প্রসঙ্গ : মোবাইল ভোটিং পদ্ধতি

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

যথাযথ নির্বাচনের পর যে দলই সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করুক আমরা শ্রদ্ধাভরে তাদের নেতৃত্ব মেনে চলতে চাই। নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা। কাজেই সে লক্ষ্যে আমাদের দেশের ভোটিং পদ্ধতির যুগোপযোগী সংস্কার প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির বিবেচনায় ভোটগ্রহণের এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি যাতে নির্বাচন সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তবে বলে রাখা ভালো যে কোনো বিষয়ে এমন কোনো পদ্ধতি নেই যার মধ্যে যৎসামান্য ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাজেই ভালো-মন্দ সবদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সর্বাধিক ত্রুটিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য ভোটপ্রদান পদ্ধতি উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। যদিও নতুন যে কোনো পদ্ধতি উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন অনেক কঠিন। তারপরও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে ভেবেচিন্তে সংস্কার করা দরকার।

প্রস্তাবিত মোবাইল ভোটিং পদ্ধতি হচ্ছে একজন ভোটার, তিনি যেখানে অবস্থান করুন না কেন, তিনি তার অবস্থান থেকেই ‘ফিঙ্গার প্রিন্টের’ মাধ্যমে ভোটপ্রদান করতে পারার পদ্ধতি। যাকে ‘ডিজিটাল ভোটিং মেথড’ বা ‘মোবাইল ভোটিং পদ্ধতি’ নামে অবিহিত করা যেতে পারে। ওই পদ্ধতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞ দায়িত্বশীলদের মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা আবশ্যক। সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে নির্বাচন সংক্রান্ত একটি ‘নির্বাচন অ্যাপ’ তৈরি করবে। এতে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকবেই। সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ‘নির্বাচন অ্যাপ’টি তৈরি করা হলে প্রস্তাবিত পদ্ধতিটি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে মনে করি না।

প্রথমত একটি ‘নির্বাচন অ্যাপ’ তৈরি করতে হবে। সেখানে নির্বাচন কমিশন মোবাইল ভোটিংয়ের জন্য বাংলাদেশের বৈধ নাগরিককে নিয়ম মোতাবেক যথাযথ পদ্ধতিতে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত করবে। প্রত্যেক ভোটারের জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অতি প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্যাদি মোবাইল ভোটার অ্যাকাউন্টে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন/জাতীয় বা সংসদীয় আসনের নির্বাচনের লক্ষ্যে ‘ডিজিটাল ব্যালট পেপারে’ প্রার্থীদের নাম ও কোড নম্বর, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রতীক ইত্যাদি সময়ে সময়ে নির্বাচন মোতাবেক, নির্বাচন অ্যাপে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সেখানে ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে ‘কেন্দ্রভিত্তিক ভোটারই’ তার ভোট, কেন্দ্রওয়ারি (নির্বাচন অ্যাপে সন্নিবেশিত কেন্দ্রটির মাধ্যমে ভোটার তার ভোট) প্রদান করবে। এজন্যে তৈরিকৃত ‘নির্বাচন অ্যাপটি ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানারযুক্ত যে কোনো মোবাইল ফোন, ট্যাব, নোটপ্যাড, ল্যাপটপ বা নির্বাচন ডিভাইসে ডাউনলোড বা ইনস্টল’ করে ভোটপ্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। নির্বাচন কমিশন ভোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘দল’, দলের মনোনীত ‘প্রার্থী’, প্রার্থীদের নামে বরাদ্দকৃত ‘প্রতীক’সহ নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য ‘প্রয়োজনীয় তথ্য’ ভোটিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে সময়মতো মোবাইল ভোটিং পদ্ধতিতে সন্নিবেশিত করবে। নির্বাচনকালে নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেয়া ‘নির্ধারিত সময়ের আগে’ নির্বাচন অ্যাপ ‘অটো বন্ধ থাকা’ এবং ভোটের জন্য বেঁধে দেয়া ‘নির্ধারিত সময়ের পর’ ভোটপ্রদান ‘কার্যক্রম অটো বন্ধ’ হয়ে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা নির্বাচন অ্যাপে থাকবে। ভোটারের প্রদত্ত ভোটটি কাস্ট হলে বা না হলে রিপ্লাই মেসেজে তা ভোটারকে জানানো হবে। ভোট গৃহীত হলে অ্যাপসের অপশন লক হয়ে যাবে। এতে করে দ্বিতীয়বার আর কেউ ভোট দিতে পারবে না।

মোবাইল ভোটিংয়ে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানারযুক্ত ‘ইলেকশন ডিভাইস’ বা মোবাইল, ফিঙ্গার প্রিন্ট ডিভাইস সহজলভ্যভাবে বাজারজাত করা, কীভাবে ভোট দেবে সে বিষয়ে যথোপযুক্ত ‘প্রচার মাধ্যমে প্রচার’ করার ব্যবস্থা করা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নির্বাচন পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্পর্কে ‘প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা’ করতে হবে। মোবাইল ভোটিং কার্যক্রমের জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত নির্বাচন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য ‘ইন্টারনেট সেবার গতি বৃদ্ধি’, ‘কেন্দ্রওয়ারি ভোটারের’ সংখ্যা অনুপাতে ‘পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক ’ উন্নয়ন ও ভোট কাস্টিং তথ্য ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়াও মোবাইল ভোটিং পদ্ধতির অপারেটিং সিস্টেম অথবা সার্ভার যেন হ্যাং না হয় কিংবা নির্বাচনকালীন যেন হ্যাকিংয়ের শিকার না হয় সে জন্য ‘সাইবার হামলা রোধক’ প্রযুক্তিগত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচনকালে ভোটার যেখানেই অবস্থান করুন না কেন তিনি স্বাভাবিক নিয়মে তার ব্যবহৃত ইলেকশন ডিভাইসে ফিঙ্গার প্রিন্ট বা ফিঙ্গার টাচের মাধ্যমে ‘নির্বাচন অ্যাপে’ টাচ করবেন। তিনি ভোটার হলে ‘তার ভোট কেন্দ্রের প্রোফাইল’ বা তথ্য পৃষ্ঠা ওপেন হবে। এরপর নেক্সট অপশনে ক্লিক করলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন ও ভোট সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ফেজ, ‘ব্যালট পেপার পেজ’ ওপেন হবে। (সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আসন, প্রার্থীদের নাম, ছবি, প্রতীকসহ ব্যালট পেপার পেজ ভেসে উঠবে)। তারপর ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে বা নির্ধারিত স্থানে ‘আঙ্গুলের ছাপ’ দিয়ে টাচ করে ভোটপ্রদান করবেন। প্রয়োজনীয় ‘রিপ্লাই মেসেজ পাবেন’ এবং সে মোতাবেক ভোটদানের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হবেন।

এভাবে যদি মোবাইল ভোটিং হয় তবে দেশ ও জাতি নানাভাবে উপকৃত হবে। বিশেষত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা সংক্রান্ত ইস্যুটি বড় করে দেখার সুযোগ থাকবে না। এই পদ্ধতিতে ভোট গৃহীত হলে নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তেমন থাকার কথা নয়। মোবাইল ভোটিং পদ্ধতিতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিমূলক ঝামেলা বর্তমানের তুলনায় অনেক কমে যাবে। নিবন্ধিত ভোটাররা দেশে-বিদেশে, ঘরে-বাইরে, বাসে-ট্রেনে, লঞ্চে কিংবা যে যেখানে, যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন মোবাইল ডিভাইস থেকে ইলেকশন অ্যাপের দ্বারা সহজেই ফিঙ্গার টাচের মাধ্যমে ভোট প্রদান করতে পারবেন। অনেক বেশিসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারবেন। বিভিন্ন অজুহাতে যেসব ভোটার ভোট দেন না, এমনকি যেসব মহিলা ঘর থেকে বের হয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে কখনো ভোট দেননি, এ ধরনের মা-বোনেরা ঘরে বসে ভোট দেয়ার সুবিধার কারণে ভোট দিতে পারবেন; প্রকারান্তরে ভোট কাস্টিং বেশি হবে। ভোটার তার ফিঙ্গার প্রিন্ট বা টাচের মাধ্যমে ভোট দেয়ার কারণে একজনের ভোট অন্যজন কোনোভাবেই প্রদান করতে পারবেন না। তাই জাল ভোট দেয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। মৃত ব্যক্তি কিংবা অনুপস্থিত ব্যক্তির পক্ষের ভোট দেয়া সম্ভব নয়। এ ব্যবস্থায় ব্যালট বক্স লাগবে না। ব্যালট বক্স ছিনতাইয়ের সুযোগও থাকবে না। ব্যালট পেপার লাগবে না। তাই ব্যালট পেপার সংক্রান্ত কোনো বিড়ম্বনা থাকবে না। বাস্তবে ‘ভোট কেন্দ্রের’ প্রয়োজন নেই। কাজেই ‘কেন্দ্র’ প্রস্তুত করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনারও প্রয়োজন নেই। সে পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কেন্দ্র দখলসহ নানা ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কাজে প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, পোলিং এজেন্ট ইত্যাদি কাজে বহুসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি স্টাফ, শিক্ষক কর্মচারী কিংবা অন্য কোনো জনশক্তিকে তাদের স্ব স্ব কর্মস্থল কিংবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে নির্বাচন কাজে মূল্যবান সময় ও ঝুঁকি নিতে হবে না। নির্বাচন আয়োজনের কাজে অনেক বেশিসংখ্যক আর্মি, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ভিডিপিসহ বিশাল সমন্বিত বাহিনীকে তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে ও জীবন বাজি রেখে ভোটগ্রহণ কাজে ব্যস্ত থাকার প্রয়োজন হবে না। নির্বাচনী উপকরণ তৈরি, সংগ্রহ, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন ও ব্যবহার, নির্বাচনী উপকরণের জোগান দিতে গিয়ে বিশাল টেন্ডার প্রক্রিয়ার ঝামেলা থাকবে না। সরকার, নির্বাচন কমিশন, দল এবং প্রার্থী সবাই মিলে নির্বাচনকালীন কার্যক্রমে কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী ব্যয় কমে যাবে। ভোটারগণকে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে ভোটকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। ভোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও ভোটাররা তাদের ব্যস্ততার মাঝেও স্ব-অবস্থান থেকে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবেন। এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি ভোটারকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সফল বাস্তবায়ন অনেকদূর এগিয়ে যাবে। আমি মনে করি, মোবাইল ভোটিংয়ের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে।

মোবাইল ভোটিং পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, যে দেশ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে পারে, সে দেশের সরকার এবং নির্বাচন কর্তৃপক্ষের স্বদিচ্ছা থাকলে, সব প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করে তা বাস্তবায়ন সম্ভব। যা বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইলেকশন পদ্ধতির ‘মডেল’ হতে পারে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী : শিক্ষাবিদ ও গবেষক;
অধ্যক্ষ, হাজীগঞ্জ মডেল কলেজ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

Bhorerkagoj