রক্তরঙে কলঙ্কিত পাহাড়

বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

২১ সেপ্টেম্বর ভোরে রাঙামাটির নানিয়ারচরে আবারো দুজনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। জেএসএস সংস্কার গ্রুপ ছেড়ে ইউপিডিএফের মূল দলে যোগ দেয়ায় প্রাণ দিতে হয়েছে আকর্ষণ চাকমা ও শ্যামল কান্তি চাকমাকে। গত ১৮ আগস্টের রক্তদাগ শুকাতে না শুকাতেই আবারো রক্তে লাল পার্বত্য পাহাড়। সবুজবেষ্টিত পাহাড়ে অহরহই ঘটছে রক্তের হোলি খেলা। পার্বত্য জেলার উঁচু-নিচু নিভৃত পাহাড় সশস্ত্র সন্ত্রাসের কবলে পড়ে সর্বদাই অশান্ত হয়ে উঠছে। বৃক্ষবন ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ উদার প্রকৃতির অকুটিল পাহাড়ি জনপদ যেখানে শান্তশিষ্ট হওয়ার কথা সেখানে ঘনঘন হামলা-আক্রমণে অরাজক অস্থিতিশীলতায় রক্তিম রূপ ধারণ করছে। সবুজ সঙে সাজা সেখানকার শান্ত মাটি আচমকাই রক্তের ভীতিকর লজ্জায় লাল হচ্ছে। সন্ত্রাস সশস্ত্র বেলেল্লাপনায় বারবার কলঙ্কিত হচ্ছে পাহাড় পার্বত্য গাঢ় সবুজের সুন্দর সুশোভিত চূড়া। হার না মানা সৌন্দর্যের অপরূপ ভূষণে দাঁড়িয়ে থাকা জনবসতিপূর্ণ এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলো কেন রক্তরঙে নিজেদের আক্রান্ত করছে। কেনই বা নিজের গায়ে নিজেই ছুরি চালাচ্ছে। ধ্বংস করছে সমগোত্রীয় প্রাণ। নিজেদের ঘৃণ্য পথে পতিত করে কতটুকু লাভবান হচ্ছে পার্বত্য পাহাড়ের এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। একই গোত্রের ভ্রাতৃত্ববোধকে গলা টিপে হত্যা করে তারা কিসের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে?

গত ১৮ আগস্ট রক্তে লাল হয় পার্বত্য এলাকা। খাগড়াছড়ি শহরের অদূরে অবস্থিত স্বনির্ভর বাজার দেখে মানুষ নিধনের এই অযাচিত মহড়া। তখন দুর্বৃত্তের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হয় সাত পাহাড়ি। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিরোধের জেরে এ হামলার সূত্রপাত। স্বনির্ভর বাজারে ইউপিডিএফের উদ্যোগে গ্রামবাসীকে নিয়ে একটি কর্মসূচি পালন করার আগে এ হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। ইউপিডিএফ ওই ঘটনার জন্য ‘সংস্কারপন্থি’ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছে। তবে হামলার সঙ্গে কোনো রকম সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। এতে করে পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেরা নিজেরাই রক্তারক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে বলে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। পাহাড়ে আধিপত্য কিংবা নেতৃত্ব দখলের সশস্ত্র লড়াইয়ে অকালেই ঝরে পড়ছে অসংখ্য তরতাজা প্রাণ। গত ৩ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার রক্তাক্ত দগদগে ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখল দেশ। একেবারে নৃশংস কায়দায় পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে প্রতিপক্ষ সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এই হত্যা মিশনের আসল উদ্দেশ্য কি? আধিপত্য, নেতৃত্ব, দখল না ভিন্ন গোষ্ঠী কর্তৃক আদিবাসী নিধনের মহাপরিকল্পনা।

পার্বত্য পাহাড় রক্তে রঞ্জিত হওয়ার ইতিহাস বেশ পুরনো। স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তান আমল থেকেই এখানে রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে আসছে। অতীতে সেখানে শুধু মানুষ হত্যাই নয়, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তবে তা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় শক্তি দ্বারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌশলে পরিচালিত হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে সেখানে অসংখ্য প্রাণ যেমন ধ্বংস হয়েছে তেমনি দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান নিয়েছে অনেক নির্যাতিত আদিবাসী পরিবার। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গেল কয়েকটি হত্যাযজ্ঞের ধারাবাহিক পটে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, সেখানকার স্থানীয় আদিবাসী সংগঠনগুলোর রেষারেষি থেকেই একের পর এক হত্যা-অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষরা তাদের হিংসুটে প্রতিযোগিতায় নিজেদের হিং¯্রতা দেখিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বারবার ভ্রাতৃঘাতী বীভৎসরূপে আবির্ভূত হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে সাংগঠনিক মতপার্থক্য কিংবা বনিবনা হচ্ছে না বিধায় ক্ষুদ্র পরিচয়ের অল্পসংখ্যক এ মানুষগুলো দৈত্যদানবের মতো আপন অস্তিত্বে হামলে পড়ছে। একটি দেশের নিতান্ত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হয়েও তারা কেন যে নিজেদের এভাবে মরণঘাতী উচ্ছৃঙ্খলতার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে তা নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। কই নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তুলবে সেখানে তার বিপরীত ফল লক্ষ করা যাচ্ছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পরিচালিত পৃথক সংগঠনের আড়ালে ক্ষুব্ধ সশস্ত্র প্রাণবিনাশী বৈরিতার আসল কারণ খুঁজে বের করা দরকার। এ জন্য সরকারকে শুধু দমন-পীড়ন-পাকড়াওয়ের কাজ পরিচালনা করলেই চলবে না। এভাবে হয়তো পরিস্থিতি সাময়িক শান্ত করা যাবে। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর আবারো রক্তলাল অশান্ত হয়ে উঠবে এই পাহাড়ি জনপদ।

দেশের পার্বত্য অঞ্চলে শৃঙ্খলা ফিরাতে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। পাহাড়ের উগ্র শক্তিকে বশে আনতে তৎকালীন হাসিনা সরকার এই চুক্তিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু চুক্তির বিশ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও চুক্তি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার কতখানি সফল তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। পাহাড়ি সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের সমঝোতা স্বাক্ষর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও শান্তি আনতে পারেনি পাহাড়ি অঞ্চলের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে। মূলত চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে পাহাড়ি সংগঠনগুলো। শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর আদিবাসীদের মনে বিরুদ্ধাচরণ কাজ করে। একটি দল শান্তি চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিলে অন্য আরেকটি দল এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তখন থেকেই আদিবাসী দলে ভাঙনের সূত্রপাত। আর এ ভাঙন থেকেই রক্তারক্তির ঘৃণ্য তৎপরতা শুরু হয়েছে।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২০ বছর পার হলেও পার্বত্যাঞ্চলে চলছে এখনো অস্ত্রের ঝনঝনানি, অপহরণ ও চাঁদাবাজি। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পার্বত্যাঞ্চলে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ-অসহায় মানুষ। সরকারি সূত্র মতে, পার্বত্যাঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ১০৮৩, আহত হয়েছে ১৩৮২ জন, অপহরণ হয়েছে ৩৫৩৮ জনের বেশি। ২০১৮ সালেই তিন পার্বত্য জেলায় ৪৮ জন নিহত হয়েছে, ১৩৭ অপহৃত, বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে শতাধিকেরও বেশি। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৬৫ জন। সর্বশেষ এলোপাতাড়ি গুলিতে সাতজন নিহত হয়।

শান্তিতে বিশ্বাসী শেখ হাসিনা সরকার তৎকালীন সময়ে পাহাড়ি জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনতে শান্তি চুক্তির পথে হাঁটেন। সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য এলাকার সমস্যা সমাধানে আলোচনা শুরু করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অস্ত্রসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের দিনই পাহাড়িদের একটি অংশ চুক্তির বিরোধিতা করে অনুষ্ঠানস্থলে চুক্তিবিরোধী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। এরপর চুক্তির বিরোধিতা করে প্রসীত খিসার নেতৃত্বে জন্ম নেয় ইউপিডিএফ। চুক্তির কয়েক বছর যেতে না যেতেই চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একইভাবে ইউপিডিএফও দুভাবে বিভক্ত হয়। এরপর থেকে ৪ ভাগের পাহাড়ি সংগঠনের মধ্যে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে শান্তি চুক্তির সময় থেকেই আন্তবিরোধের শুরু। তারপর এই দীর্ঘ সময়ে একের পর এক প্রাণবিনাশী অপকর্ম সাধন করছে আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষগুলো। নিজেদের মধ্যে এই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী আদিবাসীদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কোনো পক্ষই তা ভেবে দেখছে না। পার্বত্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত যতটা না আদর্শিক কারণে, তারচেয়ে বেশি এলাকার দখলদারিত্ব, দখল নিয়ন্ত্রণে রাখা, চাঁদাবাজির পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণ, বিশাল সশস্ত্র গ্রুপের কর্মীদের ভরণপোষণের ব্যয়ভার আদায়, প্রতিপক্ষের কর্মসূচিতে বাধা প্রদান-পাল্টা প্রতিরোধ এসবই বিরোধের কারণ। আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভ্রাতৃঘাতী এই সশস্ত্র হামলা আক্রমণ থেকে নিভৃত পাহাড়কে মুক্ত করা দরকার। সরকারকে এ নিয়ে ভাবতে হবে।

ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় বারবার মনুষ্য রক্তে কলঙ্কিত হবে তা মেনে নেয়া যায় না। সরকার ও আদিবাসী সংগঠনগুলোকে এ থেকে বেরিয়ে আসার সমাধানযোগ্য পথ খুঁজতে হবে। শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরকারী বর্তমান সরকারকে শান্তির দীর্ঘস্থায়ী পথে হাঁটার মসৃণ সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। আদিবাসী সংগঠনগুলোকে নিজেদের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় ব্রতী হতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র এই জাতিসত্তায় যদি খুনের মতো বিভীষিকাময় ভূত চেপে বসে তাহলে শান্তি পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে। আর নিজেরা নিজেরাই অশান্তির আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হবে। তাই আদিবাসী উভয় পক্ষকেই শান্তি সমঝোতার পথে পৌঁছতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারলে হয়তো পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে। অন্যথায় অশান্তির রক্তরঙে রঞ্জিত হবে পাহাড়।
বিশ্বজিত রায়
জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

Bhorerkagoj