সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে

বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাজুড়ে সুন্দরবন বিস্তৃত। সুন্দরবন শুধু পৃথিবীর মৌলিক বাস্তুসংস্থানই নয় একই সঙ্গে বিশাল জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। সুন্দরবন তার বুকে আশ্রয় দিয়েছে প্রকৃতির সন্তানদের। প্রতিদিন জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয় সুন্দরবনের বিশাল হৃদয়। শিহরণ জাগায় লতাপাতা, গাছগাছালি, পশু পাখির মনে। সুন্দরবনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর পরিপূর্ণ কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা আজো হয়নি। ১৯২৯ সালে কোনো এক ইংরেজ সুন্দরবনের খালবিল, নদীনালা, বাদাবন ঘুরে ঘুরে সুন্দরবনের প্রকৃতি, পরিবেশ, বনজসম্পদ, বন্যপ্রাণীর সম্পর্কে একটা মানচিত্র তৈরি করেছিলেন এখন সেটাই সম্বল। যা আধুনিক বাংলাদেশের জন্য বড়ই বেমানান। জীববৈচিত্র্যের ওপর পরিপূর্ণ গবেষণার অভাবে কিংবা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট যে কারণেই হোক সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরবন হারাতে বসেছে তার অতীত ঐতিহ্য। দিন দিন মুখ থুবড়ে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

বনবিভাগের দেয়া তথ্যানুযায়ী ১৯৭১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট ৭ বার বাঘ শুমারি হয়েছে। শুমারি অনুসারে ১৯৭১ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩২০টি, ১৯৭৫ সালে ৩৫০টি, ১৯৮০ সালে ৪৩০টি, ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি, ১৯৯৩ সালে ৩৬২টি, ২০০৪ সালে ৪৪০টি এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। সুন্দরবনে গত ১৫ বছরে গড়ে বাঘ কমেছে ৮৬ শতাংশ। যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে বাঘকে রক্ষা করতে হবে। চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য, বিষ খাইয়ে বাঘ হত্যা, বনের ভেতর জাহাজ চলাচলসহ আরো বহুবিধ কারণে সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে পড়েছে। বাঘ রক্ষায় বনবিভাগ ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। যার অধিকাংশ পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করতে পারেনি বনবিভাগ। ফলে দিন দিন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমে আসছে। বাঘের প্রজনন বৃদ্ধি, বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাঘের সংখ্যা যাতে আর না কমে ১০ বছর মেয়াদি ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান’ নামে আবার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে বনবিভাগ। আমরা আশা করছি বনবিভাগ তার সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে এবং সুন্দরবনের বাঘকে আসন্ন হুমকির মুখ থেকে রক্ষা করবে।

সুন্দরবনে মোট ২৪৫টি শ্রেণি ও ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ ছিল। বর্তমানে অবাধে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিতভাবে বনজসম্পদ সংগ্রহ, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ সবমিলিয়ে সুন্দরবনের বৃক্ষরাজিও হুমকির সম্মুখীন। গত দশ বছরে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশেরও অধিক। আর এর ফলে সুন্দরবনের বৃক্ষরাজি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি সুন্দরী গাছও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। পরিবেশ ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু ও লবণাক্ততা এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে সুন্দরী গাছ বিলীন হয়ে যেতে পারে।

সুন্দরবনের বিভিন্ন খালবিল, নদীতে আছে ১২৪ প্রজাতির গভীর পানির মাছ, ৫৩ প্রজাতির অগভীর পানির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ৭ প্রজাতির কাঁকড়াসহ ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা। ২০১০ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী সুন্দরবনের মিঠা পানির বিলগুলোতে কই, শিং, মাগুর, ট্যাংরা, টাকি, শোল, চ্যালা, খলসে, চিংড়িসহ অনেক মাছ পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলগুলোতে লোনা পানি প্রবেশ করছে। ফলে মিঠাপানির মাছগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

যতই দিন যাচ্ছে ততই সুন্দরবনের মাছের সংখ্যা কমে আসছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে সুন্দরবনে মাছের সংখ্যা একেবারে কমে যাবে। জলজ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে জলজ জীববৈচিত্র্যের ভয়াবহ ক্ষতি সাধন হবে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ, সুন্দি ও ধুম তরুণাস্থি কচ্ছপ, অজগর, গিরগিটি, বাঘসহ আরো বেশকিছু প্রজাতি সংরক্ষিত। এরই মধ্যে সুন্দরবন থেকে বিলুপ্ত হয়েছে ২ প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ২৫ প্রজাতির পাখি। আর ২১ শতকের শুরু থেকেই মহিষ, জাভাদেশীয় গণ্ডার, ভারতীয় গণ্ডার ও স্বাদু পানির কুমির বিরল হয়ে উঠেছে।

২০১৪ সালে একটি তেলবাহী জাহাজ সুন্দরবনের নদীতে ডুবে গেলে অনেক এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়েছিল, ফলে জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ভাসমান তেলের কারণে শ^াসমূলীয় উদ্ভিদগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছিল। এখনো বনের ভেতর অবাধে চলছে তেল, কয়লা, রাসায়নিক সারবাহী জাহাজ। এগুলোর প্রভাবে আগামীতে আবার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য যে হুমকির মুখে পড়বে না তার নিশ্চয়তা কী? প্রাকৃতিক কারণে না যতটা তার চেয়ে মানবসৃষ্ট কারণেই সুন্দরবনের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। সবশেষে শুধু একটা কথাই বলা যায়, সুন্দরবন কি দিন দিন তার জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে না?

রাবাত রেজা খান
ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj