরের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জেলেদের সংগঠিত করে গঙ্গা। ফলশ্রæতিতে গঙ্গা নিহত হলো। যে তরুণটি এ অন্ধকার সমাজটিকে আলোর দিকে হাঁটতে শেখাত, অধিকার আদায়ের কথা বলতে শেখাত সে চলে গেল। জেলেসমাজ স্তিমিত হয়ে পড়ল। তারা আবার আরেকজন গঙ্গার জন্য অপেক্ষা করবে আর ততদিন পর্যন্ত শোষিত হতে থাকবে। আর গঙ্গার অনাগত সন্তান হয়তো এসে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজটাকে টেনে তোলার প্রয়াস পাবে।

৩.

‘জলপুত্র’ যদি ডাঙার কাব্য হয় তবে ‘দহনকাল’ হলো জলের কাব্য। এতে জীবনের সংগ্রাম ও মুক্তির পথ নির্দেশিত হয়েছে। যে লোকগুলো জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে শুধু জাল ও জলের কাব্য রচনা করে আর পেটের খোরাক জোগায়, তারাই এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এটি লেখকের কাল্পনিক কোনো বিষয় নয়! এক জায়গায় লেখক স্বীকার করেছেন, যখন মুক্তিযুদ্ধে চলছিল তখন তার বয়স সতের বছর। তিনি সম্মুখ থেকে যুদ্ধ দেখেছেন। সেই সম্মুখযুদ্ধ দেখার স্মৃতি তিনি দহনকাল এ তুলে এনেছেন। ’৭১-এর ভয়াবহ অত্যাচারের নিপুণচিত্র উঠে এসেছে দহনকাল উপন্যাসে। বাংলা সাহিত্যে নদীগামী জেলেদের জীবন আলেখ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্ত সমুদ্রগামী জেলেদের বুঝি আমরা এই প্রথম হরিশংকর জলদাসের হাত ধরে পেলাম।

লেখক দহনকাল সম্পর্কে তাঁর আত্মজীবনী ‘নোনাজলে ডুবসাঁতার’(২০১৮) এ লেখেন- ‘হরিশংকরের হরি আর জলদাসের দাস-এ নিয়ে হরি দাস। দহনকালের কাল হলো-১৯৫৩-১৯৭১। ১৯৭১ এ আমার নিজের চোখে দেখা। ১৭ বছরের তরুণ তখন আমি। স্বভাবিকভাবেই ’৭১-এর যুদ্ধকালীন এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। ২০০৯ সালের জনকণ্ঠ ঈদসংখ্যায় এ উপন্যাসটি প্রকাশ করে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করল এ উপন্যাসটি। বউটি প্রকাশ হবার পর দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া পেলাম পাঠকের কাছ থেকে। একপক্ষ বললেন, আরে জানা ছিল নাতো! জানতাম জেলেরা শুধু মাছ মারে আর ভাত খায়। সরস্বতী তাদের এলাকায় যায় না কখনো। লক্ষীকে তারা বশ করতে চায় কিন্তু চঞ্চলা লক্ষী কালোমাটির দইজ্যপাড়ায় যেতে রাজি হলো না কখনো। নুন আর পানতার সম্মিলন ঘটাবার জন্য যে স¤প্রদায় উদয়স্ত পরিশ্রম করে তারা যে স্বাধীনতার যুদ্ধে নিজেদের রক্ত ও সম্ভ্রম দিয়েছে জানতাম না তো! দহনকাল তো সে কথা জানাল আমাদের।…প্রথমটাতে জলসংগ্রামের কাহিনী পরেরটাতে জলসংগ্রাম থেকে মুক্তির কাহিনী। একটি যদি আঁধার জীবনের কাহিনী হয় অন্যটা তো আলোক আকাক্সক্ষী মানুষের কাহিনী। মূলত আমি চেয়েছিলাম পূর্বপুরুষ ও তাদের সমুদ্র সংগ্রামী জীবন তাদের সমাজ এবং আমার জীবন নিয়ে তিনটি উপন্যাস লিখতে। জলপুত্র পিতামহের, দহনকাল এ পিতার এবং অলিখিত উপন্যাসটিতে আমার কাহিনী থাকবে। দহনকালের শেষাংশে সেরকম একটি ইঙ্গিত আছে। রাধানাথ চেয়েছে সমুদ্র অভিশাপ থেকে তার পুত্র হরিদাস মুক্তি পাক।’

৪.

কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী বাংলাদেশের একটি বেশ্যাপল্লী- চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া। প্রায় তিনশ বছরের পুরনো এই পল্লীকে কেন্দ্র করে ‘কসবি’ উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ পল্লী সংশ্লিষ্ট তৎকালের চট্টগ্রামের কাস্টম হাউসের বর্ণনা এবং সমকালীন চট্টগ্রাম শহরের ভৌগোলিক বিবরণও উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। উল্লিখিত জনপদের সমকালীন সময়ের মানুষের আচার-আচরণ গতিবিধি ও কালের নির্জন স্বাক্ষর ‘কসবি’ উপন্যাসে ধরা পড়েছে। তাই মনে হয়, এই উপন্যাসকে ঘিরে অনুসন্ধানী গবেষকের অনেক অজানা তথ্য উন্মোচিত হতে পারে। আর সে কাজের নিমিত্তে ঔপন্যাসিক হরিশংকর অনেকখানি এগিয়ে রেখেছেন।

পতিতাদের পুজো-অর্চণার বিষয়টিও লেখক তুলে ধরেছেন।

কার্তিক মাসের চতুর্দশী তিথিতে মহাড়ম্বরে কালীপুজো হয়। এছাড়া ফাগুন মাসে পতিতারা শিবপুজো করে। এদিন পতিতারা শরীর বেচা-কেনা বন্ধ রাখে। সাহেবপাড়ায় কালীপুজো ও শিবপুজো দুটোই হয়। এখানে পুবের গলির শেষ প্রান্তে ‘মা মগধেশ্বরীর মন্দির।’ এই মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যা পুরোহিত দিয়ে পুজো করানো হয়। কালী মন্দিরের প্রতি ভক্তি সবার। কারণ তারা জানে মা কালী রুষ্ট হলে ব্যবসা লাটে উঠবে। তাই সাহেব পাড়ায় পতিতা থেকে সর্দার পর্যন্ত সবাই এই কালী মন্দিরকে মানে। আবার এই কালী মন্দিরকে ঘিরে দুপক্ষের মধ্যে বিবাদ বেঁধে যায় কার আগে কে লাইনে দাঁড়িয়েছে এ নিয়ে চলতে থাকে বচসা।

হরিশংকর জলদাস এ সমাজের প্রান্তিক গণমানুষের দক্ষ রূপকার। তাঁর লেখায় এ সমাজের বঞ্চিত মানুষের হাহাকার, হতাশা, বিবমিষা, রিরংসা, স্বপ্নভঙের কষ্ট, শ্রেণি সংগ্রাম ও প্রতিবাদের ভাষা নিপুণ চিত্রকরের চিত্রের মতো উদ্ভাসিত হয়েছে। বেশ্যাদের জীবন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে কয়টি উপন্যাস রচিত হয়েছে তন্মধ্যে হরিশংকর জলদাসের ‘কসবি’ উল্লেখযোগ্য। লেখকের বিষয় বৈচিত্র্যে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের ধারায় ‘কসবি’ উখেযোগ্য হয়ে উঠেছে বলে বিশ্বাস রাখা যায়।

৫.

হরিশংকর জলদাসের বিষয়ভিত্তিক উপন্যাসসমূহ পাঠকের চিত্ত আকর্ষণ করেছে। তেমনি মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েনের যে বর্ণনা আর সংকট তিনি তুলে এনেছেন সেটিও পাঠককে ভাবিয়েছে। তাঁর মধ্যবিত্ত জীবনের পোড় খাওয়া দলিলভিত্তিক কয়েকটি উপন্যাস-হৃদয়নদী (২০১২), প্রতিদ্ব›দ্বী (২০১৪), এখন তুমি কেমন আছ (২০১৫), ইরাবতী (২০১৭), রঙ্গশালা (২০১৭)।

‘হৃদয়নদী’ উপন্যাসে পারভীন আক্তার নামের একজন পঞ্চাশোর্ধ নারীর অন্তর ও বহির্জীবন উপস্থাপন করেছেন। তাকে ঘিরেই মধ্য ও উচ্চবিত্তের মধ্যে সহৃদয়তা ও হৃদয়হীনতার প্রকাশ ঘটেছে ‘হৃদয়নদী’ উপন্যাসে।

পারভীন আক্তার একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। স্বামী পুত্র কন্যা নিয়ে তার দৃশ্যত সুখের সংসার। কিন্তু তারপরও এক দুর্মর অতৃপ্তি তাকে কুরে কুরে খায়। রাত্রিযাপনে তার অক্ষম স্বামী ফরহাদের পাশে শুয়ে অন্য পুরুষকে সে মনে মনে কল্পনা করে। স্বামীর পাশে প্রেমিক নিখিলেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেহসুখ বঞ্চিত পারভীন নিখিলেশের সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখকে ভাগ করে নিতে চায়।

‘হৃদয়নদী’র পরে ‘প্রতিদ্ব›দ্বী’ (২০১৪) উপন্যাসটিও মধ্যবিত্ত ঘেরাটোপে বন্দি। এরপরে আমাদের চমকে দিয়ে হরিশংকর তার বিষয়ভিত্তিক উপন্যাস থেকে একটু বাইরে আসেন। রচনা করেন ‘এখন তুমি কেমন আছ’ (২০১৫)। রোমান্টিক মনের সংগুপ্ত সাধনা, মধ্যবৃত্তের জীবনে আবার প্রবেশ। এটিও লেখকের কাছে এক ধরনের কমিন্টমেন্ট। তিনি বিষয়ান্তরে অন্য ঘরনার যে কোনো জীবনের ছবি আঁকতে পারেন, তা দেখাতে চান। এখানে লেখক হরিশংকরের শক্তিমত্তার পরিচয় মেলে। এরপরে পেয়েছি ‘রঙ্গশালা’। রঙ্গশালাতেও মধ্যবিত্ত জীবনকে নিয়ে জুয়া খেলায় মেতেছেন লেখক। মধ্যবিত্তের জীবন নির্যাস ছেকে বের করে এনেছেন কাাহিনী আর গভীর মনস্তত্ত্ব।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj