আত্মহত্যা সব সমস্যার সমাধান নয়

বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এইতো কিছুদিন আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র তার ফেসবুক টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দিয়ে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু কেন? দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়ন করা ছেলেরা কেন আত্মহত্যাকেই সব সমস্যার সমাধান হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এরও কিছুদিন আগে তরুণ নামের এক ছেলে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে।

আচ্ছা আমরা তো মানুষ। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাহলে আমরা কেন আত্মহত্যা করব? আমরা তো নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। তবে আমরা কেন অবিবেচকদের মতো নিজেদের শেষ করে দিচ্ছি। কেনইবা আমরা আত্মহত্যাকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে নিচ্ছি। অনেকেই ভেবে থাকেন যে, আমি আত্মহত্যা করলেই ঝামেলা মিটে গেল। আমাকে আর কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না। কিন্তু এমনটা ঠিক না। আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার আত্মহত্যাটি সবকিছুর অবসান ঘটাবে। একদম ভুল করবেন আপনি। বিশ্বাস করুন আপনিবিহীন আপনার চারপাশের মানুষ একটুকুও ভালো থাকতে পারবে না। আপনি কি চান, আপনার জন্য কিছু মানুষের চোখে সারাজীবন অশ্রæ ঝরুক? আপনি বলবেন না, তাহলে কেন আপনি কিছু খারাপ অভিজ্ঞতার কারণে আপনার প্রিয় মুখগুলোকে কাঁদাবেন? আজকাল এমনও দেখা যায় যে, শ্বশুরবাড়ির লোকদের নির্যাতনের শিকার হয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যা করার আগে ডায়েরিতে আত্মহত্যার কারণ লিখে যান এবং যার কারণে আত্মহত্যা করেছে তার নামও উল্লেখ করে যান। মানুষ এমন ভাবতে পারে, আত্মহত্যাই সব সমস্যার সমাধান এবং অন্যকে শাস্তি দেয়ার একটা উপায়। তখন তো সমাজের জন্য তা অবশ্যই মঙ্গলকর নয়। যে কোনো সমস্যার মূলে আমাদের পৌঁছানো উচিত। আমরা মূলে পৌঁছাই না। তার আত্মহত্যার পেছনে শ্বশুরবাড়িই দায়ী। সুতরাং শ্বশুরবাড়ির লোকদের শাস্তি হওয়া উচিত। ঘটনা এখানেই শেষ। কিন্তু এমন কয়টা ঘটনা শাস্তি দিয়ে থামানো যাচ্ছে? এই প্রশ্নও তো আসতে পারে। যেতে হবে মানুষের মনের গভীরে। সেখানে কি চলছে? মানুষ কেন আত্মহত্যাকে বেছে নিচ্ছে? ঠিক কখন মানুষ আত্মহত্যার কথা ভাবেন? কীভাবে তাদের কাউন্সিলিং করা যেতে পারে? পরিবারের সদস্যরা কীভাবে তাকে সাপোর্ট করবে? মানসিক অশান্তিগুলো কি কারণে তৈরি হচ্ছে? সেই কারণগুলো সমাধানের উপায় কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। অনেক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, আত্মহত্যার পেছনে শুধু একটি কারণ থাকে না। মানুষের ব্যক্তিত্ব, পরিবার, আত্মীয়তা ও পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে মানসিক ভারসাম্য। কারণ একাকী নিঃসঙ্গ জীবনে ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে যায় ও মানুষের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। এ ছাড়াও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে যে, পরিবারের সদস্য এবং বন্ধু-বান্ধবদের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে চলা, কারো অপমানিত বা অকারণে নিগৃহীত হওয়া, খুব সহজেই ভোগ বিলাসের সামগ্রী হাতে পাওয়া, পরিবারে আগে আত্মহত্যার ঘটনা, সমাজে নিজেকে সঠিকভাবে মেলে ধরতে না পারা, হীনমন্যতা ও বেকারত্ব ইত্যাদির কারণেও মানুষ হঠাৎ মানসিক বিষাদে আক্রান্ত হয়ে এই পথ বেছে নেয়। আত্মহত্যার পরিমাণ কমিয়ে আনা খুবই প্রয়োজন। আমরা কেউই চাই না আত্মহত্যা করে আমাদের মাঝ থেকে প্রিয় মানুষ হারিয়ে যাক। নিজেদের ভালো থাকার জন্য হলেও আমরা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেব। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, সমাজকর্মী ও মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা নেয়া। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার সমাজকর্মী ও মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেয়া। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্লিনিকের পাশাপাশি কাউন্সিলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা। সর্বোপরি স্বার্থপরের মতো নিজেকে কিছু খারাপ সময়, কিছু বাজে অভিজ্ঞতা এবং সমাজের কিছু আগাছার কাছে নিজেকে হেরে যেতে দেয়া ঠিক হবে না। আপনার চোখ দিয়েই হয়তো আপনার বাবা-মা স্বপ্ন দেখেন, আপনাকে ঘিরেই হয়তো আপনার চারপাশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা। তাহলে আপনি কেন হেরে যাবেন? ঘুরে দাঁড়ান, নিজেকে ভালোবাসুন, অন্যকে ভালো রাখুন এবং আত্মহত্যার মতো মহাপাপকে ‘না’ বলুন।

রাজু আহমেদ

শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj