ভাবমূর্তি সংকটে বিএনপি ঐক্য প্রচেষ্টায় হোঁচট!

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

খোন্দকার কাওছার হোসেন : গভীর ভাবমূর্তি সংকটে নিপতিত হয়েছে বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুর্নীতি ও হত্যার পৃথক মামলায় দণ্ডিত। দলের এই দুই শীর্ষ নেতাসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও বিএনপি সরকারে থাকাকালীন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, জাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড হওয়ায় দলটির গ্রহণযোগ্যতার ওপর একটি কালো ছায়া নেমে এসেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে আন্দোলনের নামে যে জ্বালাও-পোড়াও, সহিংসতা করেছিল দলটির নেতাকর্মীরা তাতেও বড় ধরনের একটা ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে বিএনপি। ওই সময়ে আন্দোলনের নামে সহিংস, নেতিবাচক রাজনীতির কারণে নেতাকর্মী, শুভাকাক্সক্ষীসহ নানা প্রান্ত থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল বিএনপিকে। ২০১৫ সালে সরকার পতনের আন্দোলন করতে পেট্রোলবোমা হামলা চালানোয় ‘আগুন সন্ত্রাসী’ দল হিসেবে আখ্যা পায় বিএনপি। এমনকি তাদের এ ভাবমূর্তি সংকট দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহিঃবিশে^ ছড়িয়ে পরে। কানাডার একটি আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা করে। যা দলটির জন্য চরম অসম্মানজনক।

সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সাবেক দুই মন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড একজন সাবেক এমপিসহ দলের কয়েকজন নেতার বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হওয়ায় দলটির ভাবমূর্তি সংকট গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। দলটির রাজনৈতিক সম্ভাবনাও তলানিতে এসে ঠেকেছে। প্রশ্ন উঠেছে দণ্ডিত ব্যক্তিদের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাখাটা কতটুকু যৌক্তিক ও নৈতিক।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সঙ্গে উদারপন্থী দলগুলোর সম্ভাব্য ঐক্য প্রক্রিয়াও হোঁচট খেয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে থাকা দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নিয়ে সংশয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা। এ নিয়ে এখনো কেউ প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডিত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া কতটা যৌক্তিক হবে- এ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। এরই মধ্যে তার কিছু আলামতও দৃশ্যমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে ঐক্য প্রক্রিয়া, যুক্তফ্রন্ট ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে পূর্ব নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বৈঠক বাতিলের কারণ হিসেবে ড. কামালের অসুস্থতার কথা বলা হয়। আসলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের একদিনের মাথায় বিএনপির সঙ্গে জোট গড়ার বৈঠকে বসতে নেতারা কুণ্ঠিত বোধ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে কিনা সে প্রশ্নের জবাব দেবে বিএনপি। এটা তাদের ব্যাপার। একটি রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের গ্রেনেড মেরে শেষ করে ফেলবে- এই ঘটনার নিন্দা করার ভাষা আমার নেই। আমি আশা করি বিএনপিও এ ঘটনার নিন্দা করবে।

এদিকে, দলের চরম ভাবমূর্তি সংকট উত্তরণে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব গত ১০ অক্টোবর রায় ঘোষণার পরও কঠোর কোনো আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। অনেকটা গা বাঁচানোর কর্মসূচি হিসেবে বিক্ষোভ সমাবেশ, কালো পতাকা মিছিল, মানববন্ধনের মতো নরম কর্মসূচি দিয়ে দায় সেরেছে। বিএনপির এমন অবস্থান ছিল খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার পরও। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের অবস্থানকে স্রেফ কৌশলগত বলে জানানো হয়েছে।

১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলেও তার কয়েক বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা এবং ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়ার অভিযোগে শুরু থেকেই ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে বিএনপি। বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি থাকাকালে যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাসভবন থেকে খুনি আসামি গ্রেপ্তার, খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এস এম কিবরিয়াকে হত্যা, সারা দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনা বিএনপির ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। দলটির বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে- যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিএনপিকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করায় বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন- বাংলাদেশের রাজনীতি কী খুনি, দণ্ডিত, আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের হাতে ন্যস্ত হবে? এই দলটির সঙ্গে উদারপন্থীদের সম্ভাব্য ঐক্য নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি।

তবে, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, দেশে কার ভাবমূর্তি অক্ষুণœœ রয়েছে, কার সংকটে রয়েছে তা দেশবাসীই নির্ধারণ করবে। এর বেশি কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা এ নেতা।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj