অশনি সংকেত : আলী ইমাম

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

যখন এ লেখাটি লিখছি তখন চারপাশের প্রকৃতিতে বিরাজ করছে ভয়ানক উত্তপ্ত অবস্থা। সমস্ত দেশের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে তীব্র তাপপ্রবাহ, পুড়ছে দেশ। অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। স্বাভাবিক জীবনের গতি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উত্তপ্ত পৃথিবীর বাসিন্দা এখন আমরা। এখন বায়ুপ্রবাহে আগুনের হলকা, যেন ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ^াস’। বুঝি বৃক্ষহীন মরুভূমির মাঝে অতিবাহিত হচ্ছে আমাদের ধূসর জীবন। আর আমাদের ক্লান্ত, বিমর্ষ করছে। চারপাশ থেকে অপসৃত হয়েছে সবুজ-শ্যামলিমার প্রসন্নতা। নির্বাক, নীল, নির্মম মহাকাশ। প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর অবস্থা পরিবেশবিদদের চিন্তিত করে তোলে। সমস্যার উৎস অনুসন্ধানে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরিবেশের এই ভয়াবহ দূষণের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে ব্যাপক আলোচিত গ্রিনহাউস ইফেক্টের কথা। আমাদের ভূখণ্ড একদা শ্যামল প্রকৃতিতে প্রসন্ন ছিল। উদ্ভিদের নিবিড় জগৎ প্রকৃতিকে ¯িœগ্ধ করে রেখেছিল। এখন জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত তীব্র সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত হচ্ছে আমাদের যাপিত জীবন। প্রকৃতি হয়েছে বৈরী। পরিবেশ হয়েছে রুক্ষ। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন এই সমস্যাকে প্রকট করেছে। আমরা আত্মবিনাশী আচরণ করেছি। এ যেন বৃক্ষের ওপরে নয়, নিজের পায়েই কুড়াল মারা হয়েছে। আমাদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের এই লেখার শিরোনামের বিবরণটি এখন উপহাসে পরিণত হয়েছে। বাতাস এখন তপ্ত নিঃশ্বাস। এই তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে আমরা আবার সেই বৃক্ষবন্দনায় নিবেদিত হতে চাই। অনুভব করতে চাই শ্যামলী নিসর্গকে।

বাংলাদেশের অপরূপ জলজ প্রকৃতির বর্ণনায় আমাদের লেখকেরা কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত আলী পানকৌড়িদের জীবন নিয়ে অপূর্ব ভাষায় কিশোর সাহিত্য রচনা করেছিলেন। এখন যখন বৈরী প্রকৃতির মুখোমুখি হয়েছি আমরা তখন এই সব রচনা আমাদের আবেগঘন করে তোলে। শওকত আলী ‘ডাক’ গল্পে এভাবে পাখিদের জীবনকে উপস্থাপিত করে আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করেন- ‘শরতের আকাশটা কী নীল এখন। চারপাশে অথৈ পানি টলমল করছে। পানির বুকে কখনো কখনো হাল্কা মেঘের ছায়া পড়ে। পুবের টলমলে অজ¯্র পানির ওপরে প্রকাণ্ড গোল থালার মতো সূর্যটা ওঠার অনেক আগেই কলরব শুরু হয়ে যায়। বিলের একেবারে ধারে, যেখানে পানা আর গুল্ম জাঁক হয়ে আছে, তার আড়াল থেকে আসে লম্বাগলা দীঘলি হাঁসের দল। গলা বাড়িয়ে বাড়িয়ে তারা চারপাশে দেখতে দেখতে জোড় পায়ে পানি কেটে কেটে এগিয়ে আসে অটল পানিতে। বালি হাঁসের ঝাঁক আসে আরো দেরিতে। দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর পর্যন্ত ওদের দেখা যায় না। যখন আসে, তখন গোটা বিলটাকে তোলপাড় করে ফেরে। সরালী হাঁসের শান্তসুবোধ ছেলেমেয়েরা দূর থেকে দেখে। ওদের রক্তের ভেতরে জাগে সাড়া। কিন্তু বেশিদূর উড়তে পারে না ওরা। ডানা ঝাপটে শূন্যে হাওয়ার ওপর উড়ে যায় কিছুদূর, তারপর আবার পানির বুকে নেমে পড়ে। বিলের পানি এখনো স্বচ্ছ হয়নি। বন্যার পানিতে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল সারা বিল। সেই পানি নেমে গিয়েছে ছোট ছোট নদীর খাল বেয়ে। কিন্তু পানির মধ্যে ঘোলাটে ভাবটা আছে। দূরের দেশের পাহাড়ি মাটির গন্ধ এখনো পানির মধ্যে মেশানো। পানি স্বচ্ছ হতে আর দেরি নেই। আকাশের ঠাণ্ডা হিম ঝরতে ক’দিন বা বাকি। কিন্তু কই, সেই হাঁসের দল কই? এখনো আসে না কেন তারা?’

পৃথিবীর চার প্রজাতির বিপন্ন পাখি স¤প্রতি এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সোনাদিয়া দ্বীপে পৃথিবীর দশ শতাংশ চামচঠুঁটো বাটান পাখি থাকে। ধলা শকুন ও মদনটাক পাখিগুলোকে এ দেশে দেখা যাওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশে পৃথিবীর যে তিনটি বিপন্ন পাখি এখনও টিকে আছে, তা হলো- ভুতিহাঁস, সবুজ পা প্যারাপাখি, নর্ডম্যান।

বিশ্বের চার প্রজাতির সংকটাপন্ন পাখি অতিস¤প্রতি আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। সেগুলো হলো বাদা তিতির, দেশি সারস, শতদাগি ঘাসপাখি ও কালা বুক টিয়াঠুঁটি। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি গাঙচষা। হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপের পুবে সদ্য জেগে ওঠা দমার চরে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশি গাঙচষার বাস। এখানে যদি এই পাখিরা টিকে না থাকে তাহলে তা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নিঝুম দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

সিলেটের হাওরাঞ্চলে দেখা যায় বিপন্ন কুড়াঈগল। এই পাখিটির প্রজননের জন্য এরচেয়ে উৎকৃষ্ট জলাভূমি সম্ভবত পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। বর্ষাকালে এই পাখিগুলো হাওর এলাকা ছেড়ে হিমালয় পর্বতমালা পেরিয়ে তিব্বতের হ্রদে যায়।

ইজারাদারদের কাছে বিল ছেড়ে দেয়াতে হাওর বেসিনের পরিবেশের অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে। হাওরের পানি সহিষ্ণু হিজল-করচ বন উজাড় হয়েছে। এর ফলে সেখানকার পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা বিদায় নিয়েছে। সিলেটের খাদিমনগরের জাতীয় উদ্যানে মুখপোড়া হনুমানের দেখা পাওয়া গেছে। এরা বাঁশঝাড়ে বেশি থাকে। আমাদের দেশের দুটি রামসার সাইট বুনো পাখি আর বন্য প্রাণীদের শেষ নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এর একটি হলো সুন্দরবন আর অপরটি টাঙ্গুয়ার হাওর। একটি হচ্ছে লোনাপানির বাদাবন। অপরটি মিষ্টি পানির হাওর। এই দুটি স্থানকে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পৃথিবীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমৃদ্ধ অঞ্চল বলে গণ্য করা যায়। আমাদের দেশের বিপন্ন পরিবেশ সুরক্ষার আন্দোলনে আরো অধিকতর সচেতন হওয়া আবশ্যক।

বিষয়টিকে নিয়ে বর্তমানে পরিবেশবিজ্ঞানীদের মাঝে কোনো ধরনের দ্বিমত আর নেই। বৈশ্বিক উষ্ণতায় জলবায়ুর ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। পরিবেশ ক্রমাগতভাবে দূষিত হয়ে বিপর্যয় ডেকে আনছে। পৃথিবী গ্রহটি হয়ে পড়েছে বিপন্ন। মানব সভ্যতা পড়েছে অস্তিত্ব সংকটের মুখে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের করাল গ্রাসে পতিত হয়ে পৃথিবী ক্রমশ সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে, যেন মহাসংকট আসছে ধেয়ে। তিল তিল করে গড়ে ওঠা সভ্যতা এখন বিলীন হওয়ার পথে। সা¤প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সিন্ধু সভ্যতা বিলুপ্ত হয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়ের দরুন। ওজোনস্তর সমস্যায় বাড়ছে পৃথিবীর উষ্ণতা। বাড়ছে বিপত্তি। বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পালিত হচ্ছে ওজোনস্তর দিবস।

জলবায়ুর পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় আমরা শঙ্কিত। এ যেন আমাদের বিপন্ন অস্তিত্বের ইঙ্গিত বহন করছে। অশনি সংকেত। মৌসুমি বায়ুর ছন্দ বিঘ্নিত হলে আমাদের মতো দেশের কৃষি অর্থনীতি বিপন্ন হয়। বিগত বছরগুলোর ঘটনা পরম্পরা থেকে অনুমিত হচ্ছে যে আবহাওয়া জগতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। উত্তাপ বৃদ্ধি পেয়েছে ভয়ঙ্করভাবে। বদলে গেছে বৃষ্টিপাতের ধরন, নদীগুলো যাচ্ছে মরে। মাটির নিচের পানিস্তর যাচ্ছে নেমে। মাটির নিচের ও উপরের পানির অনুপাত বদলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য আমাদের দেশটিকে মারাত্মক খেসারত দিতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছি। যেখানে আমাদের অস্তিত্বই বিলীন হওয়ার পথে, সেখানে আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে আরো বেশি করে কর্মপরিকল্পনা আশা করছি। বিষয়টিকে নিয়ে সহজতর আলোচনা করে তথ্যজ্ঞান প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকতর উদ্যোগী হওয়া কাম্য।

বৃক্ষ পরিচর্যায় স¤্রাট আশোক তার দ্বিতীয় গিরিশাসনে জানিয়েছেন, ‘যেখানে যেসব গাছ, ফলমূল নেই আমি তা অন্য জায়গা থেকে এনে লাগিয়েছি। পথের ধারে বৃক্ষরোপণ করিয়েছি। পশু ও মানুষের চিকিৎসার কাজে যেসব ভেষজ ঔষধি লাগে, তাও এনে লাগানো হয়েছে যেখানে নেই সেখানকার মাটিতে।’ এই উক্তি ছিল আড়াই হাজার বছর আগের। সেই শুভবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে বন সৃজিত হয়েছিল। আমরা সেই বনাঞ্চলের চরম বিনাশ করেছি। প্রকৃতিকে বৈরী করে তুলেছি। নিষ্ঠুর হয়ে প্রকৃতি তার শোধ নিয়েছে।

পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপরের ওজোনস্তর পাতলা হয়ে আসছে। কোথাও ফুটো হয়ে গেছে। ওজোনস্তর থাকার ফলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারে না। এই আলো এসে পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে জীবজগতের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। রেফ্রিজারেটরে ব্যবহৃত রাসায়নিক বস্তু। সিএফসি ওজোনস্তরকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ওজোনস্তর ফুটো হয়ে যাওয়াতে পৃথিবীর পরিবেশ এত বেশি উত্তপ্ত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, গত দুই শতাব্দীতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ছয় ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আবহাওয়াতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। শুধু গত চার দশকেই এর এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী এ শতাব্দীর শেষে সুমেরু অঞ্চলে স্থলভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে তিন থেকে পাঁচ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এর ফলে বরফ গলে প্লাবিত হবে সমুদ্র বা নদী উপক‚লবর্তী বেশ কিছু অঞ্চল। প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. ওয়ালেস ব্রোকার মন্তব্য করেছিলেন, আবহাওয়া যেন একটা ক্ষ্যাপা জন্তু। আর মানুষ তাকে ক্রমাগত খুঁচিয়ে চলছে একটা ছুঁচালো লাঠি দিয়ে। কিয়োটো চুক্তি অনুযায়ী কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা মিথেনের মতো কিছু গ্যাসের উৎপাদন কমানোর কথা পৃথিবীর সব দেশের। এই গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীর আবহাওয়াতে একটা আস্তরণ তৈরি করে। তার ফলে পৃথিবীর তাপ দূরাকাশে বিকীর্ণ হতে পারে না।

কিয়োটো প্রটোকল এখন অনেক উন্নত দেশই মানছে না। তারা পৃথিবী নামক গ্রহের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে ভাবছে না। তাদের আচরণ আত্মকেন্দ্রিক। বিশ্বায়নের সুযোগে বহু দেশ তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য পৃথিবীর বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলছে।

রবীন্দ্রনাথের লেখা বহুল আলোচিত ছোটগল্প ‘পোস্টমাস্টার’। এ গল্পে কলকাতা থেকে নতুন চাকরি নিয়ে পোস্টমাস্টার হয়ে আসেন উলাপুরের মতো এক অজ পাড়াগাঁয়। রবীন্দ্রনাথের লেখায় উলাপুরের সে প্রকৃতির বর্ণনা ছিল-

‘একদিন বর্ষাকালে মেঘমুক্ত দ্বিপ্রহরে ঈষৎ-তপ্ত সুকোমল বাতাস দিতেছিল, রৌদ্রে ভিজা ঘাস এবং গাছপালা হইতে একপ্রকার গন্ধ উত্থিত হইতেছিল, মনে হইতেছিল যেন ক্লান্ত ধরণীর উষ্ণ নিঃশ্বাস গায়ের উপরে আসিয়া লাগিতেছে এবং কোথাকার এক নাছোড়বান্দা পাখি তাহার একটা একটানা সুরের নালিশ সমস্ত দুপুরবেলা প্রকৃতির দরবারে অত্যন্ত করুণস্বরে বার বার আবৃত্তি করিতেছিল। পোস্টমাস্টারের হাতে কাজ ছিল না- সেদিনকার বৃষ্টিধৌত মসৃণ চিক্কন তরুপল্লবের হিল্লোল এবং পরাভূত বর্ষার ভগ্নাবশিষ্ট রৌদ্রশুভ্র স্তূপাকার মেঘস্তর বাস্তবিকই দেখিবার বিষয় ছিল… ..’

পৃথিবীর সা¤প্রতিক বৈরী পরিবেশের কারণ হিসেবে পরিবেশবিদরা দায়ী করছেন মাত্রাতিরিক্ত কার্বন যৌগের ব্যবহার, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে। মানুষের সৃষ্ট নানা কারণে এখন পরিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জীববৈচিত্র্য প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। মলিন বাতাসে, বিষণœ পরিবেশে কালাতিপাত করতে করতে আমরা এই সমস্যার ভয়াবহ রূপকে প্রত্যক্ষ করছি। এই তাপপ্রবাহ যেন মুক্ত, বিশুদ্ধ স্নিগ্ধ বাতাসকে অপসৃত করেছে। এখন শ্বাস নিতে কষ্ট। পরিশ্রæত পানি দুর্লভ হয়ে উঠছে। সঠিকভাবে বাতাস আর পানি পাওয়া না গেলে জীবন স্বাভাবিকভাবেই নিরানন্দ হয়ে ওঠে। আমরা এখন সেই নিরানন্দকাল অতিক্রম করছি। অবস্থান করছি বিমুখ প্রান্তরে। পার্থিব জগতের সবকিছুর মাঝে বাতাসের সঙ্গেই আমাদের সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক। বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে বাতাস এবং পানি। যার সরবরাহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে উদ্ভিদ জগতের তৈরি প্রতিবেশ ব্যবস্থা। আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে পানি আর বাতাস এই দুটো জড়বস্তুর ওপর। প্রসন্ন বাতাসকে ঘিরে প্রাণ সজীবতা পায়। প্রতিদিন পানি ও বাতাসের সঙ্গে জগৎ সংসারের সব প্রাণী এবং উদ্ভিদের আলিঙ্গন ঘটছে পরম বন্ধুর মতো। বাতাস নিয়ে আসছে ফুলের সৌরভ। পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণসত্তাকে জড়িয়ে রেখেছে বায়ুমণ্ডলের একটি পুরু চাদর। সেই পৃথিবী এখন প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত হচ্ছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড জমা হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে। সূর্যের আলো আমাদের পৃথিবীর তাপ বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবী সেই তাপকে বিকিরণ করে একটা সাম্য অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা অজ¯্র বর্জ্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও ধুলোবালি সেই বিকীর্ণ তাপের অনেকটাই ধরে রাখে। কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যত বেড়ে যাবে তার তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা তত বেড়ে চলবে, ফলে সমস্ত পথিবী আরো বেশি উষ্ণ হবে। এটাই গ্রিনহাউস ইফেক্ট। পৃথিবীতে আবহাওয়ার গতিবিধি খুবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণও দিনের পর দিন বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তিত হচ্ছে বায়ুপ্রবাহের পথনির্দেশ।

ধনী দেশগুলোর ভোগবিলাস সামগ্রীর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট যে সিএফসি ওজোনস্তরকে বিপন্ন করে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে তা এখন নৈতিকতার দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ। আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের খেসারত দিতে হচ্ছে অগুনতি মানুষকে। রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ বিষয়ক পরামর্শক সংস্থার প্রধান অধ্যাপক কেভিল ট্রেনবার্থ স¤প্রতি বলেছেন, পৃথিবীতে বেশ কয়েকটি জায়গায় হারিকেন ঘূর্ণিঝড়ের অন্যতম কারণ পৃথিবীর আবহাওয়া বদল। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিপদ অন্যরকম উপলব্ধির সৃষ্টি করছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিপদের জন্য মূল দোষী হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে কার্বনভুক্ত পদার্থের উপস্থিতি। পরিবেশ দূষণ হচ্ছে আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। সাধারণ মানুষও এখন পরিবেশ নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা করছে। বলা চলে করতে বাধ্য হচ্ছে। গ্রিনহাউস ইফেক্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে পৃিথবীর তাপমাত্রা। ওজোনস্তরের পর্দাকে প্রতিনিয়ত পাতলা করে চলেছে সিএফসি, যেন পৃথিবীর আকাশের পর্দা ফেটে চৌচির হতে চলেছে। নানা প্রক্রিয়ায় দূষিত হচ্ছে নরম মাটি, নদী-নালা, সাগরের পানি, বায়ুপ্রবাহ।

এখন তাই আর্তকণ্ঠে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে-

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু

নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ।

তুমি কি বেসেছ ভালো?

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj