মিষ্টি গাছ : মহিউদ্দীন আহ্মেদ

বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আজ কলতান বিদ্যানিকেতনে যেমন খুশি তেমন আঁকো প্রতিযোগিতা। এতে অংশগ্রহণ করছে প্লে ও নার্সারি ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা। তারা ছবি আঁকায় ভীষণ ব্যস্ত।

ঢাকা থেকে একজন চিত্রশিল্পী এসেছেন। তাঁর নাম কালাম চৌধুরী। তিনি চারুকলা বিভাগের শিক্ষক। তাঁর চুলগুলো শাদা এবং ঘাড় পর্যন্ত লম্বা। দেখে মনে হচ্ছে তাঁর মাথায় নীল আকাশের শাদা শাদা মেঘ পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁর গোঁফগুলোও শাদা। আর ঠোঁট দুটো লাল টকটকে। তিনি নিয়মিত পান খান। অনেক ছবির ভেতর থেকে তিনিই বাছাই করবেন সেরা ছবিটি।

পুরো স্কুলজুড়ে আজ সাজ সাজ রব। বাচ্চারা স্কুল ড্রেসের পরিবর্তে নানারকম রঙিন পোশাক পরেছে। শিক্ষকরাও সেজেছেন বাহারি সাজে।

স্কুল গেটের বাইরে অস্থায়ী দোকান বসেছে। সেখানে বিক্রি হচ্ছে নানান পসরা। যেমন- আইসক্রিম, বাদাম, চকোলেট, পপকর্ন, বেলুন- আরো কত কী। এ যেন রীতিমতো মেলা!

কেউ এঁকেছে গ্রামের দৃশ্য, কেউ এঁকেছে প্রজাপতি, কেউবা এঁকেছে আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া একঝাঁক পাখির ছবি। এমনই অনেক কিছু।

কিন্তু নীল এঁকেছে একটি গাছের ছবি। তাতে থোকা থোকা মিষ্টি ধরেছে। দেখে মনে হচ্ছে মিষ্টিগুলো টসটসে রসে ভরা। নীল এটির নাম দিয়েছে মিষ্টি গাছ।

ছবিটি দেখে মুখে হাত চেপে হাসতে হাসতে জিসান বলল, ‘এটা তুমি কী এঁকেছ নীল? গাছে কি কখনো মিষ্টি ধরে? কিচ্ছু হয়নি!’

নীল কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল।

জিসান ইশারায় প্রিয়ন্তীকে নীলের ছবিটি দেখাল। প্রিয়ন্তী ছবিটি দেখে কিছুই বুঝতে পারল না। মুচকি হেসে নীলকে কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু নীল ওর দিকে তাকাল না। কারণ নীল বুঝতে পেরেছে, প্রিয়ন্তীও ওর ছবিটি দেখে হাসাহাসি করবে।

এরই মধ্যে ঘণ্টা পড়ে গেল।

আর্ট মিস বললেন, ‘টাইম ইজ ওভার। কেউ জায়গা থেকে উঠবে না, কথাও বলবে না।’

আর্ট মিস সবার ছবি নিয়ে গেলেন। জানা গেল, কিছুক্ষণের মধ্যেই শিল্পী স্যার ছবিগুলো দেখবেন এবং ঘোষণা করবেন- কার ছবিটি সেরা।

আবার ঘণ্টা পড়ল। শিল্পী স্যার সবাইকে নিয়ে স্কুল মাঠে গেলেন। সবাই সবুজ মাঠে বসল। দূর থেকে দেখে মনে হলো যেন ইয়া বড় একটি পদ্ম ফুটেছে স্কুুল মাঠে।

সবগুলো ছবি শিল্পী স্যারের হাতে। বাচ্চারা অধীর আগ্রহে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।

শিল্পী স্যার পান চিবোতে চিবোতে বাচ্চাদের দেখতে লাগলেন। তাঁর লাল ঠোঁট দুটিতে যেন হাসির ফোয়ারা বইছে। চোখ দুটি আনন্দে চিকচিক করছে। বোঝা যাচ্ছে, বাচ্চাদের সঙ্গ পেয়ে তিনি খুবই আনন্দিত।

তিনি বললেন, ‘তোমরা সবাই সুন্দর এঁকেছ। তোমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।’

হেড মিস বাচ্চাদের হাততালি দেয়ার ইঙ্গিত করলেন। সবাই হাততালি দিল। মনে হলো, হাততালি নয়, একসঙ্গে অসংখ্য খই ফুটে উঠল।

শিল্পী স্যার বললেন, ‘যেমন খুশি তেমন আঁকো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী তোমরা সবাই শুভেচ্ছা পুরস্কার পাচ্ছ।’

হেড মিসের নির্দেশে নাসিমা খালা সবার হাতে রঙ, পেন্সিল ও খাতা দিল।

অপেক্ষার পালা শেষ।

শিল্পী স্যার অনেকগুলো ছবির ভেতর থেকে একটি ছবি তুলে নিলেন। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে, আহমেদ আরিয়ান নীল?’

‘ইয়েস স্যার’- বলে এক হাত উঁচু করে উঠে দাঁড়াল নীল।

শিল্পী স্যার মিষ্টি হেসে বললেন, ‘ও তুমি! আমার কাছে চলে এসো প্লিজ!’

নীল তাঁর কাছে গেল।

শিল্পী স্যার নীলকে আদর করে চুমো খেলেন। তারপর নীলের ছবিটি সবাইকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন এবং বললেন, ‘আমার বিচারে এটিই সেরা ছবি।’

তারপর তিনি তাঁর ব্যাগ থেকে সুন্দর একটি তুলি বের করে নীলের হাতে তুলে দিলেন। এটি ছিল শিল্পী স্যারের পক্ষ থেকে নীলের জন্য বিশেষ পুরস্কার।

আর একবার হাততালির খই ফুটল।

শিল্পী স্যার বললেন, ‘তোমাদের যখন যা আঁকতে ইচ্ছে করবে তা-ই আঁকবে। এটাই ছবি আঁকার নিয়ম। নীলের ছবিটা দেখ। ওর মিষ্টি গাছে অসংখ্য মিষ্টি ধরেছে। -কী অদ্ভুত ব্যাপার! তাই না?’

সবাই বলল, ‘জি স্যার।’

তিনি নীলের জন্য সবাইকে আর একবার হাততালি দিতে বললেন। মুহুর্মুহু হাততালির শব্দে পুরো স্কুল মাঠ মুখরিত হয়ে উঠল।

অনুষ্ঠান শেষে জিসান নীলকে বলল, ‘তোমার ছবিটি যে এত সেরা হয়েছে, আমি বুঝতেই পারিনি!’

নীল বলল, ‘আমিও বুঝতে পারিনি।’

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj