জনগণ, উন্নয়ন এবং আগামীর নির্বাচন

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নির্বাচনের আর মাত্র ক’মাস বাকি। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে নির্বাচনী ডামাডোল। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রচারণা আছে, সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে আবারো আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, তাতে অনেকেরই দ্বিমত নেই। শিক্ষা, কৃষি, বস্ত্র, শিল্প প্রভৃতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বলেই একটা প্রচারণা আছে। বছরের শুরুতে একটা নির্ধারিত দিনে বিনামূল্যে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণ, ১০ বছরে ২৪ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন ভবন তৈরি করা প্রভৃতি কোনো সাধারণ কাজ নয়। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। যদিও উন্নত দেশগুলোসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই সময়ে সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। এসব দেশেও যে সব ব্যবস্থাই সব সময় কার্যকর হয়, তা নয়। কিন্তু সার্বিক শিক্ষা পদ্ধতির গুণগত পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উড়িয়ে দেয়া যায় না। কওমিদের সঙ্গে সরকারের মাখামাখি ভোটের বাজারে আওয়ামী লীগকে একটা বড় ধরনের সুযোগ দিয়ে দেবে বলেই হয়তো এমনকি সরকারের শেষ সংসদ অধিবেশনে এসেই কওমি শিক্ষার্থীদের দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড আরবি) মর্যাদা দিয়ে সব বিতর্কের ইতি টেনেছে সরকার। যদিও শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষাকে ঘিরে দুর্নীতির কথাটি বহু উচ্চারিত। এমনকি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পর্যন্ত জনসমক্ষে সাহস করে বলে দিয়েছিলেন ‘সহনীয় পর্যায়ে উৎকোচ’ গ্রহণের কথাটি।

কৃষিক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা শুধু ধানই নয়, নতুন নতুন ফলনে উদ্যোগী হয়েছেন। জেলায়, উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তারা দিয়ে যাচ্ছেন প্রয়োজনীয় উপদেশ-নির্দেশনা। প্রযুক্তি খাতে আছে পৃথিবীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ডিজিটাল আইন অধ্যাদেশ সংসদে পাস করে গণমাধ্যমের বিপরীতেই দাঁড়িয়ে গেল সরকার। নতুন খড়্গ যেন নামল গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর। জবরজং রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, তবুও অস্বীকার করার উপায় নেই ঢেলে সাজানো হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পদ্মা সেতুসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন নতুন ব্রিজ স্থাপন কিংবা রাস্তা সংস্কার করে যোগাযোগের দ্বার খুলে দেয়া হচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না হলেও উদ্যোগ আছে, যদিও সংস্কার কাজ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন।

গত দশ বছরের সরকার পরিচালনার হিসাব মেলাবে মানুষ এই নির্বাচনে। নির্বাচন নিয়ে বিরোধী শিবির থেকে যে কথাগুলো উচ্চারণ করা হোক না কেন, সরকার নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নিবে বলেই মনে হচ্ছে। গতবারের মতো নির্বাচনবিহীন ১৫৩ আসন মনোনীত করার দায়ভার হয়তো এবারে নিতে চাইবে না আওয়ামী লীগ। কারণ সাংগঠনিকভাবে যত দুর্বলতাই থাকুক না কেন, সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ সার্থকতা দেখিয়েছে। বিরোধী দলগুলো কাক্সিক্ষত আন্দোলন দাঁড় করাতে পারেনি। আর আন্দোলন বেগবান করবেইবা কীভাবে। সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কারণ সরকারের কাজই হলো দেশে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা। শিক্ষা, চিকিৎসা তথা রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা। প্রবাসী রেমিটেন্স, পোশাক শিল্প, দেশীয় উদ্যোক্তা সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের প্রবাহ আছে দেশে। দাতা সংস্থাগুলো মুখ ফেরাচ্ছে না। সেসব কারণে ঝটপট সিদ্ধান্ত নিতে পারছে সরকার। অথচ প্রতিটি সেক্টরেই বিভিন্ন সমালোচনা এসেছে। ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ দুর্র্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের কথা সীমিত আকারে হলেও গণমাধ্যমে এসেছে। বিশেষত হাজার হাজার কোটি টাকা বায়বীয় উপায়ে বেরিয়ে গেছে দেশ থেকে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট আছে। সরাসরি জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু আছে, যেগুলো সরকারের জন্য সমালোচনা নিয়ে এসেছে। বিএনপি এগুলোর বিরুদ্ধে কি দাঁড়াতে পেরেছিল? তেল-গ্যাসের আন্দোলন, শিক্ষা-চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ প্রভৃতি জনসম্পৃক্ত ইস্যুগুলো নিয়ে এরা মাঠে নামেনি। আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপির সমালোচনায় মাঠে ছিল, ঠিক তেমনই তাদের সামনে ছিল বিভিন্ন উন্নয়নের ¯েøাগান। অথচ এই উন্নয়নের ফাঁক-ফোকরে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল বা আছে, সেগুলো নিয়ে কোনো জোরালো বক্তব্য উচ্চারণ করতে পারেনি বিএনপি, যতটুকু জোর দিয়ে তারা খালেদা জিয়ার মামলা-জেল কিংবা তারেক জিয়ার ব্যক্তিগত সমস্যার কথা তুলেছে। সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশের মানুষের কাছে খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়া কিংবা তারেক জিয়ার নির্বাসন খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমনকি এই দুটো ইস্যু জনমনে কোনো আবেগ সৃষ্টি করতে পারেনি। তারেক জিয়া লন্ডনে বসে মাঝে মাঝে দলীয় কর্মীদের ডেকে গরম বক্তৃতা দিয়েছেন, এতে যুক্তরাজ্যের কর্মীদের মাঝেও খুব একটা বড় কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। দেশেও খুব একটা প্রতিশ্রæতি পয়দা হতে দেখিনি আমরা। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দুটো অত্যন্ত জনপ্রিয় আন্দোলন কোটা আন্দোলন কিংবা নিরাপদ সড়কের আন্দোলন থেকে বিএনপি কোনোই সুবিধা নিতে পারেনি। কারণ বিএনপি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য শর্টকাট রাজনীতিই করেছে। জনগণ শুধু ক্ষমতার পালাবদল চায় না। প্রতিশ্রæতি চায়, জনসম্পৃক্ততা চায়। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি উদ্যোগ আছে, সরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক। আগেকার সময়ের দুর্ভিক্ষ-মঙ্গা প্রভৃতি শব্দগুলো বলতে গেলে এখন আর নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও এগুলো প্রচার করা হয়।

সরকারের শেষ সময়ে এসে একটা খবর সারা পৃথিবীরই চোখে পড়েছে। আর এ খবরে দারিদ্র্য বিমোচন শব্দটাই যেন উবে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অতিদরিদ্র শব্দটা বিভিন্নভাবেই উচ্চারিত। এই শব্দের পাশাপাশি অতিধনী একটা শব্দ এবার যোগ হয়েছে। বাংলাদেশে এমনিতেই একটা লুম্পেন শ্রেণির সৃষ্টি হচ্ছে, যারা শুধু টেন্ডারবাজি কিংবা কোনো কিছু না করেই কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। কী এক অদ্ভুত ব্যবস্থায় আমাদের দেশের কিছু কিছু সরকারি চাকরিজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এমনকি ছাত্র নেতারাও অল্পদিনের মধ্যেই কোটিপতি হয়ে উঠছেন, এদের অনেকেরই কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা সম্পদ হওয়ার মতো সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এরকম কোটিপতি হওয়ার সংখ্যা ২০১২ সাল থেকে আশ্চর্যজনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশে এখন নাকি গড়ে পাঁচ হাজার মানুষ কোটিপতি হচ্ছেন প্রতি বছর। প্রশ্ন থেকে যায়, এত দ্রুত অতিধনীদের তুলনায় দারিদ্র্য বিমোচন অতিদ্রুত না হোক দ্রুত কি কমানো যাচ্ছে। ওয়েলথ এক্স নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ৫১২ লাখ মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিককে অতিধনী হিসেবে বিশেষায়িত করছে। আশ্চর্যজনকভাবে এই সংখ্যাটি পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশেই বাড়ছে ইদানীং এ বছরে। এটাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হিসেবে দেখা যাবে কিনা জানি না, তবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় এ এক অসম উন্নয়ন, যা থেকে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির উত্থান হচ্ছে, অন্যদিকে এভাবে বায়বীয় উপায়ে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া অতিধনীদের শোষণ কিংবা লুটপাটের কারণে দারিদ্র্য বিমোচন লক্ষ্যটি এক সময় মুখ খুবড়ে পড়ে থাকাটাই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।

আগামী নির্বাচনে এসব হিসাব-নিকাশ আসতেই পারে। দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীনদের অনেকেই, কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এরা অন্তত আগামী নির্বাচনে জনতার কাছে যেন না আসতে পারে, এ ব্যাপারটা নিশ্চিত হোক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতামুক্ত একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন-সাধ সারা বাংলাদেশের মানুষের। মানুষ এ আস্থার জায়গাটুকু হয়তো আওয়ামী লীগেই খুঁজে পেতে চায়। উন্নয়নের যে ¯েøাগান বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে, ক্ষমতার হাল পুনরায় ধরে রাখতে অতীতে যেমন সরকারের অনেক কর্মযজ্ঞ উল্লেখ করা যাবে, ঠিক তেমনই আছে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। এসব কিছুই তো বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা বিশ^াস করতে চাই আওয়ামী লীগ হারলে জনগণই হারবে। জনগণকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে জনগণের ধ্বনিরই যেন প্রতিধ্বনি করে বর্তমান বাংলাদেশের দলগুলো।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. সজিবুর রহমান সজীব

মানবতা যে ঘরে পদদলিত

মযহারুল ইসলাম বাবলা

ক্ষমতার রাজনীতি ও কাশ্মির সংকট

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর আদায় নয় আহরণ

আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

বায়ুদূষণ রোধে করণীয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রাষ্ট্রের স্বভাব ও চরিত্র

মাহফুজা অনন্যা

পেঁয়াজ সংকট কোন পথে?

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

একজন সৃজনশীল সুভাষ দত্ত

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

Bhorerkagoj