বেকারত্ব ও আমাদের দায়বদ্ধতা

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বেকারত্ব হচ্ছে বেদনার গিরিপথ, দুঃখের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, হাহাকারের সর্বোচ্চ চূড়া, হতাশার মহাসাগর। যা পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতির জন্য এক আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। বেকারত্ব হলো অনিচ্ছাকৃত কর্মহীনতা। এমন ব্যক্তিকে বেকার বিবেচনা করা হয় যিনি সক্রিয়ভাবে কাজের সন্ধান করা বা কাজের জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। হলফ করে বলতে পারি বুক ভরা আশা নিয়ে, হৃদয়ের সব উৎসাহ নিয়ে, দুচোখের কল্পনা দিয়ে প্রতিটা মানুষই চায় সে যেন বেকার না থাকে। তবে কেন দিন দিন বেকারত্বের পরিমাণ ক্রমাগত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে? বিস্মিত হওয়ার বিষয় দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিক্ষিত। শুধু শিক্ষিত নয়, অধিকাংশই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার। প্রচুর পরিমাণে ডিগ্রি অর্জনের সংখ্যা দৃষ্টিগত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতি বছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছে। অথচ শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য স্বাবলম্বী করে তোলা, দরিদ্রতা হ্রাস করা। ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষা হলো দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান শর্ত। শিক্ষিত যুবসমাজ শিক্ষাকে চাকরি লাভের মাধ্যম হিসেবে ভাবছে। ফলে আত্মকর্মী হওয়ার অভিপ্রায় বিলুপ্তের পথে।

আত্মকর্মসংস্থানে যুব শ্রেণির অনীহার অন্যতম কারণ আত্মকর্মী হওয়াকে সমাজে উপযুক্ত মূল্যায়ন না করা। দেশের বিদ্যাপীঠসমূহ থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে আত্মকর্মী হবে তা পরিবার মানতে চায় না। মনস্তাত্তি¡কদের মতে, পরিবার থেকে আগত মানসিক চাপের কারণে ব্যক্তির হতাশা হয় আরো বেগবান। ফলে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় শিক্ষিত যুব সমাজ সরকারি চাকরির পেছনে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু সরকার মোট বেকার জনগোষ্ঠীর কত শতাংশ ব্যক্তির জন্য চাকরি নামক সোনার হরিণের ব্যবস্থা করবে? চাকরির বাজারে জোগানের তুলনায় চাহিদার পরিমাণ অকল্পনীয় হারে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার সমীকরণে দেখা যায় মোট ২ হাজার ২৪টি শূন্য পদের বিপরীতে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩২ প্রার্থীর আবেদন জমা। যা মোট শূন্যপদের তুলনায় প্রায় ১৯২ গুণ।

শিক্ষা বিশ্লেষকরা দাবি করেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে নেই বৃত্তিমূলক কারিগরি ও কর্মমুখী হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ। প্রতি বছর সনদধারী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে কিন্তু দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। তবে আশার বিষয় হচ্ছে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর আগের তুলনায় ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। আত্মকর্মসংস্থানে বেকারদের উৎসাহিত করার জন্য হাতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। মনস্তাত্তি¡করা দাবি করেন পারিবারিক চাপের কারণে হতাশা বেগবান হয় এবং বয়সের সঙ্গে আনুপাতিক হারে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের এই চাপ বাড়তে থাকে। বেকারত্বের কারণে হতাশা যখন চরম শিখরে পৌঁছে যায় তখন মানসিকতার তীব্র অবক্ষয় ঘটে। বেকারত্বের ভয়াল থাবায় দুর্বল হয়ে পড়ে রাষ্ট্রকাঠামো। সমাজে খুন-গুম, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। উদ্বেগের বিষয় বেকারত্বের কারণে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। দেখা দেয় শাসনতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলা।

বেকারত্ব নিরসনের জন্য দেশের সব নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। যুবসমাজকে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে হবে। মনে রাখা সঙ্গত যে আমাদের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে শ্রমের মূল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম, কাঁচামালের সহজলভ্যতা, পরিবহনগত সুযোগসহ অনেক সুবিধা বিদ্যমান। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে কর অবকাশ, কর, শুল্ক ইত্যাদি মওকুফ বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করে আসছে। জনশক্তিকে দক্ষ করার জন্য দেয়া হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক প্রশিক্ষণ। সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাই যুবসমাজকে বেকারত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। বিদ্যমান সুযোগ কাজে লাগিয়ে আত্মকর্মী হওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে হবে। মনে রাখা উচিত সৃজনশীলতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতার মাধ্যমে বেকারত্বকে জয় করতে হবে।

আজহারুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. সজিবুর রহমান সজীব

মানবতা যে ঘরে পদদলিত

মযহারুল ইসলাম বাবলা

ক্ষমতার রাজনীতি ও কাশ্মির সংকট

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর আদায় নয় আহরণ

আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

বায়ুদূষণ রোধে করণীয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রাষ্ট্রের স্বভাব ও চরিত্র

মাহফুজা অনন্যা

পেঁয়াজ সংকট কোন পথে?

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

একজন সৃজনশীল সুভাষ দত্ত

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

Bhorerkagoj