জলদাসীর গল্প >> যার ভুবনজুড়ে মানুষ : ইলিয়াস বাবর

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

জলদাসীর গল্প- হরিশংকর জলদাস-এর প্রথম গল্পগ্রন্থ। দশটি গল্পের এ সংকলনে মোটাদাগে জেলেসমাজকেই আমরা পাঠ করি বিশেষভাবে। সেই সাথে জেলেসমাজ সংশ্লিষ্ট অন্য মানুষজনকেও দেখে উঠতে হয় পাঠকদের। প্রথম গল্প ‘কোটনা’- ক্ষীরমোহন আর অশোকের বন্ধুত্বের গল্প। একজন জেলের ছেলে, অন্যজন মুচির। দুজনেই সমাজের তথাকথিত প্রথায় একেবারে নিচের দিকের। তাদের পড়াশোনায় অধিকার কে যেন রহিত করেছে অদৃশ্যভাবে। হয়তো এজন্যই শিখিয়ে দেয়া বুলিতে অথবা সংস্কারের ফাঁদে পড়ে প্রধান শিক্ষক কেমনে বলেন- ‘এত ছোট ছেলেটারে স্কুলে ভর্তি করিয়ে কী করবি?’ মুচি আর জেলের ছেলের বন্ধুত্ব দিনদিন গাঢ় হয়, ক্লাসের শেষ বেঞ্চে হয় তাদের স্থান। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে জেলের ছেলে ক্ষীরমোহন দারুণ রেজাল্ট করে। যে কিনা ক্লাসে অনিয়মিত, শিক্ষকদের কাছে নিয়মিত শুনতে হয় বকাঝকা। প্রবাদে যেমন বলে- ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা।’ জীবনেরই অকল্পনীয় পথে একদিন হারিয়ে যায় ক্ষীরমোহন। অশোক চৌধুরী চাকরি নেয় শিক্ষকতার। জীবনের ব্যস্ততায়, হতে পারে পার্থিবতার নানান চাহিদায় হেরে গিয়ে ভুলে যায় চেনা মানুষের মুখ, আপনজন হয়ে যায় দূরের কেউ। নাড়ির টানে ঘরে বেড়াতে আসা অশোক চৌধুরী (যার পিতা মুচি হলেও ছেলের বংশীয় পদবির বদলে যোগ করেছিল চৌধুরী!) দেখা পায় তারই বাল্যবন্ধু ক্ষীরমোহনের। কৈশোরের কেউ নিজের মাকে অন্যের সাথে ঘুমাতে দেখলে খারাপ লাগারই কথা, ক্ষীরমোহন সহ্য করতে পারেনি মায়ের এমন আচরণ। সে জন্মগ্রাম ত্যাগ করে চলে যায় চেনাজানা মানুষদের আড়ালে। এবং বন্ধু অশোকের সাথে দেখা হবার পরেই উচ্চারণ করে গোপন অথচ গূঢ় সত্য- ‘বেশ্যার পোলার কোটনা হওয়াই তো স্বাভাবিক।’ জেলে সমাজের নিয়তির সাথে যোগ হতে থাকে বাস্তবতার নির্মম চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বভাবতই বাঙালি জাতির সংশ্লেষ ছিল চোখে পড়ার মতো, সমাজের উঁচু স্তর থেকে নিচু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে উপজাতি। আমরা বিস্মৃত হয়ে যাই অনেকেরই অবদানের কথা, ত্যাগের কথা। ‘দইজ্যা বুইজ্যা’ গল্পে পারুলবালার ধর্ষিত হবার মাধ্যমে গল্পকার আমাদের নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে প্রান্তিকজনের কাছে। এ দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় কীভাবে আমাদের মা-বোন ধর্ষিত হয়েছে এবং প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে বাড়িঘর জে¦লেপুড়ে দিয়েছে। জেলেরা তথাকথিত জাতপ্রথায় অবস্থান করে সর্বশেষ স্তরে। গল্পে দেখা যাক- ‘মধ্য একাত্তরে এই জেলেপাড়াটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পশ্চিমের বেড়িবাঁধে ও দক্ষিণের বিরানভূমিতে পাকিস্তানি সেনারা আস্তানা গাড়ে। অনেক আগে থেকেই উত্তরে নৌবাহিনী আর পূর্ব বিমানবাহিনীর ঘাঁটি ছিল। দেশে আগুন জ¦ললে হিন্দুরা এধার ওধার চলে যায়। থেকে যায় শুধু জেলেরা।’ জেলেরা পায় না আশ্রয়, পায় না সম্মান। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে তাদের কপালে জুটে না প্রশিক্ষণ অথচ জলের অপারেশনে ভরসা বলতে জেলে আর জেলেদের নৌকা। সর্বস্ব ত্যাগের পরেও কেউবা পরামর্শ দেয়- ‘চুপ গর, অ বদ্দি চুপ গর। কলঙ্কর কথা বিলাপ গরি আর নো ফুনাইও। হিন্দু-মুসলমানে জাইনল্যে কলঙ্ক আরো বাড়িবো।’ একাত্তরের আগুন-সময়টা এমনই ছিল। সর্বহারা অথচ কাউকে বলার জো নেই, আমরা হারিয়েছি! এরপরেও রাগে-ক্ষোভে দইজ্যা বুইজ্যা প্রতিরোধের সবটুকু উগরে দিয়ে সামনের দিকে যায়- ‘তোরার মারে চুদিরে, খানকির পোয়া অক্কল।’ খতম করে দেয় মোর্শেদকে। কিছুক্ষণের মধ্যে জ¦লে ওঠে জেলেপাড়াটি। ‘একজন জলদাসীর গল্প’ জুড়েও একইভাবে শুনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্যাগের বারোমাসি। পোয়াতি বউ অথচ জগৎহরি জলদাস বউয়ের কথাকে এক প্রকার ফিরিয়ে দিয়ে বলে- ‘বাধা নো দিও। এ-ই যাইয়ম আর আইস্যম।’ সেই রাতের অপারেশনে মারা পড়ে জগৎহরি জলদাসসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়, দেশ স্বাধীন হয়ে যায় ফিরে আসে না জগৎহরি, অপেক্ষা কমে না সরলবালার। সময় যায় অথচ সরবালার দৃঢ় বিশ^াস ‘পোলার বাপ বাঁচি আছে।’ মাঝির ঘাটে অপেক্ষায় কাটে তার আমৃত্যু। এক সময় জগতের নিয়মে মারা যায় সরলবালা। গল্পের কথক কামনা করে ‘স্বর্গে হলেও সরলা যাতে জগৎহরির সাক্ষাৎ পায়।’

‘মোহনা’ গল্পে ইতিহাসকে পাঠ করি গল্পের আড়ালে। ভীম, দিব্যোক প্রমুখ বাঙালির জেলে-নায়কদের নিয়ে এ গল্পে শেষ পর্যন্ত ভীমকে আবিষ্কার করি বিশ^াসঘাতক হিসেবে। যুদ্ধ-হত্যা-খুনের সাথে গল্পে একাকার হয়ে যায় জাতিগত ইতিহাসের সারাৎসার। পতিতাপল্লীর মোহনার শরীরে ভীমের শান্তি-আহরণ, তাদের এ বিষয়ক সংস্কারকে গভীর পাঠের মাধ্যমে হরিশংকর জলদাস আমাদের মুখোমুখি করে অতীতের সাথে বর্তমানের। কৈবর্ত সম্প্রদায়ের গৌরব ¤øান করার পাঁয়তারা সেইসাথে বিজিত পক্ষের পতিতাপল্লী উচ্ছেদের সাথে জড়িত মোহনাদের ভাগ্যরেখাকেই মিলিয়ে দেয় গল্পকার। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মোহনা থেকে যায় তার স্থানে, রাতে আসে ভীম। রথিভোগে তৃপ্ত ভীম যখন চলে যেতে উদ্যত পেছন থেকে মোহনা বঁটির আঘাতে ভূপাতিত করে। ‘উন্মাদিনীর মতো হেসে উঠেছিল মোহনা- খিল খিল খিল খিল।’ মূলত বিশ^াসঘাতকদের শেষ পরিণতির ব্যাপারটাই গল্পকার হরিশংকর জলদাস গল্পের মোরাল হিসেবে দেখিয়ে দেন। জেলে সমাজের ইতিহাস, ভেতরকার কুটিলতা, সম্ভাবনার বীজ সবটাই জানা আছে হরিশংকর জলদাসের, ফলে তিনি জানাশোনার ভেতরেই নিরন্তর হেঁটে যান শিল্পীর আনন্দে।

‘সুবিমলবাবু’ গল্পটিতে একজন জাতগোত্রদম্ভধারী সুবিমল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে। তিনি কলেজ শিক্ষক। বদলির চাকরি বলে, বিভিন্ন স্থানে দিনযাপন করতে হয় তাকে। তার গোত্রদম্ভ এমনই, বয়েসের বাড়াবাড়িতেও বিয়ে-থা করেননি, বোন দুটিকেও বিয়ে দেয়নি। শিক্ষকজীবনের নানা ফ্যাসাদ, নানান অভিজ্ঞতা স্বয়ং গল্পকারেরও আছে ফলে তার বর্ণনায় আছে বাস্তবতার দারুণ ছবি। যে কারো হাতের রান্না তিনি খাবেন না, যে কারো বাসায় তিনি যাবেন না- কিন্তু শরীরের বেদিশার সময়ে ঠিকই মেসবাসী তিন শিক্ষক শুশ্রƒষা করেন, ডাক্তার ডেকে আনেন, ভেজা গামছা দিয়ে হাত-পা মুছে দেন। আসলে গ্রোত্রদম্ভের আত্মরম্ভিভাবকে গল্পকার পরাজয় করেই ছাড়েন শরীরের তাড়না দিয়ে। গোপন হোক, মৌলিক চাহিদাকে এড়িয়ে যেতে পারে কোন পুরুষ! সুবিমলবাবুও পারেন না। জ¦রের সময় জলদাসীর মেয়ের হাতেই রান্না খেতে হয় তাকে। ভেতরকার তাড়নাকে নিভৃত করতে তার প্রয়োজন পড়ে কাজের মালতি জলদাসই। গাইগুই শোনেন না সুবিমলবাবু। এক সময় বাইরেই আসে সেই শিৎকার- ‘ক-উ-উ, কু-উ-উ।’ ‘দুলারী এবং কয়েকজন’ গল্পটিও এক কলেজ শিক্ষককে নিয়ে। বদলিজনিত কারণে তিনি বাসা নেন পাথরঘাটায়। স্ত্রী-সন্তান নিয়েই তার নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। চট্টগ্রামের প্রাকৃতির সাথে বেশ মানিয়ে নেন অধ্যাপক, তার স্ত্রী-সন্তান। বিপত্তি বাধে এক পাগলীকে নিয়ে। রাতে অধ্যাপকেরই ভাড়া বাসার গেটে দেখতে পায় দুলারীকে, তার সন্তানসমেত। একজন শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ হিসেবে প্রতিবাদ করতে যাবে, তার ফল হলো উল্টো। বাসা ছাড়তে হয় অধ্যাপককে। গার্মেন্টেসে চাকরি করা দুলারি, তার প্রতারিত হবার করুণ ইতিহাস গল্পকার ফ্ল্যাশব্যাকে জানিয়ে দেয় পাঠককে। সাথে যোগ হয় এলাকার রাজনৈতিক নেতা- যারা কিনা রাতের আঁধারে ভোগ করে পাগলী দুলারীই শরীর। সে নিজেও সন্তুষ্ট! পেটের দায়ে সে অসহায়, সন্তানদের ক্ষুধায় কেঁদে ওঠে তার মাতৃহৃদয়। অধ্যাপক বাসা বদল করার সময় ‘মাগির পাওয়ার অনেক’ শুনে নিজের ভেতরেই কুকড়ে যায়। কতটা অসহায়, কতটা বিভাজিত এই সমাজ তা-ই ‘দুলারি এবং কয়েকজন’ গল্পে ফুটে ওঠে চমৎকারভাবে।

কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস তার কথাসাহিত্যের ভাঁজে ভাঁজে তুলে আনেন সমাজের বিভিন্ন ক্লেদ, বিবমিষা। তার সাহিত্যের আরো একটি মজার বিষয়, তিনি সাবলীলভাবেই প্রয়োগ করেন চট্টগ্রামের দুর্বোধ্য আঞ্চলিক ভাষা। ভাষার প্রয়োগিক ক্ষমতায় গল্পকার সহজভাবেই মানিয়ে নিতে পারেন আঞ্চলিক টোন। তাতে স্থানিক গুরুত্বের সাথে বেড়ে যায় গল্পের বিশ^স্ততা। গালি ব্যবহারে- যা সহজেই ব্যবহৃত হয় জেলেসমাজে তা শুনতে পাই জেলেসমাজের পটভূমিতে রচিত গল্পের শরীরে। ‘জলদাসীর গল্প’ গল্পকিতাবে সংযুক্ত প্রায় সব গল্পই আমাদের পাশের, পরিচিত, ভেংচি কাটা; হয়তো আমাদেরই অগোচরে পড়ে ছিল অনাদরে। হরিশংকর জলদাসের ক্রেডিট মূলত এখানেই। তা ছাড়া জেলেসমাজের ক্লেদজের সাথে ইতিবাচকতায় একটু হলেও আলো ফেলতে পারতেন গল্পকার। জেলেসমাজ মানেই ভাবীর সাথে দেবরের পরকীয়া, জেলেসমাজ মানেই অন্যের বউয়ের সাথে রাত কাটানো এমনটিই শুধু নয়। দুঃখের রং এক, সুখের আনন্দ এক সমাজের ভিন্নতা, পার্থক্য সত্ত্বেও, তা বোঝা আমাদের দরকারও দায়ের মধ্যেও পড়ে। হরিশংকর জলদাস গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন কথাকার ফলে তিনি বিস্মৃত হন না বাস্তবতায়; আমরা আশা করবো তার কথাসাহিত্য হয়ে উঠুক আমাদেরই বোধের উচ্চারণ, আমাদেরই দেখাশোনার মার্জিত রূপ-সৌন্দর্য।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj