এক বোকা বুড়োর গল্প শোনো : প্রত্যুষ শংকর

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

বাবাকে নিয়ে লেখার ভার পড়েছে আমার ওপর। জানি, সবাই বলবেন- এ আর এমন কী! পিতাকে নিয়ে লিখতে তো কোনো পুত্রের কষ্ট হওয়ার কথা নয়! (যদি সে লিখতে জানে) কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা অতো সহজ নয়। আপনি পাঁচদিন ভুটান বা সপ্তাহখানেক থাইল্যান্ড বেড়িয়ে এসে, তা নিয়ে লেখা সহজ। কারণ সেই ভ্রমণ আপনার নিস্তরঙ্গ জীবনে একটা বড় না হোক, অন্তত মাঝারি ধাক্কা। আপনার একঘেয়ে বাঙালি জীবনে মুহূর্তের অবাঙালি স্পর্শ। সে স্পর্শের প্রতিটি আঙুল আলাদা আলাদা করে মনে থাকে, সে স্পর্শের প্রতিটি শিহরণ আলাদা আলাদাভাবে বর্ণনা করা যায়। কিন্তু যে বাতাস আপনাকে সব সময় ঘিরে-বেড়ে আছে, হঠাৎ যদি কেউ বলে ‘দেখি বাপু, সেই বাতাস নিয়েই লিখে দাও পৃষ্ঠা চারেক’ তাহলেই তো মুশকিল। এই বাতাসে আমি বেঁচে ছিলাম, বেঁচে আছি এবং বেড়ে উঠছি। কিন্তু আলাদা করে তার অবস্থান-অবদান নিয়ে তো কখনো ভাবিনি। তাহলে? কী লেখা যায় তাকে নিয়ে!

আমার বাতাসের নাম হরিশংকর জলদাস। হরিশংকর আমার জীবনে ঘা যুক্ত চামড়ায় এন্টিসেপটিক মলম যেমন- তার চেয়েও অপরিহার্য, সদ্য বাবা হওয়া কারো কাছে নবজাতকের হাসি যেমন- তার চেয়েও প্রিয়, খারাপ প্রস্তুতিতে পরীক্ষা দিতে যাওয়া ছাত্র এবং অনুশোচিত ও ধর্মভীরু পাপীর কাছে ঈশ^রের কৃপা যেমন- তার চেয়েও প্রার্থিত। তাই তাকে নিয়ে নিরপেক্ষ কিছু লেখা কি আমার পক্ষে সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়ও, আমি মানুষের সামনে কেন খুলব তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসার ঝাঁপি? আমার অভিযোগের আঙুলটিও বা তাঁর দিকে কেন উঠবে প্রকাশ্যে? আর আঠাশ বছরের স্মৃতি কি কয়েক পৃষ্ঠায় বর্ণনা করা সম্ভব? পরে ভাবলাম- ক্ষতি কী! সব গল্প বলা না হোক, অন্তত গল্প বলার শুরুটা তো হবে।

কবি বলেছেন-

‘জীবন প্রসব করে চলাই জীবন,

শুধু যোগ-বিয়োগের খেলাই জীবন।’

হরিশংকর আমাকে শুধু জন্ম দিয়েই ক্ষান্তি দেননি, বছরের পর বছর ধরে আমাকে ‘জন্ম নিতে’ সাহায্য করেছেন। কোকিলের ছানার মতো শুধু আমার চোখই ফোটাননি, ঈগলের মতো তীক্ষè দৃষ্টিতে দেখতেও শিখিয়েছেন। আমার শরীরের ‘ু ক্রোমোসোম’ থেকে শুরু করে আমার মনের সাম্যবাদের মন্ত্র- সবই পেয়েছি তার কাছ থেকেই।

উত্তর পতেঙ্গা জেলেপাড়ার থিকথিকে কালো কাদা মাড়িয়ে, নিভু নিভু চেরাগের আলোয় লেখাপড়া করে, জীর্ণ ছালার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যুধিষ্ঠিরের ছেলে হরিশংকর কীভাবে পশ্চিমের সমুদ্রকে পেছনে রেখে পূবের সূর্যের পথে যাত্রা করলেন, অশিক্ষিত প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে এসে কীভাবে শিক্ষা ও সাহিত্যের কেন্দ্রে স্থান করে নিলেন, হলেন জনপ্রিয় শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক, নিজে জলদাস পদবি রেখে এবং সন্তানদের নামে জলদাস পদবি না রেখে ও জেলে পরিচয়ের জন্য সন্তানদের গর্ববোধ করতে শিখিয়ে কীভাবে বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন- সেসব গল্প শোনাবেন অন্যরা, হরিশংকর নিজেও শুনিয়েছেন তাঁর বিভিন্ন লেখায়। আমি সেদিকে না যাই, আমার লেখার বিষয়তো ‘বাবা হরিশংকর’।

বাবা ফেসবুক ব্যবহার করেন না। তাই বাবার অনেক ভক্ত আমাকে নক দিয়ে বাবা সম্পর্কে জানতে চান। বলা বাহুল্য, তাঁদের মধ্যে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাবা কীভাবে কথা বলেন, কী খেতে পছন্দ করেন, কীভাবে লেখালেখি করেন- এমন হাজারো প্রশ্ন। আমি বোঝানোর চেষ্টা করি, বাবা একান্তই মাটিলগ্ন জীবনযাপন করেন। অন্য দশজনের মতো খান, ঘুমান। এই বয়সেও তীব্র উত্তেজনা নিয়ে ও হইহুল্লোড় করে টিভিতে রেসলিং দেখেন। ভালো খাবার খেতে পেলে বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে ওঠেন। টুথপেস্ট শেষ হয়ে এলে প্যাকেটের নিচ থেকে টিপে এনে বের করা সামান্য টুথপেস্ট দিয়েই দাঁত মাজেন। কোনো অনুষ্ঠান কাছে এলে তাঁর মাথার অবশিষ্ট চুলগুলোতে আমাকে দিয়ে কলপ লাগিয়ে নেন। বছর দুয়ে নিজের কেনা গাড়িতে চড়ার পরও রাস্তায় পায়ে হেঁটে বেড়াতে বা রিকশায় চড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবে না গিয়ে নিজের জন্মভিটায় গিয়ে ভাইদের সঙ্গে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করেন। হ্যাঁ, তবে একটা ব্যতিক্রম আছে। বাবার কথা বলা। বাবা যে ভাষায় লেখেন, সে ভাষাতেই কথা বলেন। আমরা সেই সাহিত্যিক ভাষাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও বাইরের মানুষজন যখন শোনে বাবা আমাকে বলছেন- ‘এই ব্যাপারটাতে আমি দ্বিধান্বিত, তোমার মতামত কী?’ অথবা ‘অমুকের দুর্ব্যবহার দেখে আমি খুব ক্লান্ত বোধ করেছি’ বা ‘অমুকের উদ্ধত কথা আমাকে বিপন্ন করেছেন’- তখন তারা অবাকও হয়, মজাও পায়।

সেই যে ১৯৯৫ সালে বাবার হাত ধরে প্রথম স্কুলে গিয়েছিলাম, আজ এত বড় হয়ে যাওয়ার পরও যে কোনো পরীক্ষায় বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যাই। এখন আর বাবার হাত ধরে রাখি না, কিন্তু আমার মনের হাতটা ঠিকই বাবার লোমশ হাতটাকে আঁকড়ে ধরে রাখে। আমাদের বাসায় কেউ প্রথমবারের মতো এলে খুব অবাক হয়। প্রতিটি রুমে বইয়ের ছড়াছড়ি। দেয়ালে বই, মেঝেতে বই, টেবিলে বই, বিছানাতে বই। আমি বেড়ে উঠেছি বইয়ের মাঝে। বাবা আমাকে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রকে চিনিয়েছেন, চিনিয়েছেন ভূপেন হাজারিকা-রাহুল দেব বর্মণকেও একের পর এক বই এগিয়ে দিয়েছেন আমার দিকে, একের পর এক গান দিয়ে ভরেছেন আমার কান। ধর্মীয় স্বাধীনতাটা খুব করে পেয়েছি বাবার কাছে। ধর্মচর্চার দিকে নয়, তিনি আমাকে ঝুঁকিয়েছেন ধর্মবিষয়ক জ্ঞানার্জনের দিকে। কলেজে ওঠার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন আমার গৃহশিক্ষক, কলেজে ওঠার পর তিনি হলেন আমার জীবনশিক্ষক।

নিতান্ত অগোছালো প্রত্যুষের অগোছালো স্বভাবে বিরক্ত হরিশংকর অত্যন্ত গোছানো একজন মানুষ। একজনের আয় দিয়ে চারজনের সংসার চালালেও আমাদের কখনো টানাটানির মধ্যে পড়তে হয়নি তার পরিকল্পিত জীবনযাপন এবং গোছানো স্বভাবের জন্য। হরিশংকর চাইতেন, হাজার বছরের বঞ্চনা আর অশিক্ষার জন্য জেলেদের মধ্যে যে সংকীর্ণতা ও অন্ধকার জমে আছে, তাঁর সন্তানরা সেই অন্ধকারকে দূরে ঠেলে আলোতে পা রাখুক। ‘মনের গোপন ঘরে, যে শ^াপদ বাস করে’- তাকে তিনি নিজে যতটা না দমানোর চেষ্টা করেছেন, তার চেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন আমাদের সেই শ^াপদমুক্ত রাখতে।

আমি ছোটবেলা থেকে সব সময়ই একটি শান্তিপূর্ণ পারিবরিক পরিবেশ পেয়েছি- এ কথা বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু দাম্পত্য কলহের প্রভাব সন্তানদের ওপর যাতে না পড়ে, সে ব্যাপারে হরিশংকরের চেষ্টা ছিল যথাসাধ্য।

কেবল হরিশংকরই প্রত্যুষ শংকরকে জন্ম নিতে ও বেড়ে উঠতে দেখেননি, প্রত্যুষ শংকরও দেখেছে লেখক হরিশংকরকে জন্মাতে ও বেড়ে উঠতে। লেখক হরিশংকর এখন সতেরো বছরের তরুণ। তাঁর জন্মলগ্নে আমার বুঝার বয়স হওয়াতে আমি এই অসাধারণ যাত্রার পুরোটারই সাক্ষী। হরিশংকর একদিকে যেমন পেয়েছেন সাহিত্যবোদ্ধাদের প্রশংসা ও ¯েœহ, অন্যদিকে তেমন পেয়েছেন সাধারণ পাঠকদের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা। এ দুটো জিনিস একই সঙ্গে জীবদ্দশায় পাওয়া যে কোনো লেখকের জন্যই ভাগ্যের ব্যাপার। এই অল্প বয়সী লেখক জীবনেই তিনি পেয়েছেন সম্ভাব্য প্রায় সব সাহিত্য পুরস্কার। আমি এই সতেরো বছর বয়সী লেখক হরিশংকরকে জন্ম নিতে দেখেছি, জন্মলগ্নেই সবার প্রিয়পাত্র হতে দেখেছি, দ্রুত বেড়ে উঠতে দেখেছি। জেলে জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘জলপুত্র’, ‘দহনকাল’, মেথরদের নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘রামগোলাম’, পতিাদের নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘কসবি’সহ প্রান্তজনদের নিয়ে তাঁর লেখা মুগ্ধতা নিয়ে পড়েছি। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীকে নিয়ে লেখা ভিন্নধর্মী উপন্যাস ‘আমি মৃণালিনী নই’, হিন্দু মিথোলজি বেইজড উপন্যাস ‘একলব্য’, ‘সেই আমি নই আমি’, ঐতিহাসিক উপকরণসমৃদ্ধ উপন্যাস ‘মোহনা’ লিখতে উৎসাহ দিয়েছি। প্রকাশকদের চাপে পড়ে প্রেমের উপন্যাস লেখার কারণে বকাঝকা করেছি। গল্পের বইগুলোর মধ্যে আবিষ্কার করেছি শক্তিশালী এক গল্পকারকে, দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমিই বাবার সব বইয়ের পণ্ডুলিপির প্রথম পাঠক।

বর্ণবাদীদের অপমানের জবাব দেয়ার জন্য কীভাবে তিনি জেলেদের নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন, জেলেজীবন নিয়ে মানিক-অদ্বৈতদের উপন্যাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি নিজেই কীভাবে উপন্যাস সাহিত্যে পা রাখলেন, ‘সমুদ্রভিত্তিক জেলেজীবন’ নিয়ে লেখা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাসে কীভাবে তিনি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ ঘটালেন, ‘রামগোলাম’ উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি কীভাবে দিনের পর দিন মেথরপাড়ায় সময় কাটিয়ে মেথরদের জীবন কাছ থেকে দেখলেন ও যাপন করলেন, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসার পাশাপাশি কীভাবে কিছু বর্ণান্ধ মানুষের কটাক্ষের শিকার হলেন- সেসব গল্প আরেকদিনের জন্য তোলা থাকল। শুধু বলব ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র হারু ঘোষ আকাশের দেবতার কটাক্ষ থেকে রক্ষা না পেলেও হরিশংকর মর্ত্যরে মানুষের কটাক্ষ অতিক্রম করে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। রামগোলামের কথা ওঠাতে একটি ঘটনা মনে পড়ল- কয়েক বছর আগের কথা। আমি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র। দুর্গাপূজা চলছে। রোজার ঈদও মাত্র গেল। আমি আর বাবা রিকশা করে সদরঘাট গেছি। আমরা নামার পর রিকশাওয়ালা ঠিক করা ভাড়ার দ্বিগুণ দাবি করে বসল। বাবা ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন। রিকশাওয়ালা তাও মানবে না, তাকে দ্বিগুণ ভাড়াই দিতে হবে। বলল- ‘ঈদর সমত ভাড়া বাইয়া নো দিলে ক্যানতে?’ বাবা বললেন, ‘আমরা তো মুসলিম না, আর তুমি তো বাড়িয়ে না, দ্বিগুণ ভাড়া চাচ্ছো’। রিকশাওয়ালা বলল ‘মুসলমান নো অইলে হিন্দু তো, পূজার লাই ভাড়া বাড়াই দওন’। বাবা বললেন, ‘আমরা হিন্দুও না।’ এবার রিকশাওয়ালা একটু থতমত খেয়ে গেল। বললো- ‘তইলে অওনরা কী?’ বাবা বললেন, ‘আমরা মেথর’। রিকশাওয়ালার চোখ বিস্ফারিত, মুখে তালা, আমরা হাঁটা দিলাম। কিছুদূর গিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি রিকশাওয়ালা তার কাঁধের গামছা দিয়ে বসার সিটটি ঘষে ঘষে মুছছে।

আমার দাদা-বাবা-কাকারা সবাই ভীষণ রাগী। বংশ পরম্পরায় পাওয়া বাবার সেই রাগের তীব্র আঁচ সময়ে অসময়ে আমাদের ওপর এসে পড়েছে। ছোট থাকতে বাবা বাইরে থেকে এসেছে টের পেলেই তাড়াতাড়ি টিভি বন্ধ করে পড়ার টেবিলে বসে যেতাম। বাবার গলা শুনলেই বুক কেঁপে উঠত। ছোটবেলায় ভীষণ ভয় পেতাম বাবাকে। এখনো কি পাই না?

বদমেজাজি হওয়ার পাশাপাশি হরিশংকর ভীষণ আবেগপ্রবণ। খুব দ্রুতই কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। দু’একটি ঘটনাতেই অকারণে একজনকে ভালোবেসে ফেলেন, আবার সামান্য কারণে কাউকে ফেলে দেন বাতিলের খাতায়। তাঁর এই মানবীয় দুর্বলতাগুলোর কুফল ভোগ করতে হয়েছে আমাকেও। দুটো ঘটনা উল্লেখ করি-

আমি তখন অনেক ছোট। হয়তো থ্রি-ফোরে পড়ি। এক দুপুরে বাবা কী একটা কাজে বের হবেন। আমাকে বললেন ছাদে শুকাতে দেয়া তাঁর নীল গেঞ্জিটা নিয়ে আসতে। ছাদে গিয়ে আমি পাশের বাসার এক দিদিকে পেয়ে গল্পে মেতে উঠলাম। কী কাজে এসেছিলাম তাই মাথা থেকে ছুটে গেল। অনেকক্ষণ পর বাবা ছাদে উঠে এসে গেঞ্জি ও আমাকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন এবং বেত দিয়ে আমাকে বেধড়ক পেটালেন। আমার পুরো শরীর ফুলে উঠেছিল। পিঠ কেটে পিটের চামড়া গেছিল শক্ত হয়ে। সেই মারের কিছু চিহ্ন আজো আমার পিঠে রয়ে গেছে। পরের ঘটনাটা যখনকার, তখন আমি মার খাওয়ার বয়স পেরিয়ে এসেছি অনেকদিন। ডাক্তারি পাস করে ফেলেছি। ঢাকায় এক লেখকের বাড়িতে আমাদের পারিবারিক নিমন্ত্রণ। আমরা খেতে বসেছি। লেখকের বড় ছেলে রান্নাঘর থেকে লেখকের পুত্রবধূকে ভাতের প্লেট, তরকারির বাটি এগিয়ে দিচ্ছেন। হঠাৎ বাবা সবার সামনে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন- ‘দেখো দাদার ছেলে সাংসারিক কাজে কত সাহায্য করছে, কত দায়িত্ববান ছেলে! তোমার মধ্যে তো এসবের ছিটেফোঁটা নেই।’ আমাদের আমন্ত্রণকারী লেখক সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বললেন- ‘না না, এভাবে কখনো একজনের সঙ্গে আরেকজনের তুলনা করবেন না।’ কিন্তু অপমানে ও কষ্টে আমার গলা দিয়ে সেদিন ভাত নামেনি। মানুষ অনেক সময় আগপিছ না ভেবেই অনেককিছু বলে ফেলে। কিন্তু পিতা-মাতার প্রকাশ্যে দেয়া অযোগ্যতার সার্টিফিকেট সন্তানের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সে ব্যাপারে অনেক সাধারণ পিতার মতো হরিশংকরও অনেক সময়ই থেকেছেন উদাসীন। হয়তো এগুলো জীবনেরই অংশ বা এই ভুলগুলোও সাধারণ মানুষ সচরাচর করে থাকে।

আমি সব সময় আমার বাবার মতো হতে চেয়েছি। তিনি যেভাবে কথা বলেন, সেভাবে বলতে চেয়েছি। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে চেয়েছি। যেখানেই গেছি, সব জায়গাতেই তাঁকে সম্মানিত হতে দেখে গর্ববোধ করেছি। কোনো একদিন তাঁর মতো করে লেখার স্বপ্ন দেখেছি। সব পুত্রের কাছেই তার পিতা আজীবনের অথবা অন্তত জীবনের কোনো একটি সময়ের ‘আইডল’। কিন্তু হরিশংকর আমার কাছে তার চাইতেও বেশি কিছু। তিনি আমার নামের অংশ (শংকর)। অংশ আমার অস্তিত্বের, স্বপ্নের এবং ভালোবাসার।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj