পাহাড়ে অবৈধ বসতি : দুর্যোগে টনক নড়ে সারা বছর নির্লিপ্ত প্রশাসন

শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

চট্টগ্রাম অফিস : প্রতি বছর বর্ষা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কেবল পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ে চট্টগ্রাম প্রশাসনে তোড়জোড় শুরৃ হয়। এ ছাড়া সারা বছরই তারা থাকেন নির্লিপ্ত। দুর্যোগের সময়টাতে তাদের টনক নড়ে। চলে উচ্ছেদ অভিযান। তাও মাত্র গুটিকয়েক পাহাড়ে চলে এ অভিযান। বছরের পর বছর যুগের পর যুগ ধরে চলছে এ উচ্ছেদ অভিযান ও কথিত পুনর্বাসন খেলা। পাহাড়ে বসবাসকারী নাগরিক, স্থানীয় মাস্তান, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের এ খেলা কয়েকদিন পরেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। অনেকেই এটিকে ‘চোর-পুলিশ’ খেলার সঙ্গে তুলনা করছেন।

এদিকে বুধবার ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণার পর থেকে যথারীতি শুরু হয় নানা দৌড়ঝাঁপ। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হয়। অভিযান চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত অভিযান চালায়নি প্রশাসন। তবে সৌভাগ্যবশত ঘূর্ণিঝড় তিতলি আঘাত না হানায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তবে ঘূর্ণিঝড় তিতলি আঘাত হানলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ধসে প্রাণহানিসহ নানা বিপর্যয় ঘটতে পারত। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি ও বস্তি তৈরি করে কম টাকায় ভাড়া দেয় প্রভাবশালীরা। যাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না প্রশাসন। পাহাড় কাটা ও দখলের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করাসহ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে প্রশাসনের স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, পাহাড় কাটা ও দখলের সঙ্গে জড়িতরা চিহ্নিত হলেও কখনোই প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দখলকারীরা তাদের অবস্থানেই বহাল আছে। উল্টো প্রতি বছর নতুন পাহাড় কেটে আরো বসতি স্থাপন করছে। এভাবে চলতে থাকলে এক দশক পর শহর ও আশপাশের এলাকায় একটি পাহাড়ও আর অবশিষ্ট থাকবে না। প্রশাসনকে আগেই বসতি স্থাপনের সময় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তবে পাহাড় দখল করে বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেয়ার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরের কাগজকে বলেন, পাহাড়গুলো বিভিন্ন সংস্থার নামে। ওসব সংস্থা থেকে কেউ জমি নিয়ে বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। আইন অনুযায়ী আমাদের কাজ হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে যাতে কোনো ধরনের প্রাণহানি না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখা। তিনি বলেন, গত এপ্রিল থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু পরিবারকে সরানো হয়েছে। তবে যারা এখন পর্যন্ত সরেনি তাদের উচ্ছেদ করা হবে। এ ছাড়া মাইকিং করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত পাহাড় ধস ও প্রাণহানি রোধে ২০০৭ সালে গঠিত একটি শক্তিশালী কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশ করে। চিহ্নিত করা হয় পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ। কিন্তু এসব সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। কেবল বর্ষা এলেই মাইকিং করা হয়। উচ্ছেদ করা হয় ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের। পরে দেখা যায় তারা আবারো সেই পাহাড়ের পাদদেশেই আশ্রয় নেন। জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, নগরীর ১৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৬৮৪টি পরিবার বসবাস করছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা অইেশ বেশি। নগরীর অর্ধশতাধিক পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করছে মতিঝর্ণা পাহাড়, আকবর শাহ পাহাড় ও বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj