নড়িয়া রক্ষায় গৃহীত পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সম্প্রতি অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে নড়িয়ায় নদী ভাঙন। প্রায় তিন মাস ধরে অবিরত চলছে পদ্মার বিষাক্ত ছোবল। এই বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলা। এই ভাঙন নিয়ে অনেকের মনে যেমন বিভিন্ন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তেমনই অনেকেই আবার এ নিয়ে কৌত‚হল প্রকাশ করেছে। মানুষের ভাবনাগুলো এখন এমন শরীয়তপুরের মানচিত্রে নড়িয়া উপজেলার চিহ্ন থাকবে তো! এইতো কিছুদিন আগেও পদ্মা পাড়ের লোকজন অনেকটা গর্ব করেই বলত যে আমরা পদ্মা পাড়ের বাসিন্দা। আমরা সংগ্রাম করে বাঁচি পদ্মার প্রবল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে আমাদের জীবন। কিন্তু এই কয়েক মাসে পদ্মার নির্দয় ছোবলে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পদ্মার তীরে বসবাসরত মানুষের মুখের সেই স্বাভাবিক কথাগুলা। বিশেষ করে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মানুষের কাছে পদ্মা মানেই অতঙ্কের নাম, পদ্মা মানেই সর্বনাশা কোনো এক নদীর নাম, পদ্মা মানেই বেঁচে থাকার শেষ সম্বল বাবার রেখে যাওয়া ভিটেমাটি গ্রাস করা একটি প্রত্যয়, পদ্মা মানেই স্বপ্ন চুরি করা এক নদী।

এখন আর পদ্মা নড়িয়াবাসীর কাছে কোনো উপমার নাম নয়। এখন পদ্মা মানেই আতঙ্ক। পদ্মার নাম শুনলেই স্বাভাবিকভাবেই তারা আঁতকে ওঠে। পদ্মা এখন আর তাদের মনে দোলা দেয় না, এখন আর তারা ঘুমানোর আগে পদ্মার কলকল শব্দ শুনতে চায় না। পদ্মা এখন তার আবেদন হারিয়েছে নড়িয়াবাসীর কাছে।

এখন চোখের সামনেই অবসান ঘটছে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার পদ্মার তীরবর্তী মানুষের লালিত স্বপ্নের। চোখের সামনেই একের পর এক বাড়ি, সড়ক, বাজার, মসজিদ, মন্দির, হাসপাতাল সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর নীরবে তাকিয়ে দেখছে নড়িয়াবাসী। তাদের এই নীরব দর্শকের মতো দেখে যাওয়াটা আজকালের নয়। পদ্মার ভাঙনও নতুন কিছু নয় এই অঞ্চলের মানুষের কাছে। কিন্তু এবারের ভাঙন অতীতকে ছাপিয়ে গেছে। প্রায় ৭ বছর ধরেই চলছে পদ্মার অবিরত আঘাত। কিন্তু এবারের সর্বগ্রাসী আঘাতে ক্লান্ত নড়িয়াবাসী। এবারেই সবচেয়ে বেশি অবকাঠামো ভাঙনের কবলে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঈঊঘঞঊজ ঋঙজ ঊঘঠওজঙঘগঊঘঞ ্ এঊঙএজঅচঐওঈঅখ ওঘঋঙজগঅঞওঙঘ ঝঊজঠওঈঊ (ঈঊএওঝ) এর তথ্য মতে, গত সাত বছরে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার প্রায় ১৩ কিলোমিটার এলাকা নদীতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ সময়কাল পর্যন্ত নড়িয়াতে প্রতি বছরে গড়ে আধা কিলোমিটারের বেশি এলাকা ভাঙনের শিকার হয়। ২০১৭-১৮ (জুন) পর্যন্ত ভেঙেছে প্রায় ৪ বর্গকিলোমিটার, আর সম্প্রতি জুলাই থেকে ভেঙেছে প্রায় ২.৫০ কিলোমিটারের মতো।

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পদ্মার ভাঙনের শিকার হয়েছে পাঁচ হাজার ৮১টি পরিবার। ঝুঁকিতে রয়েছে আরো প্রায় ৮ হাজার পরিবার। তবে স্থানীয়রা বলছেন, ৬ হাজারেরও বেশি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে।

যে মানুষগুলো একসময় নিজেদের বসত বাড়িতেই রাত কাটিয়েছিল, ছোট্ট ঘরেই বসে যারা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখত এবং স্বপ্নের জাল বুনত, সেই মানুষগুলোর আজ মাথা গোঁজার জায়গা নেই। আজ তারা প্রকৃতির বুকে মুখ লুকায়। আবার কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়িতেই দিন কাটাচ্ছে। নদী ভাঙনের শিকার মানুষগুলোর দুর্দশার কথা ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব।

নড়িয়ায় নদী ভাঙনের সংকেত অনেক আগে থেকে দেয়া হলেও গুরুত্বসহকারে নদী ভাঙন রোধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ এর আগে নেয়া হয়নি। কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও যথাযথ তদারকির অভাবে প্রকল্পগুলো কোনো কাজে আসেনি। অতিসম্প্রতি নড়িয়া ও জাজিরাকে সর্বগ্রাসী পদ্মার ছোবল থেকে রক্ষা করতে ১ হাজার ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। শরীয়তপুরের মানচিত্র থেকে যাতে নড়িয়া হারিয়ে না যায় সে জন্য প্রয়োজন প্রকল্পের অতিদ্রুত কার্যকরী বাস্তবায়ন। নদী ভাঙন রোধের জন্য নদী খনন, বেড়িবাঁধ ইত্যাদি পদক্ষেপের পাশাপাশি নদী ভাঙনের শিকার মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে বিশেষ কমিটি গঠন এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

রাজু আহমেদ

শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

Bhorerkagoj