ক্ষমতায় যেতে বিএনপির শেষ চেষ্টা

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮


জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণলিপি পেয়ে কি ভেবেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, সংক্ষেপে বিএনপি? হয়তো ভেবেছিল বাংলাদেশে নির্বাচন প্রশ্নে তাদের দেয়া শর্তগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে! সে সময় একটা জয় জয় ভাব দেখা গিয়েছিল তাদের মধ্যে।

শেষ পর্যন্ত বিএনপি সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে সব মিলিয়ে তিন দলীয় একটি প্রতিনিধিদল নির্দিষ্ট সময়ে নিউইয়র্ক গিয়েছিল। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কারো কারো হাব-ভাব দেখে মনে হচ্ছিল মির্জা ফখরুলরা যেন কোনো শীর্ষ বৈঠকে যাচ্ছেন। রাজনীতিতে অভিজ্ঞ লোকজন তখনই বুঝেছিলেন রাজনীতিতে বিএনপির যে অপরিপক্বতা কম বেশি বরাবর ছিল সেটা সময়ে লোপ পাওয়ার বদলে আরো যেন খানিকটা বেড়েছে। জাতিসংঘ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সংস্থা। তবে কোনো স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নির্বাচন প্রশ্নে তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করা ছাড়া, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহলের অংশগ্রহণ নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা করা ছাড়া বিশেষ আর কি করতে পারে? নির্বাচনে বিএনপিকে জয়ী করার আশ^াস তো দিতে পারে না! ক্ষমতায় তো বসিয়ে দিতে পারে না!

রাজনীতি-অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অনেকের ধারণা বিএনপি এমনটাই আশা করেছিল। রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে এখানেই দলটির অপরিক্বতা খানিকটা হলেও ধরা পড়ে।

বিএনপির নিউইয়র্ক মিশন শুধু ব্যর্থ নয়, প্রতিপক্ষের মধ্যে ম্যালা ঠাট্টা ও হাসাহাসির জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি জেনারেল ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলতে ছাড়েননি যে বিএনপির নিউইয়র্ক মিশন হতাশা ও অশ্রæপাতে শেষ হয়েছে! এই উক্তির কোনো জবাব বিএনপির কেউ দিতে পেরেছেন বলে জানি না।

বিএনপির নিউইয়র্ক মিশন ব্যর্থ হয়েছে। তবে এই ব্যর্থতার মধ্যে কিছু সাফল্যও অর্জিত হয়েছে যা দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে বেশ খানিকটা উজ্জীবিত করে তুলতে পারে। বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এখন দাঁড়িয়েছে সহিংসতা বা নাশকতার পক্ষে নয়, নির্বাচনের পক্ষে। মির্জা ফখরুল নিউইয়র্ক থেকে একবার, নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা ফেরার পথে আর একবার লন্ডন গেছেন। এই দুইবারের যাওয়া যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত প্রধান তারেক রহমানের কাছে, সেটা আশা করি বলার প্রয়োজন নেই।

সিদ্ধান্ত সম্ভবত তারেক রহমানের। খালেদা জিয়া জেলে থাকুন বা বাইরে, বিএনপি নির্বাচনে যোগ দেবে।

বাংলাদেশে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। অবশ্য এরপরও সতর্ক থাকা দরকার। কে না জানে কতক ক্ষেত্রে রাজনীতিতে বিএনপি বলে একটা, করে আরেকটা। অতীতে একাধিকবার বিএনপি এ রকম করেছে। এবারেও যে করবে না তার নিশ্চয়তা নেই।

তবু আমরা আশা করব বিএনপি নির্বাচনে আসবে। ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কট করে তারা যে ভুল করেছিল তা ছিল আত্মঘাতী। নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মেরেছিল আবার অগ্নি-সন্ত্রাসের আসামিদের ধরলে বা ধরতে গেলে বিএনপির শীর্ষ নেতারা যেন বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়ে। তারা বলে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে টিকে আছে হামলা ও মামলার জোরে। জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। জনগণ তাদের সমর্থন করে না।

বিএনপির জিহ্বা-সর্বস্ব শীর্ষ নেতাদের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার আগ্রহ সেই নেতাদের বেশি থাকার কথা ছিল। বিএনপির বেলায় তেমনটা দেখা যায় না কেন? অগ্নি-সন্ত্রাস মামলার আসামিদের পুলিশ ধরলেই বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কিছু লোক, সুজন জাতীয় বিএনপিমনা প্রতিষ্ঠান, ড. কামাল হোসেন, একদা দলীয় আনুগত্যের জেরে হওয়া কয়েকজন সাবেক বিএনপি দলীয় ভাইস চ্যান্সেলর হাহাকার করে ওঠেন। তারা বলেন যে, দেশে গণতন্ত্র থাকলে এসব ধরপাকড় ঘটতে পারত না। গণতন্ত্র বুঝি অগ্নি-সন্ত্রাসের আসামিদের ছেড়ে দেয়?

যারা অগ্নি-সন্ত্রাস করে মানুষ মেরেছে, অর্থনীতির ক্ষতি করেছে তাদের ধরা বা আইন মোতাবেক শাস্তি দেয়া গণতন্ত্রের কোনো হানি নয়। বরং বিচার করে এই ধরনের লোকদের শাস্তি বিধান করাই গণতান্ত্রিক সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিএনপি তাদের আমলে রাজনৈতিক হত্যার কোনো বিচার করত না। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি তৈরি করে বরং তারা, বিএনপি, গণতন্ত্রকে কয়েদখানায় বন্দি করে রেখেছিল। জাতিসংঘ বুঝি এসব খবর রাখে না?

নিউইয়র্ক মিশন শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে। এরপর বিএনপি সম্পর্কে দুই রকমের কথা শুনছি। শুনছি যে খালেদা জিয়া জেলে থাকলেও বিএনপি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে যোগ দেবে। সংঘর্ষ ও রক্তপাতের পথ এড়িয়ে নির্বাচনে যোগ দেবে। সংঘর্ষ ও রক্তপাতের পথ এড়িয়ে নির্বাচনে যোগ দেয়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় পাওয়া কিংবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার নামই তো গণতন্ত্র। প্রসঙ্গক্রমে বলি বিএনপির কোনো কোনো শীর্ষ ও মাঝারি স্তরের নেতা মাঝে মাঝে বলেন যে এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে আওয়ামী জোট নাকি ৪০টার বেশি আসন পাবে না।

রাজনীতির বাস্তবতা যদি তেমনটাই হয় তাহলে বিএনপি গত সাড়ে নয় বছরে সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে পারল না কেন? কেন নির্বাচনের কথা শুনলে নির্বাচনে যেতে ভয় পায়। সংবিধান থাকতেও নানা রকম শর্ত জুড়ে দেয়?

বিএনপি নির্বাচন করবে শুনছি আবার শুনছি তারা তাদের নালিশ ও নির্বাচনী ছক নিয়ে অতি সত্বর ইইউ এবং ব্রিটেনে যাবে। উদ্দেশ্য একই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে স্বৈরাচারী, গণতন্ত্রের ঘোর শত্রু এবং বিএনপি যে গণতন্ত্রের নিবিড় অনুসারী, এটা ইইউ এবং ব্রিটেনকে বুঝানো।

নিউইয়র্ক মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপির একই মিশন নিয়ে ইউরোপে যাওয়াটা ¯্রফে বোকামি হবে। জাতিসংঘের মতে ইউরোপও বলবে নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় সেটা আমরা দেখব। বলতে পারে নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা যাতে অধিক সংখ্যায় বাংলাদেশের নির্বাচন দেখতে যায়, সে ব্যাপারে আমরা লক্ষ্য রাখব। এর বেশি কিছু ইংরেজ আর কি বা বলতে পারে? নির্বাচন কি ভণ্ডুল করে দিতে পারে বিএনপির প্রতি অপত্য ¯েœহে কাতর হবে? বিএনপি নির্বাচনে জিতুক না জিতুক, বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে পারে বিএনপিকে?

বিএনপি এ রকম ভাবে কিনা নিশ্চিত তা বলতে পারি না। তবে এসব দৃশ্যত অর্থহীন মিশনে যাওয়ার পেছনে একটা কারণ যে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গত সাড়ে নয় বছরে বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বহু ক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক’দিন আগে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলছিলেন যে পাকিস্তানকে আমরা প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ডে পরিণত করব। তখন এক পার্লামেন্ট সদস্য উঠে দাঁড়িয়ে বিনীত কণ্ঠে বলেন, অত দূর যাওয়ার দরকার নেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানকে অন্তত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো সক্ষম আর গতিশীল করে দিন।

পাশ্চাত্য বিশ^ বেশ ভালো জানে, বিএনপি আওয়ামী লীগ কে কতটা গণতান্ত্রিক দল! কোন দল বন্দুকের দল থেকে বেরিয়েছে, কোন দল বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে কত আপসহীন সংগ্রামে রত হয়েছে, কত জেল-জুলুম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার শিকার হয়েছে! তাদের কাছে ওসব নালিশ নিয়ে গিয়ে বিএনপির কি লাভ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এসেই যায়।

এসব কিছু না করে বিএনপি যদি জনসম্পৃক্ততার বিষয়ে আরো মনোযোগ দিত, আরো সক্রিয় হতো তাহলে নির্বাচনে তারা যে ভালো লড়াই দিতে পারত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগও তারা পেত অতি অবশ্যই।

সেই সুযোগ বিএনপির এখন যে আর নেই তা বলা যায় কি করে! নির্বাচনী ফলাফলই শুধু এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

আপাতত বিএনপি নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি বিশে^র শক্তিশালী সংস্থার কাছে ধরনা দিচ্ছে। মনে হয় তাদের উৎসাহ জোগাচ্ছে ২০০১ সালের নির্বাচন। সে সময় বিভিন্ন জরিপে নির্বাচনী যুদ্ধে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের দিন দশ-পনের আগে হঠাৎ আওয়ামী লীগের নিশ্চিত ১০০টি আসনে হানা দিল ইউনিফর্ম পরা লোক। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থকদের এমন মারধর চালানো হলো যে তারা পালিয়ে বাঁচে না। সেটা অলিখিত টুয়েসডে ক্লাবের একটা ষড়যন্ত্র ছিল বটে।

বিএনপি এবার যে পন্থায় হোক ক্ষমতায় যেতে চায়। ভেতরে ভেতরে জামায়াত এবং জঙ্গিরা প্ল্যান মাফিক কাজ করে যাচ্ছে। এবার অগ্নি-সন্ত্রাসের চেয়েও হয়তো কৌশলটা আরো ভয়ঙ্কর।

অথবা হয়তো ফাঁকা আওয়াজ। তবু বলি দুর্জনের ছলের অভাব নেই। সতর্ক থাকা এবং নির্বাচনবিরোধীদের যে কোনো আক্রমণের জবাব দিতে প্রস্তুতি থাকা দরকার। জরুরি।

রাহাত খান : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

কতিপয় ছাত্র এমন উচ্ছৃঙ্খল হয় কেন?

Bhorerkagoj