কানে কম শোনা

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

কানে কম শোনা অনেক সময় স্কুলের শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, বাবা-মা কিংবা অন্যান্য আপনজন দ্বারা চিহ্নিত হতে পারে।

এ সব রোগীরা পড়াশোনা বা অন্য কোনো কাজে অমনোযোগী হয়ে থাকেন। যাদের বাসায় টেলিভিশন আছে,

তারা টেলিভিশনের খুব কাছে গিয়ে উপভোগ করে থাকেন।

বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে কানে পানি জমা রোগের হার খুবই বেশি এবং রোগে আবার সাধারণত ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। যদিও সহজভাবে সাধারণের বুঝার জন্য পানি জমা বলা হলেও আসলে কিন্তু এই পানি জাতীয় পদার্থ এবং ঘনত্বের পরিমাণ অনুযায়ী এক রকম পদার্থ। এটা বিভিন্ন রকমের হতে পারে, যেমন- আঠালো রক্তের মতো, পানির মতো ইত্যাদি। কানের মধ্যে প্রদাহের কারণে পানি জাতীয় পদার্থ জমলে সবচেয়ে মজার ব্যাপার এই যে, এই পদার্থে পুঁজ হয় না, তাই এর নামকরণ নিয়েও বহু বিভ্রান্তি রয়েছে। দেখা যাক এর কি কি নাম ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ থাকে? এই নামকরণগুলো হচ্ছে নন সাপুরেটিভ অটাইটিস মিডিয়া, ইয়ার ক্যাটারাল অটাইটিস মিডিয়া, সিক্রেটরি অটাইটিস মডিয়া ইত্যাদি। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর নামকরণ অটাইটিস মিডিয়া উইথ ইফিউশন সংক্ষেপে ‘ওএমই’ হিসেবেই বহুল প্রচলিত।

মধ্যকর্ণে তরল পদার্থ শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাসের অন্যতম কারণ :

# শিশু বয়সে শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অটাইটিস মিডিয়া উইথ ইফিউশন অন্যতম। এ রোগকে সাধারণ ভাষায় ‘গøু’ ইয়ার বলা হয়ে থাকে। এ রোগ মধ্যকর্ণে পানি জাতীয় তরল পদার্থ জমা হতে শুরু করে এক পর্যায়ে তা আঠালো জাতীয় পদার্থে পরিণত হয়ে শব্দ চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ফলে শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাস পায় এবং ভাষাশিক্ষা বিঘ্নিত হয়, বুদ্ধিবৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়, স্কুলে দক্ষতা কমে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে শিশুর ব্যবহারের পরিবর্তনও লক্ষ করা যায়।

# মধ্যকর্ণে এ তরল পদার্থ জমা হওয়ার কারণ নিয়ে মতের ভিন্নতা রয়েছে। শিশুদের এডিনয়েড বড় হওয়া এবং গলা ও মধ্যকর্ণের সংযোগনালীর (শ্রæতিনালী) কাজে হেরফের হওয়া, এলার্জি, ভাইরাসের আক্রমণ এবং মধ্যকর্ণের প্রদাহে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা প্রভৃতি এ রোগের কারণ বলে মনে করা হয়। এ সব কারণে মধ্যকর্ণে বায়ুর চাপ কমে যায় এবং চারপাশের রক্তনালী হতে তরল পদার্থ মধ্যকর্ণে জমা হয়। এ রোগ যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে ৪-৭ বছর বয়সে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং দুই কানে এক সঙ্গে হয়।

# শিশুদের শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে মধ্যকর্ণে সাময়িক সময়ের জন্য এ তরল পদার্থ জমা হতে পারে, যা সাধারণত আপনাআপনি ঠিক হয়ে যায়। তবে এ রোগ হতে পারে এবং শতকরা ৫ ভাগ ক্ষেত্রে এক বছরের বেশি সময় স্থায়ী হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের প্রকোপ এমনিতেই কমে যায়। ৮/৯ বছর বয়সের পর পর এ রোগের ঝুঁকি বেশ কম।

# শিশুকাল ছাড়াও পরিণত বয়সে খুব কম সংখ্যক ক্ষেত্রে মধ্যকর্ণে এরূপ পানি জাতীয় পদার্থ জমা হতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে সাইনাসে (চিবুকের বায়ুকুঠুরী) ছাড়াও নাক এবং ন্যাসোফ্যারিংসের বিভিন্ন রোগ এ ধরনের সমস্যা হতে এ রোগের মূল লক্ষণই হচ্ছে কানে কম শোনা। সেইসঙ্গে মাঝে মাঝে কানে অল্প পরিমাণ ব্যথা হয়।

# শিশুরা নিজেদের সমস্যার কথা নিজেরা বলতে পারে না বলে রোগের লক্ষণ দেখে মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন বা শিক্ষকরাই প্রথম সন্দেহ করে থাকেন যে শিশু কানে কম শুনছে। মায়েরা অভিযোগ করেন, শিশুকে নাম ধরে ডাকলে বা কোনো কাজ করতে বললে সে আর আগের মতো সাড়া দিচ্ছে না। যাদের টেলিভিশন আছে, তারা লক্ষ করেন শিশুটি টেলিভিশনের কাছে এসে বসেছে অথবা টেলিভিশনের ভল্যুম বাড়িয়ে দিচ্ছে। টেলিভিশনের খুব কাছাকাছি শিশু এসে বসলে আমরা প্রধানত তিনটি কারণ চিন্তা করতে পারি। যথা-

(১) শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে

(২) শিশুটি চোখে কম দেখছে

(৩) টিভিতে আকর্ষণীয় কোনো অনুষ্ঠান চলছে।

এ রোগ আর একটু বড় বয়সে হলে শিশুটি নিজেই অভিযোগ করে থাকে সে কানে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে না।

কারণ :

নিম্নে বর্ণিত কারণগুলো এই রোগের ধারক ও বাহক সাধারণত মনে করা হয়।

* কানের ইউস্টাশিয়ান টিউব বন্ধ হলে, এই ইউস্টাশিয়ান টিউব বন্ধ হয় নাকের পেছনের টনসিল বা এডিনয়েড বড় হলে। নাকের পেছনের ঠিক আলা জিহ্বার উপরের অংশে অর্থাৎ ন্যাজোফ্যারিংসে কোনো টিউমার বা টিউমার জাতীয় রোগ হলে।

* বিমানে উড্ডয়নের সময় বায়ুমণ্ডল ও বিমানের ভেতরের চাপের তারতম্য হলে ইউস্টাশিয়ান টিউব বন্ধের কারণে কান বন্ধ হয়ে যায় এবং এটা সাধারণত বিমানে ওঠা-নামার সময় বেশি হয়ে থাকে।

* মুখগহŸরের মধ্যের উপরের তালু জন্মগত কাটা বা ফাটল থাকলে কিংবা তালুর অকার্যকারিতার কারণে।

* ধূমপানজনিত কারণে।

* পুনঃ পুনঃ সংকটজনক কানপাকা রোগ হলে কিংবা তা ত্রুটিপূর্ণ বা অপর্যাপ্ত চিকিৎসার কারণে।

* ঘন ঘন শ্বাসনালীর উপরের অংশের প্রদাহ হলে।

* নাকের মধ্যে মাংস ঞঁহনরহধঃব বড় হলে কিংবা টিউমার বা টিউমার জাতীয় কোনো রোগ কিংবা সাইনোসাইটিস রোগ হলে ইস্টাশিয়ান টিউব বন্ধ হয়ে কানে পানি জমে।

* ভাইরাস জাতীয় জীবাণু দ্বারা মধ্যকর্ণ আক্রান্ত হলে।

* এলার্জিজনিত কারণে।

এ ছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে যেগুলো এখনো চিকিৎসা বিজ্ঞানে পরীক্ষাধীন।

কানে পানি জমা রোগ দুরকমের হয়ে থাকে। যথা-

(১) সংকটজনক বা একিউট এবং

(২) দীর্ঘকাল স্থায়ী বা ক্রনিক রোগ।

এই রোগ দীর্ঘকাল স্থায়ী রোগ সাধারণত শিশু-কিশোরদের বেশি হয়ে থাকে। যদি ছেলেমেয়েদের কিংবা শিশু-কিশোরদের রোগের সঠিক রোগ নির্ণয় এবং আশু চিকিৎসা করা না হয়, তবে এরা সামাজিকভাবে বিভিন্ন সমস্যার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে।

উপসর্গ :

এই রোগের প্রধান বা মৌলিক উপসর্গ হচ্ছে কানে কম শোনা। কানে কম শোনা অনেক সময় স্কুলের শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, বাবা-মা কিংবা অন্যান্য আপনজন দ্বারা চিহ্নিত হতে পারে। এ সব রোগীরা পড়াশোনা বা অন্য কোনো কাজে অমনোযোগী হয়ে থাকেন। যাদের বাসায় টেলিভিশন আছে, তারা টেলিভিশনের খুব কাছে গিয়ে উপভোগ করে থাকেন। তবে তারা কথা বা ভাষা শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। কারণ ছেলেমেয়েদের ৫ বছর বয়স পর্যন্ত কানে শোনা ও কথা বলা শেখা সমান গতিতে চলে। সুতরাং যে ছেলে কানে কম শোনে তার কথা বলার ক্ষমতা অনেকাংশে লোপ পেতে পারে। সেই সঙ্গে কানে ব্যথা, কানে শোঁ শোঁ ভোঁ ভোঁ শব্দ করা, মাথাঘোরা ইত্যাদি দেখা যায়।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া :

কানে পানি জমা রোগের কারণে ছেলেমেয়েদের কথা বলা বা ভাষা শিক্ষার স্বাভাবিক ক্ষমতা লোপ পায়। এ ছাড়া কানের পর্দায় পকেট তৈরি করে এবং এই পকেট বাড়তে বাড়তে কোলেস্টিয়াটোমা তৈরি করতে সহায়ক হয়। পরবর্তী সময়ে কান পাকা রোগে পরিণত হয় এবং বিপজ্জনক রোগ দেখা দিতে পারে।

কান পরীক্ষা :

কান পরীক্ষা করলে দেখা যায়, কানের পর্দা ভেতরের দিকে চেপে আছে। এ সময় কানের পর্দায় আলো ত্রিকোণ অনুপস্থিত থাকতে পারে বা পরিবর্তিত হতে পারে এবং ম্যালিয়াস অস্থি ছোট দেখায় ও ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল অবস্থান করে। অডিওমেট্রি করে শ্রæতি হ্রাসের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। টিমপেনোমেট্রি করে দেখা যায় কানে নেগেটিভ চাপ সৃষ্টি হয়েছে কিনা এবং মধ্যকর্ণের কমপ্লায়েন্স কমে গেছে কিনা। এ ক্ষেত্রে উভয় টেস্টের উত্তর হ্যাঁবোধক হয়।

চিকিৎসা :

কানে পানি জমা রোগের চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য :

(১) কানের মধ্যে পানি জাতীয় পদার্থ বের করা

(২) সেইসঙ্গে আর যাতে পানি না জমতে পারে তার সঠিক ব্যবস্থা করা।

সুতরাং এর চিকিৎসায় প্রথমে ওষুধ দ্বারা চেষ্টা করতে হবে এবং ওষুধে যদি কোনো উপকার না আসে তবে সম্ভাব্য অপারেশনের দরকার হতে পারে।

অধ্যাপক মেজর (অব.) মো. আশরাফুল ইসলাম

নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ও বিভগীয় প্রধান

ইএনটি-হেড ও নেক সার্জারি বিভাগ

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj