যুদ্ধ নয়, বিশ্ব চায় শান্তি : সহিংস ভিয়েতনাম যুদ্ধের অহিংস বাণী

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কিছুদিন আগেই ঘুরে এসেছি ভিয়েতনাম থেকে। যুদ্ধের দেশ ভিয়েতনাম। ১৭ বছর ধরে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধ করেছে পরম পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। তারও আগে ফরাসিদের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে। খুব সহজে তাদের স্বাধীনতা আসেনি। তাদের নেতা হু চি মিন যুদ্ধের ময়দানেই কাটিয়েছিলেন অধিকাংশ সময়। যুদ্ধে যুদ্ধেই ভিয়েতনামের মানুষের কেটেছে বছরের পর বছর। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বর্ণনা করলে এক কথায়ই বলা যেতে পারে, যুদ্ধের ফল হিসেবে পুরো ভিয়েতনামই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পোড়া মাটি আর ধ্বংসস্ত‚প ঘরবাড়ি ছাড়া তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। শুধু যে বৈষয়িক বস্তুরই ধ্বংস হয়েছিল তা নয়, কাতারে কাতারে তাদের দেশের মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। যারা কোনোভাবে প্রাণে বেঁচেছিল তাদেরও অসুস্থ জীবনের বোঝা বইতে হয়েছিল। আমেরিকানরা কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে। নদীতে বিষ প্রয়োগ করেছিল যেন পানি পান করে বেঁচে থাকতে না পারে এবং পানিতে লুকিয়ে থাকতে না পারে। আমেরিকান সেনাবাহিনী তাদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়েছিল। সহ্য করতে না পেরে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে। প্রথমে বেঘোরে জীবন দিলেও ধীরে ধীরে তারা যুদ্ধ করেই প্রাণ দিয়েছে। মরেছে এবং মেরেছে। আমেরিকানদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিতে গিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মরেছে। যারা বেঁচে ছিল, তারা তবুও হাল ছাড়েনি। গেরিলা যুদ্ধ, সম্মুখযুদ্ধ সবকিছুতেই ভিয়েতনামের মানুষ নিজেদের উৎসর্গ করেছিল। ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল তারা সামান্যই। ফরাসিরা যখন টের পেল, এ জাতিকে এমনভাবে বেদখল করে রাখা যাবে না, তখন তারা ভেগে গিয়েছিল ভিয়েতনাম থেকে। কিন্তু তাতে ভিয়েতনাম বা হু চি মিন শান্তি খুঁজে পায়নি। এসে গেল আর এক আধিপত্যবাদী শক্তি আমেরিকা।

তবে ইতোমধ্যে ভিয়েতনামের হু চি মিন নিজের দেশকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দিয়ে বসেছিলেন এবং সাউথ ভিয়েতনামে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। আধিপত্যবাদী আমেরিকান আর ভিয়েতনামের মিলিশিয়ার মধ্যে শুরু হয়ে যায় এক অসমান যুদ্ধ। দিন যায় আর যুদ্ধ দাঁড়ায় কঠিন থেকে কঠিনতরভাবে। আমেরিকানদের ধারণা ছিল, ভিয়েতনামের সৈন্যরা এক মাসও টিকতে পারবে না তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। ভিয়েতনাম শুরু করল গণযুদ্ধ। সব মানুষই যোগ দিতে থাকল তাদের সঙ্গে। কঠিন হয়ে গেল আমেরিকার হিসাব-নিকাশ। আমেরিকা আনতে শুরু করল আরো সৈন্য, আরো অস্ত্র, আরো যানবাহন। অন্যদিকে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে ভিয়েতনামের সব মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধে। শক্ত প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ খুব সহজ হলো না ভিয়েতনামের। তবে রাশিয়া ও চীন তাদের সাহায্য করল। যুদ্ধের গতি বাড়ল, সময় বাড়ল। যুদ্ধের অবস্থাটা বুঝতে সহজ করার আশায় আমি দুয়েকটি তথ্য তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। আমেরিকার সঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধ করেছিল ১৭ বছর ২ মাস। এই যুদ্ধে মোট ৮৭ লাখ ৪৪ হাজার সৈন্য অংশ নিয়েছিল। সম্মুখযুদ্ধে ছিল ৫৪ লাখ ৯ হাজার ৫শ সৈন্য। আর্টিলারি শেল এবং বোম্ব পড়েছিল ১ কোটি ৪৩ লাখ টন। এ যুদ্ধে খরচ হয়েছিল ৬৭৬ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার। যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছিল ৫৮ হাজার ১৫৯ জন এবং আহত হয়েছিল ৩ লাখ ৪ হাজার জন। এ যুদ্ধে মোট ২ হাজার ৭৪টি ট্যাংক এবং গোলা বহনকারী যান, ১ হাজার ৮শ এয়ারক্রাফ্ট, ১ হাজার ৫৩২টি আর্টিলারি উইপন, ৫৬ হাজার মেকানাইজড যান, ১৯ লাখ ইনফ্যান্ট্রি উইপন এবং ১ লাখ ২০ হাজার যোগাযোগ ইকুইপমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছিল।

ভিয়েতনামে আমেরিকা অন্যায় যুদ্ধ করেছিল- এমনটাই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ভিয়েতনামের মানুষ তাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল। আর আমেরিকা ভিয়েতনামে তাদের দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। আমেরিকার এই অন্যায় যুদ্ধের পরিণতি তাদের মেনে নিতে হয়েছিল পরাজয়ের মাধ্যমে। ভিয়েতনামকে তারা যত সহজে পরাজিত করতে পারবে বলে মনে করেছিল, তত সহজ তো হয়ইনি বরং উল্টোটা হয়েছে। রীতিমতো নাকানি-চুবানি খেয়ে তাদের ভিয়েতনাম ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু পরাজয়ের গøানি গ্রহণের আগে আমেরিকা ভিয়েতনামে যা করেছে, যেভাবে করেছে তা বিশ্লেষণ করলে আমেরিকার সেই রাষ্ট্রযন্ত্র এবং মিলিটারি সংগঠনকে খুবই ধিক্কারের সঙ্গে স্মরণ করার সুযোগ রয়েছে। তারা ভিয়েতনামের মানুষদের মানব মর্যাদা দেয়ারও প্রয়োজনবোধ করেনি। ভিয়েতনামি গেরিলাদের আক্রমণে তারা এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে, সুযোগ পেলেই তারা অকাতরে বেসামরিক মানুষদের হত্যা করত। বেসামরিক মহিলাদের বলাৎকার করে প্রতিশোধ নিতে চাইত। তারা সব এলাকায় বোম্বিং করেছে, প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রবেশ করে বেয়োনেটের খোঁচায় খোঁচায় নিরীহ বেসামরিক ভিয়েতনামিদের হত্যা করেছে। এমনকি তারা বিষ প্রয়োগে সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি।

একটি দেশের মাটিতে এসে সেই দেশের মুক্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে শুধু যুদ্ধ পরিচালনাই নয়, বরং সেই দেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা করা থেকে শুরু করে এহেন কোনো অমানবিক কাজ নেই যা আমেরিকানরা করেনি ভিয়েতনামে। ফলে ভিয়েতনাম হয়ে দাঁড়ায় একটি ধ্বংসস্ত‚প ভূখণ্ডে। ভিয়েতনামের মাটিতে কোনো স্থাপনা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। আমেরিকানরা ভিয়েতনামে এমন সব কেমিক্যাল ও বিষ ব্যবহার করে যে, যুদ্ধে যারা বেঁচে থাকে তারা সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। আজো ভিয়েতনামে গিয়ে আমেরিকানদের বর্বর কার্যকলাপের নমুনা পাওয়া যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকেই হয়তো আপনি আর সেখানে সুস্থ মানুষ হিসেবে খুঁজে পাবেন না। পঙ্গুত্ববরণ করেছে তাদের অধিকাংশই। যুদ্ধে যখন নিশ্চিত পরাজয় মেনে নিতে হবে, ঠিক তখন আমেরিকানরা এই জাতিকে ধ্বংস করার নতুন খেলায় মেতে ওঠে। আর সেই ক্ষতি শুধু সেসব বেঁচে থাকা ভিয়েতনামিদেরই বইতে হয়নি, তার পরের প্রজন্মকেও বইতে হয়েছে। অসুস্থ পিতা-মাতার ঘরে এসেছে পঙ্গু সন্তান। এমনই নিদর্শন ভিয়েতনামের সর্বত্র বিরাজমান বর্তমানে। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানেই যাবেন ভিয়েতনামের পঙ্গু শিশুদের দেখতে পাবেন। সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি মালিকানায় অনেক প্রতিষ্ঠানে ভিয়েতনামের পঙ্গু মানুষদের পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। দেখলে চোখে পানি না এসে পারে না। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। কেউ কথা বলতে পারে না। যেসব মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে বেঁচে গিয়েছিল, তারা যখন সংসার করতে চাইল তখনই তাদের ঘরে জন্ম নিল এসব বিকলাঙ্গ শিশু। আমেরিকানরা কি একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেছে- কী ক্ষতি করেছে তারা ভিয়েতনামের মানুষের? একদল খারাপ মানুষ এসব কাজ করলে সান্ত¡না পাওয়ার সুযোগ থাকতো। কিন্তু এমন কেমিক্যাল উইপন, বিষ প্রয়োগ, বোম্বিং ইত্যাদি অমানবিক কাজ করবে পৃথিবীর স্বীকৃত সভ্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী- এটা ঠিক মেনে নেয়া যায় না। এ কাজে তাদের রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ছিল, সরকারের আদেশ ছিল, গোটা সেনাবাহিনীর অনুমোদন ছিল। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগতভাবে কিছু কিছু আমেরিকানরা এই অমানবিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও আমেরিকায় পরপর তিনজন প্রেসিডেন্টই এই অন্যায় যুদ্ধের অনুমোদন প্রদান করেছিলেন। আমেরিকার গুটিকতক মানুষ যারা বুঝতে পেরেছিলেন আমেরিকা অন্যায় যুদ্ধ করছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল এক হাজার অধ্যাপক। ১৯৬৫ সালের ১৩ মে নিউইয়র্ক টাইমসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজার শিক্ষক একটি বিবৃতিতে প্রকাশ করে যে, ভিয়েতনামে আমেরিকান সেনারা মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত যুদ্ধে লিপ্ত আছে। ১৯৬৭ সালের ২ মে বার্টান্ড রাসেল বলেন, ভিয়েতনামে আমেরিকানরা গণহত্যায় লিপ্ত। এমনকি যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকার ডিফেন্স সেক্রেটারি রবার্ট ম্যাকনামারা যুদ্ধ শেষে স্বীকার করেন যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ আমেরিকার জন্য ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যা-ই হোক, সবশেষে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ভিয়েতনাম সেনারা তাদের মাতৃভূমিকে স্বাধীন হিসেবে উদ্ধার করে জয়মালা ছিনিয়ে নেয় আমেরিকার কাছ থেকে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

Bhorerkagoj