তারেককে ফেরানো সম্ভব?

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

এস এম মিজান : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ সাজা কার্যকর করতে হলে তাকে লন্ডন থেকে দেশে ফেরত আনতে হবে। যুক্তরাজ্যের বন্দি বিনিময় আইন-২০০৩ অনুযায়ী তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বন্দি বিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। এমন বাস্তবতায় কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে সরকার, সেটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে রয়েছে নানা কৌত‚হল। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তারেককে ফেরানোর বিকল্প পথ আছে। সরকার চাইলে সে পথ অনুসরণ করতে পারে।

যুক্তরাজ্যের দি এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট (বন্দি বিনিময় প্রত্যাবর্তন আইন)-২০০৩ অনুযায়ী তাদের সঙ্গে যে দেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে, শুধু সে দেশের সঙ্গে বন্দি বিনিময় করতে পারবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এ ধরনের কোনো চুক্তি নেই। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে আইনগতভাবে তারেক রহমানকে ফেরত আনা সম্ভব নয়। তবে তারেক রহমানকে দেশে ফেরাতে হলে প্রথমে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলে চুক্তি করতে হবে বন্দি বিনিময়ের জন্য। অথবা সে দেশের আইনি লড়াইয়ে অংশ নিতে হবে। অথবা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন। সে দেশের মন্ত্রী আমাদের প্রস্তাব ইমিগ্রেশন কোর্টে পাঠাবেন। আদালত এ বিষয়ে শুনানি করে সিদ্ধান্ত দেবেন। আমাদের দেশের আবেদন গ্রহণ করলে তারেক রহমানকে ফেরত আনা যাবে। আবেদন খারিজ করলে কোনোভাবেই তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনা যাবে না।

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায়ে বুধবার তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। মৃত্যুদণ্ড হয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ১১ জনের। তারেক রহমান ১০ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এর আগেও দুর্নীতির দুই মামলায় তার মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেতাকে তারা ফিরিয়ে আনবেন।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কষ্ট হবে না। কারণ মৃত্যুদণ্ড হলে বিদেশে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) দেয়া হয়। তারেক রহমানের তো যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অপরাধীকে আশ্রয় দেয়া সমর্থন করে না। তাই তাকে ফিরিয়ে আনতে কষ্ট হবে না। গতকাল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন তিনি।

তারেককে ফেরানো বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, তারেক রহমান নিজে থেকে ফেরত না এলে তাকে কোনোভাবেই ফেরত আনা সম্ভব নয়। আইনগতভাবে তাকে আনার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আমাদের দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কোনো বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই।

তবে সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, তারেকের মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় তাকে দেশে ফেরানো সহজ হবে। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে মৃত্যুদণ্ডের অজুহাতটা দেয়া হচ্ছে, এখানে সে অজুহাতের সুযোগ নেই। তারেককে লন্ডন থেকে ফেরাতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ক‚টনৈতিক যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা দরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই সেদিকে মনোযোগী হবে, যাতে দ্রুত এ সাজা বাস্তবায়ন হয়।

এ বিষয়ে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুল আলম বলেছেন, যুক্তরাজ্যের বন্দি বিনিময় প্রত্যাবর্তন আইন-২০০৩ অনুযায়ী তাদের সঙ্গে যে দেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে শুধু তারাই বন্দি বিনিময় করতে পারবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এ ধরনের কোনো চুক্তি না থাকায় আইনগতভাবে তারেক রহমানকে ফেরত আনা সম্ভব নয়। তবে তারেক রহমানকে দেশে ফেরাতে হলে ক‚টনৈতিকভাবে জোরালো প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বন্দি বিনিময়ের জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। অথবা সে দেশের ‘লিগ্যাল ফাইটে’ অংশ নিতে হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, তারেক রহমানকে ফেরাতে হলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের দেশের (যুক্তরাজ্যের) মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন। সে দেশের মন্ত্রী আমাদের প্রস্তাব ইমিগ্রেশন কোর্টে পাঠাবে। আদালত এ বিষয়ে শুনানি করে সিদ্ধান্ত দেবেন। আমাদের দেশের আবেদন গ্রহণ করলে তারেক রহমানকে ফেরত আনা যাবে। আবেদন খারিজ করলে কোনোভাবেই তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনা যাবে না।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় মনে করেন, বহিঃসমর্পণ চুক্তি না থাকলেও জাতিসংঘ সনদের শর্ত মেনে সাজাপ্রাপ্তদের যুক্তরাজ্য ফেরত দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারেক রহমানকে ফেরত দিতে যুক্তরাজ্যকে এখনই অনুরোধ করা উচিত। ১৪ বছর আগের ওই হামলার ঘটনায় বুধবার রায় ঘোষণার পর নিজের ফেসবুক পাতায় এক স্ট্যাটাসে জয় বলেন, আমাদের সরকারের উচিত এখনই তারেক রহমানের নামে আবার নতুন করে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের কোনো বহিঃসমর্পণ চুক্তি না থাকলেও জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী অন্য কোনো সদস্য দেশের অনুরোধে শাস্তিপ্রাপ্ত আসামিদের সমর্পণ করতে পারে। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি চারজন সন্দেহভাজন আইএস সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে জেনেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj