প্রবাসীদের পথে পথে মৃত্যুফাঁদ

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বাংলাদেশিদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা নতুন নয় তবে বর্তমানে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর পাশাপাশি প্রবাসে নির্যাতন স্বীকার হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রতিনিয়তই আসছে তাদের মৃত্যুর খবর। পরিবারে সুদিন ফেরানোর আশায় বিদেশে গিয়ে অনেকে নিজেই ফিরছেন লাশ হয়ে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৬২ দেশে অবস্থান করছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। সরকারি হিসাব মতে যাদের সংখ্যা প্রায় ৮৯ লাখ। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে এক কোটি বিশ লাখের কিছু বেশিতে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বিরাট অংশ শ্রমিক হিসেবে চাকরি করছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ প্রবাসী নিয়ম না মেনে দালালের মাধ্যমে ভুল ভিসা নিয়ে প্রবেশ করছেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তারা অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন। এর পরিপেক্ষিতে তারা হারাচ্ছেন কাজের সুযোগ ও টাকা বা রেমিটেন্স দেশে পাঠানোর সুযোগ। সেখানকার মরু আবহাওয়ার প্রচণ্ড গরম আর কাজের ও থাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। মালিকের অত্যাচার, দেশে স্বজনদের নানা চাহিদা, বিনোদনহীন একঘেয়ে জীবন শ্রমিকদের মানসিক চাপে ফেলে দেয়। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে সবচেয়ে বেশি লাশ আসে বাংলাদেশে। স্বাভাবিক মৃত্যুর বাইরে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, আত্মহত্যা এমনকি প্রবাসে বাংলাদেশিরা খুনের ঘটনারও শিকার হচ্ছেন। তবে অবৈধ উপায়ে ইউরোপে বা আমেরিকায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের অনেক ক্ষেত্রে বাঁচামরা লড়াইয়ে নামতে হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অবস্থান চতুর্থ, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকরা বলছেন, ইউরোপে যেতে আগ্রহী কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দালালরা ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তি করে। ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই ওই ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে পুরো টাকা আদায় করে দেশে থাকা দালালরা। এরপর ওই ব্যক্তিকে ভূমধ্যসাগর নিকটবর্তী কোনো দেশ যেমন মিসর, লিবিয়া বা তিউনিসিয়ায় আটকে রেখে মুক্তিপণ বাবদ আরো কয়েক লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন দালালরা।

নারী শ্রমিক বা প্রবাসীদের অবস্থা আরো করুণ। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) ২০১৩ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিদেশ ফেরত ১০১ জন নারী শ্রমিকের মতামতের ভিত্তিতে একটি স্টাডি রিপোর্ট তৈরি করে। এতে দেখা যায়, প্রতি তিনজনে দুজন অভিবাসী নারী শ্রমিক তাদের নিয়োগকর্তা দ্বারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার।

আমাদের দেশের জিডিপিতে ১২ শতাংশ অবদান রাখছে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা। আমাদের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক খাতের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বিধান বর্তমানে সময়ের দাবি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস কর্মকর্তাদের প্রভুত্ব সুলভ আচরণে অনেকেই হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এই অভিযোগ খতিয়ে দেখা দরকার। দালালের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ির দেয়ার প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নিয়ে যেতে হবে। দেশীয় মানবপাচারকারীদের সর্বোচ্চ বিচারের আওতায় আনতে হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এর ছাড়পত্র সংগ্রহ করে চাকরি সুনিশ্চিত এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিদেশ গমন করা প্রবাসীদের অন্যতম কর্তব্য। এ জন্য দরকার ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। প্রবাসীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য হট লাইন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ওই পদক্ষেপ আমাদের নাগরিকদের প্রবাসে রাখবে নিরাপদ। ফলে বৃদ্ধি পাবে রেমিটেন্স তথা জাতীয় আয়।

সোয়াইব আহমেদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

Bhorerkagoj