অর্থ পাচার রোধ : সরকারের সদিচ্ছা জরুরি

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বেনামি লেনদেনে বিদেশে অর্থ পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে দীর্ঘদিন রেমিটেন্সেও নেতিবাচক প্রভাব ছিল। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্ত অবস্থানের কারণে রেমিটেন্স এখন কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। তবে নগদ লেনদেনে মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। গত বুধবার রাজধানীতে ‘মানি লন্ডারিং ভালনারেবিলিটিস ইন নিউ পেমেন্ট সিস্টেমস : বাংলাদেশ কনটেক্সট’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় নতুন করে বিষয়গুলো আবার উঠে এসেছে। কর্মশালায় এই খাত সংশ্লিষ্টরা বিদেশে অর্থ পাচারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া জরুরি মনে করছি।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশে যে হারে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, বিদেশে যাচ্ছে তারচেয়ে বেশি হারে। এটি অস্বাভাবিক। গত ১০ বছরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বস্তুত অর্থ পাচারের ঘটনা সব সময়ই ঘটছে। সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট, পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে পাচারের তথ্য রয়েছে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ বছরে পাচার হয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। অঙ্কটি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। এই যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কারা করছে সেটা বড় প্রশ্ন। অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তিরাই। বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের একটা অংশ এ দেশের শ্রমিকদের ঘামে লব্ধ অর্থ, দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের একটি অংশ উন্নত দেশে পাচার করছেন। সেখানেই তারা ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলছেন, সম্পদ কিনছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে পাচারকৃত অর্থের অর্ধেকেরও বেশি পাচার হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলকে ব্যবহার করে। ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং করে, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থটা বিদেশে পাচার করেন। আবার পণ্য রপ্তানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং করে, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে রপ্তানি পণ্যের মূল্যের একটি অংশ বিদেশেই রেখে দেন। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করার কারণে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের একটি অংশ আদায় হচ্ছে না এবং এতে ব্যাংকিং সেক্টর সমস্যায় পড়ছে। সুতরাং পাচার রোধে ব্যাংকিং খাতকে তৎপর হতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ পাচার ঠেকাতে ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং বাড়াতে হবে এবং সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে। দেশীয়দের বিদেশে বিনিয়োগের কারণ হিসেবে প্রায়ই বলা হয়, দেশে রাজনৈতিক অস্থিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অপ্রতুলতার কথা। এসব অনেকাংশে সত্য। আবার এটাও সত্য যে, দিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে এবং নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও এ দেশে ব্যবসাবাণিজ্য করে অনেকেই সফলতা দেখাচ্ছেন। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি যাদের মমত্ববোধ নেই, দায়িত্ববোধ নেই, তারাই অর্থনৈতিক অনিরাপত্তার খোঁড়া অজুহাত তুলে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে দেশের সর্বনাশ করছেন। এদের রুখতে হবে। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের এই হিসাব থেকে এটা স্পষ্ট যে, আমাদের অর্থ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় ছিদ্র রয়েছে। অর্থ পাচারের সব ছিদ্র বন্ধ করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে অর্থের নিরাপত্তা। পাচারে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনারও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আর অবশ্যই দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাচার বন্ধ করা গেলে, দেশের অর্থ দেশে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আমাদের পরনির্ভরশীলতা কমবে, অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj