উজানের যাত্রী : নূর-ই আলম সিদ্দিকী

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

তৃতীয় বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবহেলিত মানুষে ভরা। একলক্ষ ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশে জীবন যাদের চরম মানবেতরভাবে কাটে; তাদের মধ্যে জেলে সম্প্রদায় অন্যতম। ভূমিহীন মানুষ এ সম্প্রদায়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই এবং প্রকৃতির বস্তু আহরণ করেই বেঁচে থাকা তাদের। জেলে পল্লীতে স্তব্ধ নিষ্প্রাণ নিরেট অন্ধকার। তার মধ্যেই একটু কোলাহল। তবে তা বীতনিদ্র ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়ের অন্নের চিৎকার। সে চিৎকারও নিষ্ফল আবেদন হয়ে জেলে পল্লীর বাও-বাতাসে ঘুরে-ফিরে ইথারে মিশে যায় নিমিষে। শরীরে উৎকট গন্ধ নিয়ে জীর্ণ পোশাকের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে জেলে পরিবারের প্রতিটি সন্তান। অভাব, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বিবমিষা ঘৃণা, ভয় আর আর্তকলরব নিয়ে তারা পার করে জীবনের প্রতিটি প্রহর। এমনি এক অন্ধকার এবং হতদরিদ্র পরিবারে যুধিষ্ঠির ও শুকতারা দম্পতির ঘরে জন্ম হয় (১৯৫৫) হরিশংকর জলদাসের।

হরিশংকর জলদাসের নামটি আঁকা এবং বাঁকা। নামের মতো প্রতিক‚ল সময়ের নির্মম শৈশব সঙ্কুচিত করে তাঁকে। সপ্তম শ্রেণি থেকে নিষ্ঠুর ও বিকৃতবুদ্ধি মানুষ তাঁকে কামড় দিতে থাকে। তিনি ছুটতে থাকেন সামনে। কিন্তু একদিকে বিস্তৃত জলরাশি, অন্যদিকে ডাঙার কিলবিল করা কীট পিছু ছাড়ে না কিছুতেই। ছোট্ট বালক হরি দিশা পায় না। তবে দিশ হারায় না একদম। শুরু হয় টিকে থাকার সংগ্রাম। লড়াইয়ের প্রতিটি পরতে শৃঙ্খলা ভাঙার নিনাদ। দিন এবং রাত ক্রমাগত সামনে এগোয়, হরিশংকরের জীবনেও বিষাদের কোলাহল বাড়তে থাকে। পরানেশ্বরীর উত্তরসূরি শেষ দেখার দৃঢ় প্রত্যয়ে থাকে স্থির। সমস্যার জাল ছিন্ন করে সমাপ্ত হয় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

কর্মজীবনের শুরুতে মানুষ গড়ার কারিগর হন মানুষের অনুরোধে। কিন্তু বিধি বাম। প্রিয় মানুষের দ্বারাই হন বিতাড়িত। বিদায় নেন প্রতিষ্ঠান থেকে সজল চোখে নীরবে। ততদিনে নিজে সংসারী হন। বড় সংসারের জ্বালা মিটাতে রাতে ছুটেন বাবার সঙ্গে সমুদ্রে। সারারাত জেগে থাকেন মাছের জন্য। নিয়তির পরিহাস ঘরের একান্ত মানুষটি জাগেন তাঁর জন্য। মা, শুকতারার মন আকুলি-বিকুলি করে প্রিয় সন্তানের তরে। কিন্তু হরিশংকর পাষাণ। কোনো পিছু টান নেই। নিজের জীবনকে নিয়ে জুয়া ধরেন। রাতে বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ। দিনে কঠোর অধ্যবসায়। জুয়ার গুটি ওঠে আসে হাতে। ’৮২ সালে হয়ে যান সরকারি গেজেটভুক্ত চাকুরে। ‘কোলাহলের বেগে ঘূর্ণি ওঠে জেগে’ আলোকিত উঠানে পা রাখেন। ভাবতে থাকেন এবার নিজেকে শোধরানোর সুযোগ হলো বুঝি। কিন্তু না, অন্ধকার পিছু ছাড়ল না। কত রঙ্গো জানো মানুষের সঙ্গে মিশে বুঝলেন পৃথিবীর মারপ্যাঁচ। ছাব্বিশজন অধ্যক্ষের অধীনে থেকে একদিন নিজেই হলেন অধ্যক্ষ। জীবনে সঞ্চিত উপকরণ নিয়ে কাগজ-কলমের সঙ্গে করলেন মিতালী।

এ লেখাটি হরিশংকর জলদাসের সৃষ্টির ভালো-মন্দ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ কোনো আলাপন নয়। বরং একজন অসহায় ব্যক্তি জলদাসের কম্পিত পায়ে নিজেকে জয় করার একটু বিবরণ মাত্র। অভাবে জীর্ণ একটি পরিবারে জন্ম তাঁর। বাংলাদেশে এমন অন্ধকার পরিবারে অনেকেরই জন্ম। কিন্তু আলোহীন থিকথিকে অন্ধকারে জন্ম নিয়ে ক’জন হতে পারেন একজন হরিশংকর জলদাস। ভাবনার মূল ভরকেন্দ্র মূলত সে দিকটিই। জীবনের শুরুতেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। একদিকে ছয় ভাইবোনের অভাবের সংসার। অন্যদিকে সামাজিক মানুষের প্রতি মুহূর্তে দংশন। যন্ত্রণার অনলে দিবানিশি পুড়েছেন। কিন্তু হাল ছাড়নেনি। কষ্টের পর কষ্ট তাঁর মনকে অস্থির করেছে। তবুও বেসামাল হননি। নিকটজনের উপকার করে কৃতঘ্ন আচরণ পেয়েছেন। তবুও কাত হননি। স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার শক্তিটা সহজাতভাবে লাগোয়া ছিল প্রাণে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল দাদি পরানেশ্বরীর কাছে পাওয়া না থামার শিক্ষা। অসংখ্য মানবের দেয়া লাঞ্ছনা কাঁটায় তাঁর হৃদয় রক্তাক্ত হয়েছে প্রতিনিয়ত। অসহ্য বেদনায় নীল হয়েছেন তিনি। মার খেয়েছেন প্রকৃতির হাতে তবুও থামেননি। তাঁর রচনাতে থেকে একটু উদ্ধৃত করছি :

বর্ষা আমাকে মুগ্ধ করেনি, কবি বানায়নি। বর্ষা আমাকে করেছে লাঞ্ছিত, রিক্ত। বর্ষা অবহেলার সন্তান আমি, আমার জীবনের তিরিশটি বছর বর্ষার কাছে জমা আছে। তারই খেয়ালখুশিতে আমার জীবনের এই দীর্ঘ সময় পরিচালিত হয়েছে। সে কখনো আমাকে সিক্ত করেছে, কখনো করেছে রিক্ত- একেবারে নিঃস্ব।

বাস্তববাদী ও সংবেদনশীল মানুষ হওয়ার কারণে, হৃদয়ের সুকোমল অনুভূতি জেগে ওঠে তাঁর। ফলে যন্ত্রণার তীব্রতা ‘ঊর্ধ্বশিখা জ্বালি চিত্তে অহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ’ রচনা করেছেন নিজের কথামালা। সৃজন ক্ষমতার সঙ্গে বক্ষে অপার বেদনা তাঁকে তাড়িত করেছে অলৌকিক আনন্দ বিলিয়ে দিতে। মজার কথা হলো বুকের মধ্যে যাপিত জীবনের বেদনা তাঁকে কলম ধরতে বাধ্য করেছে সামাজিক দায়বদ্ধতায়। এ ক্ষেত্রেও পথ আগলে ধরেছে হিংসুকেরা। ঠিক তখনই মানবিক ঔদার্যে, রুচির আভিজাত্যে, ন্যায়-অন্যায়ের কাণ্ডজ্ঞানে এবং প্রতিরোধের উত্তাপে হয়েছেন কর্তব্যকর্মে ইস্পাতসম কঠিন। যার ধারে এবং ভারে ভেঙে গেছে জীবন বাধার সবক’টি প্রাচীর।

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে জীবনাভিজ্ঞতায় অবগাহন করে, হয়ে উঠেছেন প্রাজ্ঞ নিষ্ঠাবান ও ক্লান্তহীন একজন কর্মবীর। থেকেছেন কর্মের সাধনায় একাগ্রচিত্ত। দীর্ঘ সময় নিজে জ্বলে-পুড়ে যখন আপনাকে চিনতে পারলেন, বুঝতে পারলেন নিজের শক্তি ও সম্ভাবনা। ঠিক তখনই শুরু করেন লিখতে। প্রাত্যহিক জীবনের স্পন্দন ছড়িয়ে পড়ে তাঁর লেখার প্রত্যেক বাক্যের প্রতিটি শব্দে। কল্পনার সুতোয় সে লেখা বুনিত নয়। বরং জীবনের ভেতর থেকে তা অস্থি-মজ্জা-সত্তাসহ বেড়ে উঠতে থাকে এবং যা সৃষ্টি করেন তার সবটাই মানব রসায়ন অভিযোজিত হয়ে প্রাতিস্বিক হয়ে যায়। আর এ ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি সৎ। জীবন ঘষে যে বিষ ওঠে, তিনি তাতে একবিন্দু অমৃত মিশান না। এক্ষেত্রে যা হওয়া উচিত তাই হয়ে যায় ষোলোআনা। এ এক ব্যতিক্রম পদক্ষেপ। বলতে সংকোচ নেই তিল পরিমাণ। তাঁর রচিত কৈবর্তকথা, আমার কর্ণফুলী ও জলগদ্য পড়লে মনে করুণ সুন্দর ভাব তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এ যেন

‘উম্মাদ পবনে যমুনা তর্জিত

ঘন ঘন গর্জিত মেহ।

দমকত বিদ্যুত পথতরু লুণ্ঠত

থরথর কম্পত দেহ।’

তিনটি গ্রন্থে একদিকে যেমন তাঁর মননের ছটা বিভাসিত হয়েছে, তেমনি তা গড়নের সুষমাতেও দ্যুতি ছড়িয়েছে। প্রতিটি প্রবন্ধের ভাবনাতে উঁকি দিয়েছে বুদ্ধি-দীপ্তির লাবণ্যের ঝিকমিক করা আলো। গ্রন্থগুলোর প্রবন্ধের প্রতিটি কথা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে যায়। লেখা ছোট। কিন্তু তার অর্থ গভীরতাস্পর্শী। কোথাও আবেগের বাতুলতা নেই। নেই কোনো জট-জটিলতা। নিরাসক্তি বজায় রেখে তা সমানে এগিয়েছে আপনাআপনি। অতিকথনের ফেনায়িত কোনো কম্পন নেই সেখানে। অন্তঃসলিলার মতো বয়ে চলা লেখাগুলো প্রত্যক্ষের মায়া দিয়ে পাঠকের বোধকে সতর্ক করে সর্বক্ষণ।

ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ঘাটে জলদাসের সঙ্গে দেখা হয়েছে বঞ্চনা আর অপমানের। অপমানের তীর্যক গভীরতা তাঁর চেতনা করেছে শাণিত। পারিপার্শ্বিক প্রতিক‚ল পরিবেশের যন্ত্রণা তাঁকে দীক্ষা দিয়েছে, ‘আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না’- কামনা। মানুষের নিরন্তর গঞ্জনা ভালো মানুষের কপালে পাওয়া ব্যাপার। সেক্ষেত্রে সহকর্মী থেকে সহমর্মীরা পর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে কথা বলেনি। চাকরিরত অবস্থায় বিভাগীয় প্রধান থেকে ছাত্রীর স্বামী পর্যন্ত তাঁকে একহাত দেখিয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তিনি নির্বাক থেকেছেন কঠিন সময়গুলোতে। শুধু মুখের হাসি টেনে শুভ্র আলো ছড়িয়েছেন। এ যেন ‘অন্ধকার উৎস হতে উৎসারিত সেই-ত তোমার আলো।’ কর্তব্যের খাতিরে নিকটজনের বিপদে কাছে গেছেন। দিয়েছেন কল্যাণের পেলব হাওয়া। বাড়িয়েছেন ভরসার হাত। তবুও তাদের সামান্য করুণার পরশ পাননি তিনি। উলটো কপালে জুটেছে অপমান। উত্তরে ¯িœগ্ধ হাসির মতো মমতা সিক্ত লেখায় যেন বলেছেন, ‘শান্তি কোথায় মোর তব হায় বিশ্বভুবন মাঝে, অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে।’ প্রতিদিনের গøানিময় জীবনে তাই হারেননি তিনি। কী চেতনায়? কী সংগ্রামে? কী বেদনায়? সব ক্ষেত্রে তাঁর মারের সাগর পাড়ি দেয়ার অনিঃশেষ অভিযান। অবাক করার বিষয় বিপদের ঘনঘটায় তিনি বিনয়ী বোধিস্বত্ব। আর তাঁর এ বিনয় কোনোভাবেই বৈষ্ণবের বিনয় নয়। বরং তা সর্বাংশেই বৌদ্ধিক। ঠিক এখানেই হরিশংকর জলদাস ব্যক্তি মানুষের একান্ত প্রাসঙ্গিক হয়েছেন। তাঁর বিদ্যা, সাহস, জ্ঞান ও প্রতিবাদী চেতনা থেকে আমরা প্রেরণা নিতে পারি। পারি বিপদের সময় কষ্টের সিঁড়ি ডিঙানোর সাহসটা সঞ্চয় করতে। অনাগত দিনে প্রতিটি সংগ্রামে সজীব থাকুন জলদাস। থাকুন সৃজনশীল সৃষ্টিতে সদাজাগ্রত প্রেরণার বাতিঘর হয়ে। এখন। এবং আরো অনেক এখন। সামনের দিনে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj